চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছে। এর মধ্যে ৯২টি অধ্যাদেশের মাধ্যমে পূর্ববর্তী বিভিন্ন আইনে সংশোধন আনা হয়েছে। ৩৮টি অধ্যাদেশ সম্পূর্ণ নতুন। আর পূর্ববর্তী আইন রহিত করে তিনটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট প্রথম অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। সে বছর ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৭টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। এর মধ্যে দুটি ‘রহিতকরণ’ এবং দুটি ‘পূর্ণাঙ্গ’ অধ্যাদেশ। বাকি ১৩টি ‘সংশোধন’ অধ্যাদেশ।
অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর সবচেয়ে বেশি, ৮০টি অধ্যাদেশ জারি করে। এর মধ্যে ২২টি ‘পূর্ণাঙ্গ’ অধ্যাদেশ। বাকি ৫৮টি সংশোধন অধ্যাদেশ। আর চলতি বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩৬টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়।
এর মধ্যে একটি রহিতকরণ অধ্যাদেশ, ১৪টি পূর্ণাঙ্গ অধ্যাদেশ। বাকি ২১টি সংশোধন অধ্যাদেশ।
এই ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অধ্যাদেশগুলো হচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অধ্যাদেশ। ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সংশোধনী এনে প্রথম অধ্যাদেশ জারি করা হয় ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর। পরে আইনটিতে আরো তিন দফা সংশোধনী আনা হয়।
গত বছর ১০ ফেব্রুয়ারি, ১০ মে ও ৬ অক্টোবর সেসব সংশোধনীর অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। এ ছাড়া আছে গণভোট অধ্যাদেশ, যেটি গত বছর ২৫ নভেম্বর জারি করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশটি জারি করা হয় গত বছর ৩০ নভেম্বর। এরপর ১ ডিসেম্বর গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ৯ ডিসেম্বর পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ জারি করা হয়। আর চলতি বছর জারি করা ৩৬টি অধ্যাদেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অধ্যাদেশগুলো হচ্ছে বাণিজ্যিক আদালত অধ্যাদেশ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা (সংশোধন) অধ্যাদেশ। রয়েছে সরকারি চাকরিতে ঢোকার বয়সের সীমা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণের মতো অধ্যাদেশও।
দায়মুক্তির অধ্যাদেশ সংবিধান পরিপন্থী : চলতি বছর ২৫ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই গণ-অভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশ জারি করে। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়। ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের কারণে গণ-অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে যেসব দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা হয়েছে, সেসব মামলা, অভিযোগ বা কার্যধারা নির্ধারিত বিধান অনুসরণ করে প্রত্যাহারের কথা বলা আছে এই অধ্যাদেশে। শুধু তা-ই নয়, গণ-অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে নতুন মামলা করার ক্ষেত্রেও আইনত প্রতিবন্ধকতা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫-এর ‘দায়মুক্তি’ শিরোনামের ধারা ২২-এ বলা আছে, ‘এই অধ্যাদেশ বা কোনো বিধি বা উহার অধীন প্রদত্ত কোনো আদেশ বা নির্দেশ মোতাবেক সরল বিশ্বাসে কৃত বা অভিপ্রেত কোনো কিছুর জন্য কমিশন বা অন্য কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা বা অন্য কোনো আইনগত কার্যধারা দায়ের করা যাইবে না।’
এভাবে দায়মুক্তি দেওয়া অধ্যাদেশসহ অন্য সব অধ্যাদেশের আইনি ভিত্তি ও ভবিষ্যৎ কী, জানতে চাইলে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দায়মুক্তি দিয়ে যেসব অধ্যাদেশ করা হয়েছে, সেগুলো সংবিধান পরিপন্থী। কারণ এভাবে কাউকে দায়মুক্তি দেওয়া যায় না।’
এই অধ্যাদেশ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দায়মুক্তি সব সময়ই সংবিধান পরিপন্থী।’
গণভোট অধ্যাদেশের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে সংবিধানে গণভোট বলতে কিছু নেই। যে আদেশের {জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫} ভিত্তিতে গণভোট অধ্যাদেশটি জারি করা হয়েছে, সেই আদেশটিই তো অবৈধ। এ রকম অবৈধ আদেশের ভিত্তিতে দায়মুক্তি দিয়ে গণভোট অধ্যাদেশ জারি করাটা অসাংবিধানিক। আর এ কারণেই হয়তো এই অধ্যাদেশে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।’
এই আইনজীবী আরো বলেন, ‘সংবিধানে নেই এমন কোনো বিষয়ে কোনো আদেশ জারির ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নেই। জুলাই সনদে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য অনেক নতুন বিষয় আছে। ফলে এটা যে উনি (রাষ্ট্রপতি) করেছেন তা আমার মনে হয় না। উনাকে দিয়ে করানো হয়েছে। এই অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপন করা হবে বলেও আমার মনে হয় না।’
‘অধ্যাদেশ’ নিয়ে সংবিধানের বিধান কী? : গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চম ভাগ অর্থাৎ ‘আইনসভা’র ৯টি পরিচ্ছেদ রয়েছে। প্রথম পরিচ্ছেদের ৬৫(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘জাতীয় সংসদ নামে বাংলাদেশের একটি সংসদ থাকিবে এবং এই সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে প্রজাতন্ত্রের আইন প্রণয়ন-ক্ষমতা সংসদের ওপর ন্যস্ত হইবে।’
