মিডিয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্টের দুয়ার বন্ধ কেনো?

0
10
সুপ্রিমকোর্টে সংবাদ সংগ্রহে সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। গত ৭ জানুয়ারী প্রধান বিচারপতির এজলাস কক্ষে একটি মামলার শুনানির সংবাদ সংগ্রহের জন্য রিপোর্টাররা গেলে নিরাপত্তারক্ষীরা তাদের প্রবেশ করতে দেননি। কারণ জানতে চাইলে বলা হয় প্রধান বিচারপতির নির্দেশনা রয়েছে।
প্রধান বিচারপতি লিখিত কোনো নির্দেশ দিয়েছেন কি না জানতে চাইলে বলা হয়, লিখিত না মৌখিক নির্দেশ দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিমকোর্টে কর্মরত সাংবাদিকদের সংগঠন ল’ রিপোর্টার্স ফোরাম, এলআরএফের নেতৃবৃন্দ প্রধান বিচারপতির সাক্ষাত চাইলেও তা পাননি। পরবর্তীতে রেজিস্ট্রার জেনারেলের সঙ্গে সাক্ষাত করেন এবং বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে রেজিস্ট্রার জেনারেল জানান, প্রধান বিচারপতি একটা মৌখিক নির্দেশনা দিয়েছেন। এটা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে এবং প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলবেন বলে জানান। কিন্তু দূঃখজনক হলো অদ্যাবধি সুপ্রিমকোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে সরাসরি সংবাদ সংগ্রহে সাংবাদিকদের বাধা দেয়া হচ্ছে। হাইকোর্টের কয়েকটি বেঞ্চের এজলাস কক্ষ থেকে সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না।
সর্বোচ্চ আদালত বিশেষ করে প্রধানবিচারপতির কাছ থেকে সাংবাদিকদের প্রতি এমন আচরণ অপ্রত্যাশিত। সর্বোচ্চ আদালত ও প্রধান বিচারপতি সংবিধানের রক্ষক। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংবিধান অনুযায়ী নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সেই মৌলিক অধিকার রক্ষা করার দায়িত্ব সর্বোচ্চ আদালতের। কিন্তু সেই আদালতেই যদি গণমাধ্যমকে প্রবেশ করতে দেয়া না হয় তা হলে সেটা কেমন দেখায় না!
সাংবাদিকের কাজ সংবাদ সংগ্রহ করে জনগণকে জানানো। এটা তার পেশা। সংবাদ সংগ্রহের জন্য তাকে ঘটনাস্থলে থাকতে হয়। এটা সাংবাদিকতার মূল উপাদান। সর্বোচ্চ আদালত সংবাদের অন্যতম উৎস,মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। সেখানে প্রতিদিন নানা গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি হয়,রায় হয়। রিপোর্টার আদালত কক্ষে উপস্থিত থেকে বিজ্ঞ আইনজীবীদের কনভারসেশন শুনেন। সবকিছু শুনে তিনি রিপোর্ট লিখেন ও প্রচার করেন। দেশের মানুষ তথ্য জানে এই সংবাদ মাধ্যম থেকে। কিন্তু তাকে সংবাদ সংগ্রহ করতে যদি না দেয়া হয় তা হলে মানুষ সংবাদ জানবে কোথা থেকে?
বলা হয় আইনজীবীরা বাইরে এসে ব্রিফ করবেন? কিন্তু ব্রিফ করা নিউজ কি সংবাদ হয়? শোনা কথায় কি সংবকদ হয়? আইনজীবীরা বিভিন্ন পক্ষে থাকেন। ব্রিফ করার সময় তাঁর সুবিধাজনক অংশটুকুই বলবেন। ফলে সংবাদে আরো বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।
প্রধান বিচারপতি সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহে কেনো বাধা দিচ্ছেন তার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না সাংবাদিকরা। পুরো বিষয়টিই রহস্যাবৃত। সুপ্রিমকোর্টে এমন ঘটনা নজিরবিহীন। যদিও আদালতের এখতিয়ার রয়েছে,যে কোনো মামলার শুনানি, বিচার ক্যামেরা ট্রায়াল বা রুদ্ধদ্বার কক্ষে করার। অর্থাৎ যেখানে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও বাদি বিবাদি ছাড়া আর কেউ থাকেন না। সুনির্দিষ্ট কোনো মামলার সংবাদ প্রকাশেও আদালত নিষেধাজ্ঞা দিতে পারেন। আদালতের ক্ষমতা অসীম তবে কোনো ক্রমেই সংবিধানের বাইরে নয়। ঢালাওভাবে সাংবাদিক প্রবেশে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা দেয়া এটা স্বাধীন সংবাদ মাধ্যমের ওপর বিচারবিভাগীয় হস্তক্ষেপ। সাংবাদিকরা পেশাগত কারণে সুপ্রিমকোর্টে যান। তাদের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব সর্বোচ্চ আদালতের। কিন্তু সাংবাদিকরা বিচার চাইবে কার কাছে? যার কাছে বিচার চাইবে তিনিই তাঁর কাছে যেতে দিচ্ছেন না।
আদালত সেনানিবাসও নয় পুলিশ হেডকোয়ার্টারও নয়। আদালত মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। ন্যায় বিচারকের প্রতীক। সর্বসাধারণের নির্বিঘ্নে বিচার চাওয়ার স্থান। সেখানে প্রবেশে কোনো নাগরিকের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেয়া যাবে না। গণমাধ্যমের ওপরতো নয় ই।
আমি প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছি, সাংবাদিকদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় আপনি অলিখিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করুন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানুষের তথ্য জানার অধিকার রয়েছে। কোনো কিছু গোপন থাকতে পারে না। আর বিচার তো নয়ই।
লেখক: শংকর মৈত্র, সিনিয়র সাংবাদিক, ঢাকা। 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here