নতুন রাজনৈতিক দল নিবন্ধনে প্রাথমিক বাছাইয়ে উত্তীর্ণ ২২টি দলের মাঠ পর্যায়ের সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) হাতে আসতে শুরু করেছে। এসব সরেজমিন প্রতিবেদন যাচাই বাছাই করে দ্রুতই সিদ্ধান্ত জানাবে সাংবিধানিক এই সংস্থাটি।
অন্যদিকে, প্রাথমিক বাছাইয়ে বাদপড়া নিবন্ধন অযোগ্য ১২১ দলকে বাদ পড়ার কারণ তুলে ধরে চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এতে অনেক দলের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ প্রতিকার চেয়ে আদালতে যাওয়ার কথা বলছে।
ইসি সূত্র জানিয়েছে, নিবন্ধনের জন্য আবেদন করে বাছাইয়ে টিকে থাকা ২২ দলের বেশিরভাগের জেলা-উপজেলা দপ্তর ও কমিটি, সমর্থক তালিকা যাচাইসহ মাঠ প্রতিবেদন ইসিতে পাঠিয়েছেন মাঠ পর্যায়ের জেলা ও আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তারা। ৩১ আগস্টের মধ্যে এসব প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশনা দিয়েছিল ইসি। সব কিছু পর্যালোচনা করে যোগ্যদের বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, দাবি-আপত্তি নিষ্পত্তি করে চলতি মাসেই নতুন দল নিবন্ধনের কাজ চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে।
বর্তমানে ইসিতে নিবন্ধন রয়েছে অর্ধশত দলের। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এবার নতুন দল নিবন্ধন কার্যক্রমে আগ্রহী ১৪৩টি দল আবেদন করে। প্রাথমিক বাছাইয়ে মাত্র ২২টি দল টিকে যায়। বাদ পড়ে ১২১টি দলের আবেদন। আর নিবন্ধনের সব শর্ত পূরণ করছে কিনা তা যাচাইয়ে এই ২২টি দলের গঠনতন্ত্র, দলিল, অফিসের অস্তিত্বসহ সামগ্রিক বিষয়ে সরেজমিন তদন্ত করছেন ইসির কেন্দ্রীয় ও মাঠ কর্মকর্তারা।
এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার সমকালকে বলেন, ইসি ২২টি দলের বিষয়ে জেলাভিত্তিক তদন্ত প্রতিবেদন চেয়েছিল। ৬৪ জেলার নির্বাচন কর্মকর্তাদের যার যে এলাকায় যে দলের কার্যক্রম রয়েছে, সে ভিত্তিতে প্রতিবেদন দেবেন তারা। এর মধ্যে কিছু প্রতিবেদন এসেছে। কিছু প্রতিবেদন পাইপ লাইনে আছে। একীভূত প্রতিবেদন পাওয়ার পর কোন দলগুলো নিবন্ধন যোগ্য আর কোন দল নিবন্ধন শর্ত পূরণ করেনি- তা ইসি কাছে উপস্থাপন করার কথা রয়েছে।
ইসির উপ সচিব মাহবুব আলম শাহ বলেন, তদন্ত চলছে ২২ দলের। সরেজমিন প্রতিবেদন কমিশনে উপস্থাপন করা হবে। নির্দেশনা পেলে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
তিনি আরও জানান, প্রাথমিক বাছাইয়ে বাদপড়া ১২১টি দলকে তাদের নিবন্ধন আবেদন ‘না-মঞ্জুর’ করার বিষয়টি নিষ্পত্তি করে চিঠি দেওয়া হয়েছে। উপযুক্ত কারণ তুলে ধরার পাশাপাশি নিবন্ধন শর্ত পূরণ না করার বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে চিঠিতে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের তালিকা ওয়েবসাইটেও দেওয়া হয়েছে।
আইন অনুযায়ী, নিবন্ধন পেতে রাজনৈতিক দলের একটি কেন্দ্রীয় কমিটি, এক-তৃতীয়াংশ জেলা ও ১০০টি উপজেলা কমিটি থাকতে হবে। প্রতিটি উপজেলা কমিটিতে কমপক্ষে ২০০ ভোটারের সমর্থনের প্রমাণও থাকতে হয়।
প্রাথমিক বাছাইয়ে টিকে থাকা ২২টি দল হচ্ছে ফরওয়ার্ড পার্টি, আমজনতার দল, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পার্টি (বিজিপি), বাংলাদেশ সংস্কারবাদী পার্টি (বিআরপি), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী), মৌলিক বাংলা, বাংলাদেশ জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি, জাতীয় জনতা পার্টি, জনতার দল, জনতা পার্টি বাংলাদেশ, বাংলাদেশ আম জনগণ পার্টি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ জাতীয় লীগ, ভাসানী জনশক্তি পার্টি, বাংলাদেশ বেকার মুক্তি পরিষদ, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)–সিপিবি (এম), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ–শাহজাহান সিরাজ), জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ বেকার সমাজ (বাবেস), বাংলাদেশ সল্যুশন পার্টি এবং নতুন বাংলাদেশ পার্টি।
এদিকে, প্রাথমিক বাছাইয়ে বাদপড়া ১২১টি দলের অনেকেই বাদ পড়ার কারণ জানার পর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। এর মধ্যে নিবন্ধন আবেদন বাছাইয়ে ঝরেপড়া দল বাংলাদেশ জাগ্রত পার্টি (বাজপ) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার একরামুল হক খানের কাছে আগস্টের শেষ সপ্তাহে চিঠি দেওয়া হয়। দুই পৃষ্ঠার এ চিঠিতে জানানো হয়, বাজপের কেন্দ্রীয় কমিটির পূর্ণাঙ্গ তালিকা, দলের বিধিমালাসহ ছয়টি বিষয়ে তথ্য ঘাটতি ছিল। ঘাটতিপূরণের সুযোগ দিলে ১৫ দিন সময়ের মধ্যে যেসব জবাব দিয়েছে, তাতেও ৫টি তথ্যের দলির যুক্ত করা হয়নি। এছাড়া বাজপ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) বিধান অনুযায়ী, আবেদন জমা দিলেও শর্তাদির পূর্ণাঙ্গ কাগজপত্র দাখিল করেনি। এসব কারণে ইসি নিবন্ধনের অযোগ্য হিসেবে দলটিকে প্রাথমিক বাছাইয়ে বাদ দিয়েছে।
এ বিষয়ে বাজপ মুখপাত্র কাজী শামসুল ইসলাম বলেন, ইসির চিঠি পেয়েছি আমরা। দলের আবেদন নামঞ্জুর করার চিঠি পেয়েছি। গেল সপ্তাহে সিইসি, সচিব ও ইসির উপসচিবকে আইনি নোটিশ দিয়েছেন আমাদের দলের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার। আগামী সপ্তাহে বাজপের নামে ‘কলম প্রতীক ও ইসির নিবন্ধন’ পেতে সিইসিসহ অন্যদের বিরুদ্ধে আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাদপড়া দলগুলোর ক্ষোভের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ইসির উপসচিব মাহবুব আলম শাহ বলেন, ইসির সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ হলেও করার কিছু নেই। চিঠিতেই নিবন্ধন না পাওয়ার কারণ সুষ্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।




