জুলাই সনদ বাস্তবায়ন সাংবিধানিক আদেশে

0
43

বিশেষ সাংবিধানিক আদেশের মাধ্যমে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে ঐকমত্য কমিশনকে পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের পরামর্শ, সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ এবং জুলাই ঘোষণাপত্রের ২২ ধারা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক আদেশ জারি করবেন। যা জারির সঙ্গে সঙ্গেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে। শুধু সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য রাষ্ট্রপতির আদেশ জারি হবে। অন্যান্য সংস্কারে অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ ও নির্বাহী আদেশ জারি করবে। অর্থাৎ, নির্বাচনের আগেই সংস্কার হবে। বাদ যেতে পারে গণভোটের চিন্তা।

গতকাল রোববার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বাধীন ঐকমত্য কমিশনের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এসব আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। বৈঠকে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এবং অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানের থাকার কথা থাকলেও তারা আসেননি।

বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, জুলাই সনদে থাকা সংস্কারের যেসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন করতে হবে, সেগুলো গণভোটে দেওয়া যেতে পারে বলেও আলোচনা হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছেন, গণভোট সবচেয়ে টেকসই পদ্ধতি হলেও বর্তমান বাস্তবতায় তা আয়োজন সম্ভব নয়। আবার গণভোটে জয়-পরাজয় রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। তারা না চাইলে গণভোটে সংস্কারের সুপারিশ পাস হবে না। সংস্কার প্রস্তাব ভোটে পরাজিত হলে নৈরাজ্যকর অবস্থা সৃষ্টি হবে। তাই সাংবিধানিক আদেশই নিরাপদ পদ্ধতি।

কমিশন সূত্র জানিয়েছে, সনদের একাংশে থাকবে সংস্কারের ৮৪ সিদ্ধান্ত ও অঙ্গীকার। অপরাংশে থাকবে বাস্তবায়ন পদ্ধতি। সরকারকে বাস্তবায়ন পদ্ধতি সুপারিশ আকারে দেওয়া হবে। ৮৪ সংস্কারের ৭৩টিতে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য রয়েছে। বাকিগুলোতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে কমিশন সিদ্ধান্ত দিলেও বিভিন্ন দলের নোট অব ডিসেন্ট (আপত্তি) রয়েছে।

বিএনপি পিআর পদ্ধতিতে ১০০ আসনের উচ্চকক্ষ গঠন, দুদকের নিয়োগের বিশেষ কমিটি গঠনসহ ৯টি সিদ্ধান্তে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর বড় পার্থক্য রয়েছে পিআর পদ্ধতির উচ্চকক্ষ নিয়েই। গত রোববার বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস উচ্চকক্ষে পিআর মেনে নিতে বিএনপিকে অনুরোধ করলেও দলটি রাজি হয়নি।

কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আর বৈঠক হবে না। এর আগে দুই দফা বৈঠক হয়েছে। সোমবার বিকেলে তারা লিখিত আকারে মতামত দেবেন। কমিশনের সোমবারের বৈঠকে জুলাই সনদ চূড়ান্ত হবে। সনদে সইয়ের জন্য পরের দিন তা রাজনৈতিক দলগুলোকে পাঠানো যাবে।

অধ্যাপক আলী রীয়াজের সভাপতিত্বে গতকালের সভায় বিশেষজ্ঞ হিসেবে অংশ নেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন মোহাম্মদ ইকরামুল হক, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরিফ ভূঁইয়া ও ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিক।

বৈঠকে অংশ নেওয়া এক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, কমিশনকে বলা হয়েছে, গণভোট সুবিবেচনাপ্রসূত হবে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থান হয়েছে জনগণের অভিপ্রায়ে। রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিলেও, অন্তর্বর্তী সরকার আদতে গঠন হয়েছে জনগণের সার্বভৌম অভিপ্রায়ে। সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, জনগণ প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক। জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ হবে সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে। ৭(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিই সংবিধান।

বিদ্যমান সংবিধানের কোথাও সাংবিধানিক আদেশ জারির ক্ষমতা রাষ্ট্রপতি বা সরকারকে দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে সেই বিশেষজ্ঞ ৭ অনুচ্ছেদ ব্যাখ্যা করে বলেছেন, সংবিধানে লেখা না থাকলেও জনগণের ‘কনস্টিটুয়েন্ট পাওয়ার’ তথা সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। জনগণ জুলাই অভ্যুত্থানে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার সেই ক্ষমতায় সংবিধানের বাইরে গিয়ে গঠন হয়েছে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী সাংবিধানিক আদেশ জারির ক্ষমতা রয়েছে। যেমন অতীতে এ রকম আদেশ জারির মাধ্যমে সংসদের বাইরে সংবিধান পরিবর্তন করা হয়েছে।

