সম্প্রতি জুলাই-বিপ্লব নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা। সেই প্রতিবেদনের চুলচেরা বিশ্লেষন করছে বাংলাদেশের মিডিয়াসহ বিশ্ব মিডিয়াগুলোও। প্রতিবেদন নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, যে প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা জরুরি।
ডেথ ট্রল অফ জুলাই রায়ট ইন বাংলাদেশ শিরোনামে করা টালিতে জুলাই ১ তেকে আগস্ট ৪ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দেখিয়েছে ৪০০ জন। এদের মধ্যে বিপ্লবী, আওয়ামী লীগ সাপোর্টার এবং আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যও রয়েছেন। যদি তাই হয়, তাহলে তো শুধু বিপ্লবী নিহতের সংখ্যা আরোও কমে আসবে। এরপর বলা হয়েছে আগস্ট ৫ থেকে আগস্ট ৬ নিহত হয়েছেন ২৫০ জন, যাদের মধ্যে রয়েছেন বিপ্লবী, আওয়ামী লীগ সাপোর্টার এবং আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যও। সবশেষ কলামে আগস্ট ৭ থেকে আগস্ট ১৫ অব্দি ৭৫০ জন নিহত হয়েছেন, যারা আওয়ামী লীগ সাপোর্টার এবং আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘ। এখন প্রশ্ন হলো জুলাই বিপ্লবে নিহতের সংখ্যা আসলে কত? এ প্রশ্ন তো করাই উচিৎ।
কারণ বাংলাদেশের অন্তর্র্বতীকালীন সরকার বলছে এই নিহতের সংখ্যা প্রায় ১৪২৩ দাবি করেছে স্বাস্থ্য বিষয়ক কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সদস্য সচিব এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক তরিকুল ইসলাম। তিনি জানিয়েছেন, ২২ হাজার আহত মানুষের তালিকাও তাদের কাছে আছে। কিন্তু জাতিসংঘের প্রতিবেদন বলছে ভিন্ন কথা।
আবার জাতিসংঘের প্রতিবেদনে এই ১৪০০ মৃত্যু কিভাবে হয়েছে তার একটি বর্ণনাও দেয়া আছে। সেই বর্ণনা মোতাবেক পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হয়েছে ১২%, পিস্তলের গুলিতে নিহত সংখ্যা ২%, মিলিটারি ব্যবহৃত রাইফেলের গুলিতে মারা গেছেন ৬৬% জনতা। এছাড়াও হাত এবং হাতিয়ার দিয়ে নিহতের সংখ্যা ২০%। তার মানে ৮৮ শতাংশ মানুষ মারা গেছে বিপ্লবী নামধারী জনতা ও মিলিটারীর গুলিতে। প্রশ্ন হলো মিলিটারীর গুলি বা অস্ত্র বিপ্লবী জনতা পেলো কোথায়? তার কোন উত্তর জাতিসংঘের প্রতিবেদনে নেই। তাহলে তো প্রশ্ন উঠবেই, উঠাই উচিৎ।
ফলে অনেকেই জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা প্রকাশিত এই প্রতিবেদনকে পক্ষপাতদুষ্ট ও একতরফা বলছেন। বলা হচ্ছে অনেকটা তড়িঘড়ি করেই এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। কারণ, ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিই হলো, উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা, নিরপেক্ষভাবে প্রমাণ বিশ্লেষণ করা এবং ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। কিন্তু এই তদন্তের ক্ষেত্রে সেই ন্যূনতম মানদণ্ডও মানা হয়নি। ফলে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষকদের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
আন্তর্জাতিক আইনে, বিশেষত Audi Alteram Partem (Let the other side be heard as well) নীতির অধীনে, অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য শোনা বাধ্যতামূলক। আইন ও সনদ যেখানে এই নীতি বলা হয়েছে। বলা হয়েছে,
(Universal Declaration of Human Rights (UDHR), 1948, Article ১০) প্রত্যেক ব্যক্তির অধিকার রয়েছে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতে তার অধিকার ও দায় নির্ধারণের জন্য ন্যায়সঙ্গত শুনানি পাওয়ার। International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR), 1966, Article ১৪(১) এ বলা আছে, প্রত্যেক ব্যক্তি আদালতের সামনে সমান। আদালত বা আইনি প্রক্রিয়ায় কাউকে ন্যায্য ও উন্মুক্ত শুনানি পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। Common Law System, Ridge v Baldwin (1963) AC ৪০ মামলায় বলা হয়েছে, ন্যায়বিচারের নীতি লঙ্ঘন করে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে। Maneka Gandhi v. Union of India (১৯৭৮) AIR 597 (India) মামলায় বলা হয়েছে, ন্যায়বিচারের জন্য ন্যায্য শুনানি অপরিহার্য।
বাংলাদেশ সংবিধান অনুচ্ছেদ ২৭ এ বলা হয়েছে, সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকারী। অনুচ্ছেদ ৩১এ বলা আছে কোনো ব্যক্তিকে প্রাকৃতিক বিচার নীতি লঙ্ঘন করে তার অধিকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।
এই তদন্তে শুধুমাত্র জামায়াত-শিবিরের সাদিক কায়েস ও ইউনুস সরকারের তথ্য নেওয়া হয়েছে, অথচ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, তৎকালীন প্রশাসন কিংবা মেডিকেল রিপোর্টের কোনো তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও ন্যায়বিচারের মূলনীতির সরাসরি লঙ্ঘন। প্রশ্ন করাই যাই, জাতিসংঘের মতো একটি প্রতিষ্ঠান এই আইনের লংঘন কেন করলো?
