পাঁচ দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রস্তুতি চলছে

0
41

আগামী ডিসেম্বরেই জাপানের সঙ্গে শুল্ক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এটিই হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। একই সঙ্গে আগামী বছরের নভেম্বরের মধ্যে আরও অন্তত চারটি দেশে বিভিন্ন নামে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে চায় সরকার। এ ছাড়া বাণিজ্য সুবিধা পেতে রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি) যোগ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে বাংলাদেশের।

সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বছরের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বের হয়ে যাবে বাংলাদেশ। তখন উন্নত দেশগুলো থেকে আর বাণিজ্য সুবিধা পাওয়া যাবে না। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান রপ্তানির ধারা বজায় রাখতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করার আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। তবে এ চুক্তির ক্ষেত্রে রপ্তানির পাশাপাশি বিনিয়োগ, সেবা ও জনশক্তিকেও প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, এলডিসি উত্তরণের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাপানসহ বেশ কিছু দেশ ও জোটের সঙ্গে ইপিএ, এফটিএসহ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের নভেম্বরের আগেই বেশ কিছু দেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি করতে চায় সরকার।

তিনি আরও বলেন, জাপানের সঙ্গে ইপিএ করতে দরকষাকষি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এ নিয়ে দেশটির রাজধানী টোকিওতে আগামী ৩ সেপ্টেম্বর শেষ দফার আলোচনা হবে। ১০ দিনব্যাপী এ আলোচনায় তিনি নিজে অংশ নেবেন। এরপর সরকারের নির্ধারিত সময়ে দেশটির সঙ্গে এফটিএ সম্পন্ন করা হবে। এ ছাড়া অন্যান্য দেশের সঙ্গেও দরকষাকষি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে

মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রথম দফার আলোচনায় অংশ নিতে বর্তমানে একটি প্রতিনিধি দল দেশটি সফর করছে বলেও জানান তিনি।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এফটিএ হোক এমনটি চান ব্যবসায়ীরা। এসব ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত আমদানি ও রপ্তানি করা যায়। এফটিএ থাকলে আস্থা বাড়ে, বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ে। তা ছাড়া এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এ ধরনের দ্বিপক্ষীয় চুক্তির পাশাপাশি আঞ্চলিক জোটের সঙ্গেও চুক্তি করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে বাণিজ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে যথাযথ দরকষাকষির মাধ্যমে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে পরামর্শ দেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক এ অতিরিক্ত সচিব।

জাপানের সঙ্গে শেষ দফার আলোচনা
জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) করতে ইতোমধ্যে দরকষাকষির পাঁচ দফা আলোচনা শেষ হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এফটিএ ও ইপিএ একই ধরনের। ইপিএ এফটিএর চেয়েও আরও বিস্তৃত ও উন্নয়নবান্ধব। জাপানের টোকিওতে আগামী ৩ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে এ বৈঠক শেষ হবে ১৩ সেপ্টেম্বর। চূড়ান্ত পর্যায়ের এ দরকষাকষি প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমানসহ একটি প্রতিনিধি দল থাকবে।

জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষরকে সামনে রেখে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দুই দেশের যৌথ স্টাডি গ্রুপের রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাণিজ্য, শুল্ক পদ্ধতি, বাণিজ্য সহজীকরণ, বিনিয়োগ, ইলেকট্রনিক বাণিজ্যসহ ১৭টি খাতের রূপরেখা চূড়ান্ত হয়েছে। প্রতিবেদনে চিহ্নিত খাতগুলো হচ্ছে– পণ্যের বাণিজ্য, বাণিজ্য সহজীকরণ, বাণিজ্যে বাধা দূর করার ব্যবস্থা, শুল্ক পদ্ধতি ও বাণিজ্য সুবিধা (সিপিটিএফ), বাণিজ্যে প্রযুক্তিগত বাধা (টিবিটি), পরিষেবা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ইলেকট্রনিক বাণিজ্য, সরকারি কেনাকাটা, মেধাস্বত্ব, ভর্তুকি বা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন উদ্যোগ, ব্যবসার পরিবেশের উন্নতি, শ্রম, পরিবেশ, স্বচ্ছতা, সহযোগিতা এবং বিরোধ নিষ্পত্তি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৬ জুন দুই দেশের মধ্যে খাতভিত্তিক আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে। ২১টি ওয়ার্কিং গ্রুপ ৫৫টি সেশনের মাধ্যমে পণ্য ও সেবাভিত্তিক আলোচনার কাজ শেষ করেছে। জাপান পুরো প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে এবং বাংলাদেশের পক্ষকে একাধিক ক্ষেত্রে ছাড়ও দিয়েছে। এটি স্পষ্ট করেছে যে, দেশটি এই চুক্তিতে আগ্রহী ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এর আগে পঞ্চম দফা আলোচনা জাপানে ২০ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত হয়েছিল।

