পহেলা বৈশাখ মানেই নতুন সূচনা। লাল-সাদা শাড়ি-পাঞ্জাবিতে সেজে ওঠা শহর, মঙ্গল শোভাযাত্রার ঢোল, নতুন দিনের গান আর খাবারের টেবিলে পান্তাভাতের সঙ্গে ইলিশ। বহু বছর ধরে এটি যেন বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার অংশ হয়ে গেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্রেও এসেছে পরিবর্তন। পান্তা-ইলিশ এখন আর কেবল ঐতিহ্য নয়, নিম্ন আয়ের মানুষ ও মধ্যবিত্তের কাছে তা হয়ে উঠেছে সামর্থ্যের পরীক্ষা। বিত্তবানরা কিনতে পারলেও মধ্যবিত্তের কাছে ইলিশ অপ্রাপ্তির কষ্ট। রাজধানী থেকে জেলা শহর, এমনকি গ্রামীণ হাট সব জায়গাতেই বৈশাখের আগে ইলিশের দাম আকাশছোঁয়া। ফলে পান্তা-ইলিশ এখন অনেক পরিবারের জন্য স্বপ্নের মতো। দূর থেকে দেখা যায়, কিন্তু ছোঁয়া যায় না। এতে সাম্য ও সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে যে বছরের সূচনা হয়, সে দিনেই বৈষম্যের দেয়াল আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাজারে ইলিশ, নাগালের বাইরে ক্রেতা
রাজধানীর কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা যায়, আকার ও মানভেদে প্রতি কেজি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার টাকায়। ছোট সাইজের ইলিশও এক হাজার ৮০০ টাকার নিচে নয়। এক কেজির একটি ইলিশ কিনতে গেলেই খরচ তিন হাজার টাকার কাছাকাছি। বাসায় এনে মাথা-লেজ বাদ দিলে ৫-৬ টুকরোর বেশি হয় না। অর্থাৎ, একটি পরিবারের একবেলার আয়োজনেই শেষ হয়ে যায় এই ব্যয়বহুল মাছ। এই দাম নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বড় ধরনের চাপ। অনেকের কাছে এটি এক সপ্তাহের বাজারের সমান। ফলে বৈশাখের আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হিসাবনিকাশের চাপ।
কারওয়ান বাজারে কথা হয় মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা শারমিন সুলতানার সঙ্গে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তিনি। মাসের শেষ, বেতন পাননি এখনও। তবু ছেলের আবদারে ইলিশ কিনতে বাজারে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘সংসারের টানাটানি বারো মাসই থাকে। ছেলেমেয়েরা তো এসব বোঝে না। ওরা ফেসবুকে দেখে, ইউটিউবে দেখে– সবাই পান্তা-ইলিশ খাবে। আমার ছেলেও বলছে, সে খাবে। হাতে যে টাকা আছে, তাতে জাটকা কিনলে তেল কেনার টাকা থাকবে না। মাসের বাজারই কষ্টে চলে, সেখানে একবেলার জন্য কয়েক হাজার টাকা খরচ করা সম্ভব না।’
মোহাম্মদপুরের টাউনহল কাঁচাবাজারে কথা হয় একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক মিনহাজুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বেতন বাড়ে না, কিন্তু সবকিছুর দাম বাড়ে। ইলিশ এখন বিলাসিতা। বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে হয়তো ছোট একটা কিনব, কিন্তু সেটা হবে অন্য খরচ কমিয়ে।’ তিনি বলেন, ‘বড় লোকরা ইলিশ খেয়ে ফেসবুকে পোস্ট করেন। বাচ্চারাও মনে করে বৈশাখে ইলিশ খেতেই হবে। পহেলা বৈশাখে ইলিশ না খেলে কী ক্ষতি হয়? আগে তো এটা গ্রামীণ জীবনের সহজ খাবার ছিল। এখন এটা প্রতিযোগিতা হয়ে গেছে।’
এমন কথাই শোনা যায় আরও অনেকের মুখে। এই সংকটের একটি নীরব দিক আছে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো খুব একটা প্রকাশ করে না। তারা না পারে অন্যদের মতো বিলাসিতা করতে, না পারে পুরোপুরি ছেড়ে দিতে। উৎসবের আনন্দ আর সীমিত আয়ের বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
সামাজিক মাধ্যমে দেখা যায় ভিন্ন এক চিত্র। সাজানো পান্তা-ইলিশ, হাসিমুখে ছবি– সব মিলিয়ে এক উজ্জ্বল বৈশাখ। কিন্তু এ ছবিগুলো অনেকের জন্য তৈরি করে অদৃশ্য চাপ। যারা কিনতে পারেন না, তাদের কাছে এগুলো হয়ে ওঠে অপ্রাপ্তির প্রতীক। এক গৃহিণী বলেন, ‘বাচ্চারা টিভিতে দেখে, ফেসবুকে দেখে। তারা তো বোঝে না বাবা-মায়ের সামর্থ্য।’
দক্ষিণাঞ্চলের মোকামে সরবরাহ সংকট
বরিশাল, পাথরঘাটা, আলীপুর-মহিপুর– দক্ষিণাঞ্চলের বড় মোকামগুলোতেও একই চিত্র। বরিশাল নগরের পোর্ট রোড মোকামে গিয়ে দেখা যায়, অল্প পরিমাণ ইলিশ নিয়ে বসে আছেন খুচরা বিক্রেতারা। ক্রেতারা দাঁড়াচ্ছেন, দাম শুনেই সরে যাচ্ছেন। ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ কেজিপ্রতি এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। এক কেজির ইলিশের দাম ছাড়িয়েছে চার হাজার টাকা– যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে। বরিশালের পোর্ট রোড মোকামের ইজারাদার কামাল হোসেন জানান, এক সপ্তাহ আগে যেখানে প্রতিদিন শতাধিক মণ ইলিশ আসত, এখন তা নেমে এসেছে ২৫ থেকে ৩০ মণের মধ্যে। পাথরঘাটার পাইকার রুবেল হোসেন বলেন, ‘প্রতিবছর বৈশাখের আগে এমনই হয়। সরবরাহ কমে যায়, দাম বাড়ে।’