জাতিসংঘের তদন্ত টিম তাদের প্রমাণ সংগ্রহের জন্য একপেশে উৎস বেছে নিয়েছে। শুধুমাত্র জামায়াত নির্দেশিত ইউনুস সরকার প্রযোজিত বিএনপি-সমর্থিত মাধ্যম থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পরিষ্কার এবং এটি Biased Evidence Collection নামে পরিচিত, যা যেকোনো আন্তর্জাতিক আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ যেকোনো নিরপেক্ষ তদন্তের মূলনীতি হলো Balance of Evidence, যেখানে উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা হয়। এখানে সেটি পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়েছে।
Universal Declaration of Human Rights (UDHR) Article 10 Ges International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR) Article ১৪ অনুযায়ী, অভিযুক্তদের আইনজীবী নিয়োগের পূর্ণ অধিকার রয়েছে।অথচ কথিত আসামি পক্ষের কেউ এখনো পর্যন্ত আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেননি। এটি সরাসরি Denial of Fair Trial Ges Miscarriage of Justice সৃষ্টি করে, যা আন্তর্জাতিক আইনে গুরুতর অপরাধ। উল্লেখ্য এক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সংবিধান অনুচ্ছেদ ২৭ ও ৩১ লংঘন করা হয়েছে।
জাতিসংঘের রিপোর্টে মেডিকেল রিপোর্ট, ফরেনসিক আলামত কিংবা ৭.৬২ বুলেট ও স্নাইপার রাইফেলের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অথচ দখলদার সরকারের ৭ দিনের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন এই বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন এবং যার প্রেক্ষিতে তার দফতর পরিবর্তন করা হয়। যেকোনো আইনি প্রক্রিয়ায় Forensic Evidence এবং Medical Report অপরিহার্য, যা এখানে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। এটি Tampering with Evidence I Selective Reporting-এর মধ্যে পড়ে, যা আইনত অবৈধ।
স্বঘোষিত আন্তর্জাতিক মানের আইন বিশেষজ্ঞ দখলদার সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল অক্টোবরের মধ্যে রায় দেওয়ার কথা বলেছেন, যা ক্যাঙ্গারু ট্রাইবুনালের আলামত ও প্রহসনের একপেশে বিচারের আভাস দেয়। যুদ্ধাপরাধীদের প্রধান কৌশুলী এবং বর্তমান আদালতের চীফ প্রসিকিউটর তাজুল এই একতরফা রিপোর্টকে আদালতে এভিডেন্স হিসেবে গ্রহণ করার কথা বলেছেন। অথচ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, যেকোনো রিপোর্ট আদালতে Cross-Examination ছাড়া প্রমাণ হিসেবে গৃহীত হতে পারে না। এক্ষেত্রে জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থার তদন্ত কমিটি বা দখলদার সরকারের ক্যাঙারু আদালতে রিপোর্ট বা সাক্ষ্য গ্রহণে cross-examination এর সুযোগই রাখে নাই বলে সুস্পষ্ট প্রতীয়মান।
জাতিসংঘের এই তদন্ত পুরোপুরি জামায়াত-শিবিরপন্থী ইউনুস সরকারের তথ্যে নির্ভরশীল। এটি তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে এবং Conflict of Interest তৈরি করে, যা আন্তর্জাতিক তদন্ত নীতির পরিপন্থী। জাতিসংঘ এখানে ড. ইউনুস সরকারের অগ্রদূত হিসেবে কাজ করছে, যা স্পষ্টতই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
ফলে জাতিসংঘের Office of the High Commissioner for Human Rights (OHCHR)–এ আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দায়ের করা যেতে পারে। জানতে চাওয়া যেতে পারে কেন তাদের রিপোর্ট একপেশে? জাতিসংঘের তদন্ত টিমের নিরপেক্ষতা যাচাই করতে স্বাধীন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নিয়ে পুনরায় তদন্তের দাবি উত্থাপন করা যেতে পারে। United Nations Human Rights Council (UNHRC) ev International Fact-Finding Mission গঠনের আবেদন করা যেতে পারে।
এই পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদনের মাধ্যমে যদি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও ন্যায়বিচার লঙ্ঘিত হয়, তাহলে International Court of Justice (ICJ)-তে মামলা করা যেতে পারে। একইভাবে, Permanent Court of Arbitration (PCA)-তে জাতিসংঘের রিপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক মহলে জাতিসংঘের এ রিপোর্টের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মাধ্যমে এ রিপোর্টের নিরপেক্ষতা নিয়ে ভোটাভুটি বা বিতর্ক উত্থাপন করা যেতে পারে।
কারণ এই প্রতিবেদনে ফরেনসিক ও মেডিকেল রিপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত উপেক্ষা করা হয়েছে এবং আন্দোলনের সূত্রপাত থেকে শেষ অব্দি কিভাবে প্রতিনিয়ত একটা সামাজিক আন্দোলন রাজনৈতিক আন্দোলনে ম্যাটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে ধাবিত করেছে সেগুলো উপেক্ষিত হয়েছে। সরকারের কর্তাব্যক্তিরাই আগেভাগে রায়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
যদি জাতিসংঘের এই পক্ষপাতদুষ্ট ও সাজানো রিপোর্টকে চ্যালেঞ্জ করা না হয়, তবে এটি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও বিচারব্যবস্থার ওপর গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে যে এমন নয়, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির জন্য এক বিরাট হুমকিও বটে।
সাজেদা হক, সিনিয়র সাংবাদিক।