ইপিএর সম্ভাব্য সুফল
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় (এলডিসি) থাকায় বাংলাদেশ শুল্ক সুবিধায় জাপানে তৈরি পোশাক রপ্তানি করে। প্রতিবছর যা প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করলে ১৮ শতাংশের বেশি শুল্ক দিয়ে দেশটিতে প্রবেশ করতে হবে। তবে ইপিএ হলে বাড়তি এ শুল্ক দেওয়া লাগবে না। তা ছাড়া এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য আসবে এবং স্থানীয় শিল্প খাতে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে। গাড়ি ও তথ্য-প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়াবে জাপান। একই সঙ্গে অন্যান্য দেশের সঙ্গে এফটিএ করার পথ সুগম হবে।

আরও যেসব দেশের সঙ্গে চুক্তির প্রস্তুতি
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে রপ্তানি বাজার সংরক্ষণ, সম্প্রসারণ ও বিভিন্ন দেশের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা পাওয়ার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশ ও ট্রেড ব্লকের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ), মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি সম্পাদনের নীতি গ্রহণ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বেশ কিছু দেশ ও ট্রেড ব্লকের সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি (আরটিএ) সম্পাদনে নোগোসিয়েশন বা আলোচনা প্রক্রিয়া শুরু করছে।

আগামী বছরের নভেম্বরের মধ্যে অন্তত আরও চারটি দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। দেশগুলো হচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি (ইপিএ) করার লক্ষ্যে প্রথম দফার বৈঠক করতে বর্তমানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধি দল দেশটিতে অবস্থান করছে। এ ছাড়া সিঙ্গাপুরের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গেও আনুষ্ঠানিকভাবে মূল পর্ব অর্থাৎ নেগোসিয়েশন বা দরকষাকষি পর্ব শুরু করেছে বাংলাদেশ।

এফটিএ মানেই সব পণ্যে শুল্ক ছাড় নয়
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এফটিএ মানেই সব পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে শূন্য শুল্ক হয়ে যাবে এমনটি নয়। তবে প্রচলিত কিছু পণ্য এফটিএ স্বাক্ষরের পর থেকেই চুক্তিতে থাকা উভয় দেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানিতে শূন্য শুল্ক কার্যকর হয়ে যাবে। স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা কিংবা নানা কারণে বেশ কিছু পণ্য নিরুৎসাহিত করা হয়। এসব পণ্যে শুল্ক আগের মতই থাকবে। যেমন জাপানি গাড়ি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না। কারণ সব গাড়ি শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানির অনুমতি দেওয়া হলে দেশে কেউ এ খাতে বিনিয়োগ করবে না। আবার কিছু পণ্যে চুক্তির সময় শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়া সম্ভব না হলে পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে শুল্ক কমিয়ে আনা হয়। অবার কখনও ডলারের সংকট দেখা গেলে চুক্তির আওতায় থেকে বিলাসী পণ্যে বাড়তি শুল্ক আরোপ করার সুযোগও থাকে।

আরসিইপিতে যোগ দিতে চায় বাংলাদেশ
আগামী বছরের নভেম্বরের আগেই চীনের নেতৃত্বাধীন অন্যতম মুক্ত বাণিজ্য জোট রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি) যোগ দিতে চায় বাংলাদেশ। আরসিইপিতে থাকা ১৫টি দেশের জনসংখ্যা প্রায় ২৩০ কোটি, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ। সব মিলিয়ে এটি ২৬ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার। অস্ট্রেলিয়া, ব্রুনাই, চীন, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, নিউজিল্যান্ড, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

আরসিইপি চীনের নেতৃত্বাধীন বাণিজ্যিক ব্লক বলা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়াও এর সদস্য। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আরসিইপিতে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে আঞ্চলিক ভ্যালু চেইনে বাংলাদেশের সংযোগ ব্যাপকভাবে বাড়বে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে যোগ দিলে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ পাঁচ বিলিয়ন ডলার বাড়বে বলে এক সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় উঠে এসেছে।

আরও যেসব দেশের সঙ্গে আলোচনা
পরবর্তী সময়ে এফটিএ করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, চীন, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ব্রাজিল, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া ও সৌদি আরবের নামও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তালিকায় রয়েছে। এ ছাড়া বিমসটেকের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে এ জোটসহ অন্যান্য আঞ্চলিক জোটের সঙ্গেও এফটিএ করার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।

গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতের সঙ্গে কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সেপা) স্বাক্ষরের উদ্যোগে তেমন অগ্রগতি নেই। ভুটানের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি বা প্রেফারেন্সিয়াল ট্রেড এগ্রিমেন্ট (পিটিএ) স্বাক্ষর করার পরপরই ভারতের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির চেয়েও বড় আকারে বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি– কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সিইপিএ) স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় শুল্কমুক্ত সুবিধা ছাড়াও আঞ্চলিক সংযোগ, বিনিয়োগসহ সেবা খাতও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ জন্য একটি যৌথ সম্ভাব্যতা যাচাই করে বলা হয়, সেপা স্বাক্ষরিত হলে সাত থেকে ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় তিন থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়বে। যদিও একই সময়ে ভারতের আয় বাড়বে চার থেকে ১০ বিলিয়ন ডলার।

উল্লেখ্য, প্রতিবেশী ছোট অর্থনীতির দেশ ভুটানের সঙ্গে শুধু বাংলাদেশের অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) সই হয়েছে। এর বাইরে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে পিটিএ বা এফটিএ করা সম্ভব হয়নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here