দেশে সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা প্রায় ৭০০। এর মধ্যে ২৪৬ হাসপাতালের ৫১৮টি জরুরি চিকিৎসা যন্ত্র দীর্ঘদিন বিকল পড়ে আছে। এমআরআই, সিটিস্ক্যান, ক্যাথল্যাব, রেডিওথেরাপি, ডায়ালাইসিস মেশিনের মতো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও এর মধ্যে রয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা প্রতিনিয়ত দুর্ভোগে পড়ছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের (নিমুউ) গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত যন্ত্র মেরামতের আবেদন বিশ্লেষণ করে হাসপাতালগুলোর যন্ত্রপাতির এ দুরবস্থার চিত্র উঠে এসেছে।
নিমুউয়ের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশের সরকারি হাসপাতালে রয়েছে পাঁচ হাজার ২৯৮টি চিকিৎসা যন্ত্র। এর মধ্যে ৫১৮টি বিকল বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উন্নত চিত্রায়ণ ও থেরাপির ভারী যন্ত্র ৪৯টি; অপারেশন থিয়েটারে ব্যবহৃত ওটি লাইট, সেন্ট্রিফিউজ, ইউপিএস, হট এয়ার ওভেন, ডিস্টিল্ড ওয়াটার প্রস্তুতকারী যন্ত্র ১০২টি; অ্যানালাইজার মেশিন, কার্ডিয়াক মনিটর, আরটি-পিসিআর, ইসিজি, আলট্রাসনোগ্রাম, ভেন্টিলেটর, ডায়ালাইসিস মেশিন, ব্রংকোস্কোপি, স্লিট ল্যাম্পসহ বিভিন্ন রোগ নির্ণয় ও লাইফ সাপোর্টে ব্যবহৃত যন্ত্র ১৩৫টি; অ্যানেসথেশিয়া মেশিন, ওটি টেবিল, অটোক্লেভ, ডেন্টাল ইউনিট, আইসিইউ শয্যা, ভ্যাকুয়াম, এয়ার প্ল্যান্ট, মডুলার ওটি, নেগেটিভ প্রেসার সিস্টেমসহ সার্জিক্যাল সরঞ্জাম ৮৫টি এবং মর্চুয়ারি কুলার, ব্লাড ব্যাংক ফ্রিজ, ইকুইপমেন্ট রুম এসি, ভিআরএফ কুলিং, রেফ্রিজারেশনসহ ১৪৭টি যন্ত্র বিকল পড়ে আছে।
নিমুউর চিফ টেকনিক্যাল ম্যানেজার জয়ন্ত কুমার মুখোপাধ্যায় জানান, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৫১৮টি যন্ত্রের মেরামতের আবেদন এসেছে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশের সার্ভে শেষ হয়েছে এবং দরপত্র আহ্বান চলছে। আশা করা যায়, শিগগির যন্ত্র সচল হবে।
নিমুউর কারিগরি ব্যবস্থাপক (মেরামত) প্রকৌশলী মাসুদ হাসান জানান, ছোট যন্ত্র সাত দিনের মধ্যে এবং ভারী যন্ত্র মেরামতে তিন থেকে ছয় মাস সময় লাগে। সঠিক নিয়মে যন্ত্র ব্যবহার না হওয়ায় দ্রুত তা বিকল হয়ে যায়। তাই যন্ত্র তদারকিতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আগামী ডিসেম্বর থেকে তদারকির কাজ শুরু হবে।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে যন্ত্র সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল সেবা শাখা ও কেন্দ্রীয় ঔষধ ভান্ডার (সিএমএসডি)। তবে স্থানীয় চাহিদা ও সক্ষমতা বিবেচনায় না এনে অনেক সময় যন্ত্র পাঠানো হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত জনবল ও খুচরা যন্ত্রাংশের অভাবও থাকে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, যন্ত্র কেনার সময় রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা চুক্তিভুক্ত করা উচিত। এর অভাবেই যন্ত্র দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। এ নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। আর আমাদের যন্ত্র নষ্ট হলে ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের মাধ্যমে মেরামত বা সচল করতে হয়। এখানেও ছয় মাস সময় লেগে যায়। এ বিড়ম্বনা এড়াতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে যন্ত্র মেরামতে ক্ষমতা দেওয়া যেতে পারে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের অবহেলা, অদক্ষতা ও জবাবদিহি না থাকার কারণে কোটি কোটি টাকার যন্ত্র নষ্ট হয়ে যায়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ডা. সায়েদুর রহমান জানান, ডিজিটাল তদারকি ব্যবস্থা চালু হচ্ছে, যাতে যন্ত্র ২৪ ঘণ্টা বন্ধ থাকলেই কেন্দ্রীয়ভাবে জানিয়ে দ্রুত মেরামত নিশ্চিত করা যায়। এ পদ্ধতি আগামী ডিসেম্বরে চালু হবে।
সেবা না নিয়ে ফিরছেন রোগী
