বাংলাদেশের রাজনীতি ‘শক্তিশালী’ করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ২৯ মিলিয়ন ডলার, বা প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা কোন এনজিওর নামে কারা নিয়েছিলেন, তা তদন্ত করে জড়িতদের জবাবদিহির মুখোমুখি করতে চায় বর্তমান সরকার। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের চারজন উপদেষ্টা এবং দেশের প্রথম সারির দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা ওই টাকা ‘আত্মসাতের’ সঙ্গে জড়িত বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, এনজিও-বিষয়ক ব্যুরো ও সরকারি একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
নির্ভরযোগ্য সূত্র সুখবর ডটকমকে এসব তথ্য জানিয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ২৯ মিলিয়ন ডলার নেওয়ার অভিযোগটি করেছিলেন স্বয়ং দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি শক্তিধর দেশের প্রেসিডেন্ট যখন সরাসরি এমন অভিযোগ তোলেন, তখন তা কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই ধরনের ঘটনা বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক ছায়া ফেলতে পারে। বিষয়টি বর্তমান সরকার গুরুত্বের সঙ্গে তাই বিবেচনা করছে।
সূত্র বলছে, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের অভিযুক্ত ওই চার উপদেষ্টার আর্থিক লেনদেনের যাবতীয় তথ্য ও উপদেষ্টা থাকাকালে তাদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অন্যান্য অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মধ্য দিয়ে তারেক রহমান সরকার বহির্বিশ্বে বার্তা দিতে চায়, যে কোনো ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান ‘শূন্য সহনশীল’। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ওই চার উপদেষ্টা জাতীয় জুলাই সনদ, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কারসহ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের আমলে নানা অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তর করার দাবিতে ‘মাঠে’ আছেন।
তারা বিভিন্ন সভা-সমাবেশে অংশ নিচ্ছেন, গণমাধ্যমে কলাম লিখে ও সাক্ষাৎকার দিয়ে বিএনপির সরকারবিরোধী জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করছেন। নবগঠিত সরকারের বিরুদ্ধে তাদের এই ধরনের অবস্থান নিয়ে নানা সমালোচনা আছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে। অনেকে বলছেন, সাবেক উপদেষ্টারা নিজের দুর্নীতি আড়াল করতে কৌশলী রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছেন। মূলত তারা এখন সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর ‘মুখপাত্র’ হিসেবে কাজ করছেন। সূত্র বলছে, তারা নজরদারির মধ্যে আছেন। তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ বছর ধরে বিদেশি এনজিওর কাছ থেকে অনুদান নেওয়ার অভিযোগ আছে।
জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অভিযোগ করেছিলেন, বাংলাদেশের সার্বিক রাজনীতি ‘শক্তিশালী’ করতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ২৯ মিলিয়ন ডলার এমন একটি সংস্থার কাছে গেছে, যে সংস্থার নাম আগে কেউ শোনেননি। এতে দুজন মাত্র ব্যক্তি কাজ করেন। ছোট একটি সংস্থা, এখান থেকে ১০ হাজার ডলার, সেখান থেকে ১০ হাজার ডলার পায়। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছ থেকে পেয়েছে ২৯ মিলিয়ন ডলার।
এরপর ডোনাল্ড ট্রাম্প একই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে একটি অনুষ্ঠানে এই ২৯ মিলিয়ন ডলারের কথা বলেন। তার দাবি, এই অর্থ বাংলাদেশে দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ‘শক্তিশালী’ করতে বাংলাদেশের কোন সংস্থা ২৯ মিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা) অর্থায়নের জন্য নির্বাচিত হয়েছিল, তা নিয়ে দেশে–বিদেশে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এ ক্ষেত্রে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল (ডিআই) নামের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক বেসরকারি সাহায্য সংস্থার (এনজিও) নাম এসেছিল তখন।