গতকালের বৈঠকে জুলাই ঘোষণাপত্রের ২২ ধারা ব্যবহার করে বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ জারির বিষয়ে আলোচনা হয়। গত ৫ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা থেকে এ ঘোষণাপত্র পাঠ করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ২২ ধারায় বলা হয়েছে, ‘সেহেতু বাংলাদেশের জনগণ সুশাসন ও সুষ্ঠু নির্বাচন, ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি রোধ, আইনের শাসন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে বিদ্যমান সংবিধান ও সকল রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক সংস্কার সাধনের অভিপ্রায় ব্যক্ত করছে।’

বৈঠকে অংশ নেওয়া আরেক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, জনগণের অভিপ্রায়কে স্বীকার করা হয়েছে জুলাই ঘোষণাপত্রে। সে অনুযায়ী সাংবিধানিক আদেশ জারির ক্ষমতা বর্তমান সরকারের রয়েছে।

সাংবিধানিক আদেশ নাকি গণভোট, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে কোন পদ্ধতি সরকারকে সুপারিশ করা হবে– এ প্রশ্নে ঐকমত্য কমিশনের একজন সদস্য সমকালকে বলেছেন, দুই পদ্ধতির ভালোমন্দ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, গণভোট সর্বোত্তম পদ্ধতি। কিন্তু বিএনপির মতো বড় দল গণভোটে রাজি না হওয়ায় আয়োজন সহজ নয়। আগামী ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের আগে, নির্বাচন কমিশন গণভোট আয়োজনে সক্ষম কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তাই সাংবিধানিক আদেশই ভোটের আগে সাংবিধানিক সংস্কারের একমাত্র পথ।

এই সদস্য জানান, কমিশনের চিন্তা ছিল সাংবিধানিক আদেশ এবং গণভোট– উভয় বাস্তবায়ন পদ্ধতি সরকারকে সুপারিশ করা। সে ক্ষেত্রে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে, কোন পদ্ধতিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু বাস্তবতা এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতে গণভোট সুপারিশ করার চিন্তা বাদ যেতে পারে।

জুলাই সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে মতামতে বিএনপি জানিয়েছে, সংবিধান সংশোধন করতে হবে, এমন সংস্কারগুলো হবে আগামী সংসদে। সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন নেই– এমন সংস্কার বর্তমান সরকার অধ্যাদেশ ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কার্যকর করতে পারে। জামায়াত সংসদ নির্বাচনের আগেই জুলাই সনদের ৮৪ সংস্কারের সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন চায়। দলটি সাংবিধানিক আদেশ বা গণভোটে সনদের বাস্তবায়ন চায়। যদিও বিএনপি এই দুই পদ্ধতিরই ঘোরবিরোধী।

জামায়াতের মতো এনসিপিও জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি এবং নির্বাচনের আগে বাস্তবায়ন চায়। দলটির দাবি, আগামী নির্বাচনে গণপরিষদ গঠন করে, সেখানে জুলাই সনদ অনুমোদন করে সাংবিধানিক সংস্কারকে টেকসই করতে হবে।

সাংবিধানিক আদেশ টেকসই হবে কিনা– এমন প্রশ্নে এক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, নির্ভর করবে পরবর্তী রাজনীতিকদের ওপর। জনগণের অভিপ্রায়ে জারি করা আদেশের মর্যাদা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রীতি অনুযায়ী সংবিধানের সমতুল্য হবে। সাংবিধানিক আদেশ সংসদে অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। কিন্তু রাজনীতিবিদরা যদি সাংবিধানিক আদেশকে টেকসই না করেন, তাহলে কিছু করার নেই। তবে দলগুলো যেহেতু জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামায় সই করবে, আশা করা যায় সংস্কারকে রক্ষা করবে।

বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আগের দুই বৈঠকে ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিয়ে সনদ বাস্তবায়নের আলোচনা হয়েছিল। একজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, গণভোটের মতো ১০৬ অনুচ্ছেদ প্রয়োগের পরামর্শও বাদ গেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here