পঞ্চম ভাগের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের ৮০ অনুচ্ছেদটি ‘আইন প্রণয়ন পদ্ধতি’ সংক্রান্ত। এই অনুচ্ছেদের (১) উপ-অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে সংসদে আনীত প্রত্যেকটি প্রস্তাব বিল আকারে উত্থাপিত হইবে।’ (২) উপ-অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘সংসদ কর্তৃক কোনো বিল গৃহীত হইলে সম্মতির জন্য তাহা রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করিতে হইবে।’ আর ৮০(৫) উপ-অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘সংসদ কর্তৃক গৃহীত বিলটিতে রাষ্ট্রপতি সম্মতিদান করিলে বা তিনি সম্মতিদান করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইলে তাহা আইনে পরিণত হইবে এবং সংসদের আইন বলিয়া অভিহিত হইবে।’
আর পঞ্চম ভাগের তৃতীয় পরিচ্ছেদটি ‘অধ্যাদেশ প্রণয়ন-ক্ষমতা’ সংক্রান্ত। এই পরিচ্ছেদে একটিই অনুচ্ছেদ আছে, সেটি ৯৩ অনুচ্ছেদ। এই অনুচ্ছেদে চারটি উপ-অনুচ্ছেদ আছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের আইনি ভিত্তি ও ভবিষ্যৎ কী, তা ৯৩ অনুচ্ছেদে বর্ণনা করা আছে। অনুচ্ছেদ ৯৩(১) উপ-অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘সংসদ ভাঙিয়া যাওয়া অবস্থায় অথবা উহার অধিবেশনকাল ব্যতীত কোনো সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট আশু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রহিয়াছে বলিয়া সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে তিনি উক্ত পরিস্থিতিতে যেরূপ প্রয়োজনীয় বলিয়া মনে করিবেন, সেইরূপ অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও জারি করিতে পারিবেন এবং জারি হইবার সময় হইতে অনুরূপভাবে প্রণীত অধ্যাদেশ সংসদের আইনের ন্যায় ক্ষমতাসম্পন্ন হইবে।’
তবে এই অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা দেওয়া হলেও তা শর্তসাপেক্ষ। কোন কোন ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন না, সে রকম তিনটি শর্ত দেওয়া আছে এই অনুচ্ছেদে।
এসব শর্তে বলা আছে, সংসদ যে আইন তৈরি করার ক্ষমতা রাখে না, অধ্যাদেশ দিয়ে সেই ধরনের কোনো আইন করা যাবে না। অধ্যাদেশ দিয়ে সংবিধানের কোনো অংশ পরিবর্তন বা বাতিল করা যাবে না এবং আগে প্রণীত কোনো অধ্যাদেশের কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য নতুন অধ্যাদেশ জারি করা যাবে না। আবার ৯৩(৪) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘এই অনুচ্ছেদের (৩) দফার অধীন জারি করা প্রত্যেক অধ্যাদেশ যথাশীঘ্র সংসদে উপস্থাপিত হইবে এবং সংসদ পুনর্গঠিত হইবার তারিখ হইতে ৩০ দিনের মধ্যে এই সংবিধানের ৮৭, ৮৯ ও ৯০ অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলি প্রয়োজনীয় উপযোগীকরণসহ পালিত হইবে।’
অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত অধ্যাদেশের বিষয়ে সাংবিধানিক ব্যাখ্যা জানতে চাইলে শাহদীন মালিক কালের কণ্ঠকে বলেন, “অধ্যাদেশ হচ্ছে সাময়িক আইন। এখন যে সংসদ গঠিত হতে যাচ্ছে, এই সংসদের প্রথম অধিবেশনের ৩০ দিন পর এসব অধ্যাদেশের কার্যকারিতা হারাবে। আর সরকার যদি কোনো অধ্যাদেশ রাখতে চায় তবে তা সংসদে উপস্থাপন করে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে রাখতে হবে। প্রথমে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশের একটি ‘খসড়া আইন’ তৈরি করতে হবে। সেটি মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদন পাওয়ার পর সংসদে বিল হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। পরে সংশ্লিষ্ট আইনটি সংসদে পাস করাতে হবে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদে উল্লেখিত শর্ত পূরণ করে কি না, জানতে চাইলে শাহদীন মালিক বলেন, ‘১৩৩টি তো আর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পড়া হয়নি। তবে এর মধ্যে কয়েকটি স্পষ্টতই সংবিধান পরিপন্থী। যেমন ধরেন, জেলা পরিষদ সংশোধন অধ্যাদেশ বা উপজেলা পরিষদ সংশোধন অধ্যাদেশ। এসব অধ্যাদেশে যেটা বলা হয়েছে যে, সরকার অত্যাবশ্যক মনে করলে জেলা পরিষদ বা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকে অপসারণ করতে পারবে। কিন্তু এভাবে অপসারণ করা যায় না। স্থানীয় সরকার তো এখন নেই। ফলে এটা সংবিধান পরিপন্থী।’
সুপ্রিম কোর্টের আরেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক অধ্যাদেশই সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদে উল্লেখিত ‘আশু ব্যবস্থা গ্রহণ’ বা ‘প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান’—এই শর্ত পূরণ করে প্রণয়ন করা হয়নি। কালের কণ্ঠকে এই আইনজীবী বলেন, ‘বেশির ভাগ অধ্যাদেশ জারির ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো জরুরি অবস্থা বা প্রয়োজনীয়তা ছিল না। এই অধ্যাদেশগুলো জারি করা রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার বাইরে। রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে এগুলো করানো হয়েছে। আমি মনে করি, বেশ কিছু অধ্যাদেশ করার ক্ষেত্রে সংবিধানের বিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচিত সরকার যদি এসব অধ্যাদেশ আইন হিসেবে সংসদে পাস করে তবে তা সাংবিধানিকভাবে বৈধ হয়ে যাবে।’ তবে সংসদে আইন হিসেবে পাস হওয়ার পরও যদি সংশ্লিষ্ট আইনের কোনো ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়, তখন সেই ধারাটি হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করা যাবে বলে জানান এই আইনজীবী।