ডিআইয়ের জন্য এই খাতে চূড়ান্তভাবে ২৯ মিলিয়ন ডলার অনুমোদন হয়েছিল কিনা, কোন সংস্থা টাকা নিয়েছিল, এ বিষয়ে তখন ক্ষমতাসীন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন এনজিও-ঘনিষ্ঠ সরকার কোনো তদন্ত করেনি। বাংলাদেশে কোনো বেসরকারি সংস্থার ২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান পাওয়া বা ছাড়ের তথ্য এনজিও-বিষয়ক ব্যুরো পায়নি বলেও তখন দাবি করা হয়। এই দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল বলে মনে করছে বর্তমানে তদন্তে জড়িত সূত্র।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের মধ্য দিয়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে নতুন তদন্ত শুরু হয়। এই আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা খতিয়ে দেখতে সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সূত্র সুখবর ডটকমকে বলছে, ড. ইউনূসের সরকারের সাবেক চারজন উপদেষ্টা ওই আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত। তাদের মধ্যে তিনজন উপদেষ্টা পুরুষ এবং একজন নারী। দুটি দৈনিক পত্রিকাও জড়িত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ডলার নেওয়ার সঙ্গে।
সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে টাকা নেওয়ায় প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের সাবেক এক উপদেষ্টার ছেলের ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠেছে গত আড়াই বছরের মধ্যে। তিনি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তার বাবার মন্ত্রণালয়ও নিয়ন্ত্রণ করতেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডেও সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক ছিল তার। তার নেপথ্য নেতৃত্বেই চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্ত হয় ড. ইউনূস সরকারের আমলে। এ কাজ করার জন্য অনেক বড় লেনদেন হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া বে-টার্মিনালের পরিবহন টার্মিনাল প্রকল্পের মাটি ভরাট, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং অন্যান্য কাজের সব নিয়ন্ত্রণ করেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের ওই উপদেষ্টার ছেলে। তার বাবা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার পর তার ব্যবসা সম্প্রসারিত হয় বলে মনে করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। শিগগিরই ওই উপদেষ্টাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে সূত্রের কাছ থেকে আভাস পাওয়া গেছে। তিনি গোয়েন্দাদের কঠোর নজরদারির মধ্যে আছেন। তার বিরুদ্ধে এক-এগারোর সরকারের আমলে বিএনপি বিরোধী ভূমিকা পালনের অভিযোগও আছে।
এদিকে মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (ইউএসএআইডি) ২৯ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প বাংলাদেশের দুজন ব্যক্তির মালিকানাধীন কোনো সংস্থাকে দেওয়ার অভিযোগটি সত্য নয় দাবি করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তখন সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়। অনেকের অভিযোগ, মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তখন কোনো অনুসন্ধান না করেই এই বিজ্ঞপ্তি দেয়। ড. ইউনূসের নেতৃত্বের সরকারের উপদেষ্টাদের রক্ষা করতেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তখন তড়িঘড়ি করে বিজ্ঞপ্তি দেয়।
এই সংবাদ বিজ্ঞপ্তির সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের কারা জড়িত, তদন্ত ছাড়াই বিজ্ঞপ্তি দিতে কেউ বাধ্য করেছিলেন কিনা, এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে সরকার। তদন্তের সঙ্গে জড়িত কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারি সংস্থা যদি তদন্ত ছাড়াই দুর্নীতি অস্বীকার করে, তাহলে সেটি কেবল প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, বরং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার অভাবও নির্দেশ করে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সংশ্লিষ্ট সময়ের সরকার ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে কোনো স্বাধীন তদন্ত করেনি। এটি কেবল একটি আর্থিক অনিয়মের সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করা নয়; বরং গণতান্ত্রিক কাঠামোর স্বচ্ছতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার বিষয়টি তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে—এটি ইতিবাচক দিক। বিষয়টিতে দুটি দৈনিক পত্রিকার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আরও জটিল মাত্রা যোগ করেছে। যদি গণমাধ্যমও এই ধরনের আর্থিক লেনদেনে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তা গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই আঘাত করে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকে পত্রিকাগুলো সন্দেহজনক সাংবাদিকতা শুরু করেছে। অথচ পত্রিকা দুটি ড. ইউনূসের সরকারের উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্টদের অনিয়ম, দুর্নীতি নিয়ে একদম চুপ ছিল।