আড়তদারদের মতে, বৈশাখকে সামনে রেখে অনেকেই ইলিশ মজুত করেন। ফলে বাজারে সরবরাহ আরও কমে যায়। পটুয়াখালীর আলীপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের ব্যবসায়ী সালাউদ্দিন মৃধা বলেন, ডিজেলের ঘাটতির কারণে অনেক জেলে সমুদ্রে যেতে পারছেন না। ফলে ইলিশের সরবরাহ কমেছে। যে ট্রলারগুলো ফিরছে, সেগুলোর বেশির ভাগই ইলিশশূন্য।
ছোট হচ্ছে ইলিশের আকার, কমছে উৎপাদন
দেশে ইলিশ উৎপাদন কমে গত আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন হয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ টন, যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরের পর সবচেয়ে কম। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, নদী ভরাট, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীদূষণ এবং মৎস্যসম্পদের ওপর ক্রমাগত চাপ বৃদ্ধির কারণে ইলিশ উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছর ধরে দেশে ইলিশ উৎপাদন পাঁচ লাখ টনের ওপরে থাকলেও সর্বশেষ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে পাঁচ লাখ টনে। এর আগে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল চার লাখ ৯৬ হাজার টন। পরবর্তী বছরগুলোতে উৎপাদন কিছুটা বেড়ে স্থিতিশীল থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে আবার নিম্নমুখী হয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল পাঁচ লাখ ১৭ হাজার টন, ২০১৮-১৯-এ পাঁচ লাখ ৩২ হাজার টন, ২০১৯-২০-এ পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে উৎপাদন পাঁচ লাখ ৬৫ হাজার টনে পৌঁছায়। এরপর ২০২১-২২-এ পাঁচ লাখ ৬৬ হাজার টন এবং ২০২২-২৩-এ পাঁচ লাখ ৭১ হাজার টনে উন্নীত হয়, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে পাঁচ লাখ ২৯ হাজার টনে নেমে আসে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও কমে দাঁড়ায় পাঁচ লাখ টনে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এআরআইএমএ মডেল অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন পাঁচ লাখ ৩৮ হাজার থেকে পাঁচ লাখ ৪৫ হাজার টনের মধ্যে থাকতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হলেও বাস্তব উৎপাদন কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইলিশ উৎপাদন কমার পাশাপাশি মাছের গড় আকারও ছোট হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য বিশেষজ্ঞরা। মৎস্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, অতিরিক্ত মাছ ধরা, অবৈধ জালের ব্যবহার এবং জাটকা নিধনের কারণে ইলিশের গড় দৈর্ঘ্য কমে যাচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ইলিশের গড় দৈর্ঘ্য ছিল ৩৫ দশমিক ৭ সেন্টিমিটার। এরপর ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩৭ সেন্টিমিটার এবং ২০২২-২৩-এ ৩৭ দশমিক ২ সেন্টিমিটার হয়। তবে পরবর্তী সময়ে এই প্রবণতা বদলে যায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গড় দৈর্ঘ্য কমে ৩৬ দশমিক ৬ সেন্টিমিটার হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে ৩৪ দশমিক ৭ সেন্টিমিটার এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও হ্রাস পেয়ে প্রায় ৩৪ সেন্টিমিটারের কাছাকাছি নেমে আসে।
মৎস্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, ইলিশের আকার কমার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। অতিরিক্ত মাছ ধরা, জাটকা নিধন, অবৈধ জাল, নদীদূষণ, খাদ্যের অভাব– সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।
তিনি জানান, নদীতে ব্যাপক হারে মাছ ধরা এবং সমুদ্র থেকে নদীতে আসার পথে উপকূলীয় এলাকায় অতিরিক্ত আহরণের কারণে পরিপক্ব ইলিশের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া নদীর পানির গুণগত মানের অবনতি এবং খাদ্যের ঘাটতিও ইলিশের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কক্সবাজার অঞ্চলে ইলিশের গড় দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৮ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার এবং গড় ওজন ৭৮০ গ্রাম। কারণ সেখানে মাছ সমুদ্রে পূর্ণ জীবনচক্র সম্পন্ন করতে পারে এবং পরিপক্বতা অর্জনের সুযোগ পায়। অন্যদিকে রাজশাহী অঞ্চলে ইলিশের গড় দৈর্ঘ্য প্রায় ২৯ সেন্টিমিটার এবং গড় ওজন ৩৪০ গ্রাম। এই অঞ্চলের মাছ নদীকেন্দ্রিক হওয়ায় তাদের বেড়ে ওঠার পরিবেশ কম অনুকূল।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ইলিশ উৎপাদন ধরে রাখতে হলে একদিকে যেমন পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে, অন্যদিকে অবৈধ আহরণ ও জাটকা নিধন বন্ধ করতে হবে।