ক্যান্সার শনাক্তের পর ঝিনাইদহ থেকে রাজধানীর জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে চিকিৎসার জন্য এসেছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব আয়েশা বেগম। চিকিৎসক তাঁকে রেডিওথেরাপি নেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে হাসপাতালে থাকা আটটি রেডিওথেরাপি যন্ত্রের মধ্যে ছয়টিই নষ্ট থাকায় তিনি তৎক্ষণাৎ সিরিয়াল পাননি। থেরাপি নিতে তাঁকে আগামী ফেব্রুয়ারিতে যোগাযোগের জন্য বলা হয়। হতাশ আয়েশা বেগমকে চিকিৎসা না পেয়ে ফিরতে হয়েছে ঝিনাইদহে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্যান্সার হাসপাতালে ছয়টি রেডিওথেরাপি যন্ত্র দীর্ঘদিন বিকল। এর মধ্যে পাঁচটি মেরামত অযোগ্য বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি একটি যন্ত্র তিন বছরের মেরামতে চুক্তি থাকলেও ১১ মাস পর তা নষ্ট হয়ে যায়। তবে সিমেন্স বাংলাদেশ নামের প্রতিষ্ঠানটি যন্ত্রটি মেরামতে গড়িমসি করছে। মেরামতের জন্য হাসপাতাল থেকে চারবার চিঠিও দেওয়া হয়েছে। কোম্পানির প্রকৌশলীরা একাধিকবার এসে চেষ্টা করলেও রেডিওথেরাপি যন্ত্রটি সচল করতে পারেনি। এখন সচল দুই রেডিওথেরাপি যন্ত্র দিয়ে দিনে গড়ে ৯০ রোগীর চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে।
হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন যেসব রোগীকে রেডিওথেরাপির সুপারিশ করা হচ্ছে তাদের ফেব্রুয়ারি বা মার্চে আসতে বলা হচ্ছে। ফলে আয়েশার মতো দিনে গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ রোগী থেরাপি না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। প্রায় এক হাজারে বেশি রোগী এই থেরাপি নেওয়ার সিরিয়ালে রয়েছেন। এই হাসপাতালে শুধু রেডিওথেরাপি যন্ত্র নয়, ছোট-বড় মিলিয়ে ১৮টি যন্ত্র বিকল রয়েছে। ফলে অনেক রোগী সেবা না নিয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
গত শনিবার সকালে জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের রেডিওথেরাপি ইউনিটে গিয়ে দেখা গেছে, সকাল ৮টা থেকে শতাধিক রোগী ও স্বজন লাইনে অপেক্ষা করছেন। তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নিয়মিত থেরাপির জন্য এসেছেন। তবে দুপুর ১২টার দিকে এক কর্মী এসে জানান, মেশিন হঠাৎ বন্ধ, আজ থেরাপি দেওয়া সম্ভব হবে না। এতে রোগী-স্বজনের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দেয়।
হাসপাতালের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ডা. মো. জাহাঙ্গীর কবীর বলেন, হাসপাতালে অচল যন্ত্র সচলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নতুন করে রেডিওথেরাপি যন্ত্র কেনার কাজও প্রক্রিয়াধীন।
খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, রেডিওথেরাপির মতো জরুরি ১৫টি যন্ত্রপাতি বিকল পড়ে আছে। এক রোগীর স্বজন জানান, এক্স-রে মেশিন নষ্ট থাকায় বাইরে থেকে পরীক্ষা করাতে হয়েছে। আরেক রোগীর স্বজন আবুল কাশেম বলেন, সিটিস্ক্যান বিকল থাকায় এখানে করাতে পারিনি। বেসরকারি হাসপাতালে গেলে চার-পাঁচ হাজার টাকা লাগে। আমাদের সেই সামর্থ্য নেই।
চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্মীরা জানান, বহু যন্ত্র বছরের পর বছর অচল পড়ে আছে। মেরামত বা প্রতিস্থাপন না হওয়ায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গ্রাম থেকে আসা দরিদ্র রোগীরা।
আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনের মধ্যে ৫টিই এখন নষ্ট। চমেক হাসপাতালে গত শনিবার গিয়ে দেখা যায়, ক্যান্সার সন্দেহে এক নারী রোগীকে ম্যামোগ্রাফি পরীক্ষা করতে বলা হলেও যন্ত্র নষ্ট থাকায় তিনি পরীক্ষা না করেই ফিরে যান। ওই রোগী জানান, বেসরকারি পরীক্ষার খরচ বহন করা তার পক্ষে সম্ভব না।
এদিকে, জেনারেল হাসপাতালে এক রোগীর আত্মীয় জানান, মাথায় আঘাত পাওয়ায় তাঁর বাবার এমআরআই করাতে চিকিৎসক পরামর্শ দিলেও যন্ত্র নষ্ট থাকায় পরীক্ষাটি করাতে পারেননি।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চমেক হাসপাতালের ম্যামোগ্রাফি যন্ত্রটি ২০১৮ সালে চালু হলেও বারবার বিকল হয়ে পড়ে। ওয়ারেন্টির তিন বছরের মধ্যে চারবার নষ্ট হয়। ২০২২ সালের ১৭ ডিসেম্বর থেকে এটি স্থায়ীভাবে বিকল রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যন্ত্রটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ পাওয়া না যাওয়ায় এটি মেরামত সম্ভব নয়; নতুন যন্ত্র কেনা ছাড়া বিকল্প নেই।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার জানানো হলেও এখনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ একরাম হোসেন বলেন, এমআরআইসহ বেশ কিছু যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন নষ্ট থাকায় প্রতিদিন অনেক রোগী পরীক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এদিকে, একাধিক হাসপাতালের পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক জানান, বিকল যন্ত্র মেরামতের জন্য একাধিকবার আবেদন করলেও যথাসময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। একদিকে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা যন্ত্র অচল পড়ে থাকে, অন্যদিকে সেবা থেকে বঞ্চিত হন সাধারণ মানুষ।





