গত বছরের তুলনায় সীমান্ত হত্যা প্রায় ৭৫ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের তিনি এ তথ্য জানান।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি ও প্রযুক্তিনির্ভর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের ফলে গত দুই মাসে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। গত বছরের তুলনায় সীমান্তে সন্ত্রাসী কার্যক্রম দমনে অপরাধী গ্রেপ্তারের হার প্রায় ৭০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সীমান্ত হত্যা প্রায় ৭৫ শতাংশ কমেছে। মাদক ও চোরাচালান পণ্য জব্দ অভিযানের সফলতা ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
তিনি বলেন, জাতীয় সম্পদ রক্ষায় বিজিবি প্রায় ১ লাখ লিটার জ্বালানি তেল (ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল) পাচার রোধে সক্ষম হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ৩৫ শতাংশ বেশি সাফল্য। পাশাপাশি মানবপাচার প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি ও আইনি প্রয়োগের ফলে এ খাতে ২৫ শতাংশ ইতিবাচক উন্নতি হয়েছে।
দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন চলমান রয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ২৭ এপ্রিল সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৯৪ লাখ ২৩ হাজার ৭৯৯ শিশু টিকা পেয়েছে। তিনি বলেন, ২৬ এপ্রিল সারাদেশে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৩৫২ মেগাওয়াট, সরবরাহ ছিল ১২ হাজার ৪৮৭ মেগাওয়াট এবং ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৮৬৫ মেগাওয়াট। ২৬ এপ্রিল সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয় ময়মনসিংহ জোনে ৩ ঘণ্টা।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, ২৮ এপ্রিল রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১ম ইউনিটের ফিজিক্যাল স্টার্টআপ (ফুয়েল লোডিং) উদ্বোধন করবেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। এসময় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ উপস্থিত থাকবেন। ফুয়েল লোডিং শেষ হলে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হবে। পরে ধাপে ধাপে জানুয়ারিতে পূর্ণ সক্ষমতায় ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় সঞ্চালন লাইনে যুক্ত হবে।
দ্বিতীয় ইউনিটের বিদ্যুৎ ২০২৭ সালের শেষের দিকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে জানিয়ে তিনি বলেন, দুটি ইউনিটের বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত হলে মোট চাহিদার ১০ শতাংশ পূরণ হবে। এতে প্রায় ২ কোটি মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাবেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, দেশে ১ লাখ ৭০ হাজার ৯৬৪ টন ডিজেল মজুত রয়েছে। আরও ১ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আসবে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে। এছাড়া অন্যান্য জ্বালানি তেলেও পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
একই সাথে তিনি বলেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের একটি প্রবণতা ছিল, এখনও আছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। তবে এটাকে অতিরঞ্জিত করাও যেমন ভুল, তেমনি একেবারে নেই বলা আরও বড় ভুল বলেও মনে করেন তিনি।
দেশে জঙ্গিবাদ আছে কি না, সম্ভাব্য নাশকতা এবং সরকারের গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, এ ধরনের তথ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় সবকিছু প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে সরকার পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করছে। সরকারের কাছে তথ্য আছে, কিন্তু সেটা প্রকাশযোগ্য নয়। এটুকু বলা যায় একটি ঝুঁকি রয়েছে, তবে তা আতঙ্কিত হওয়ার মতো নয়।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ নিয়ে দুটি চরম অবস্থান দেখা যায়। একসময় বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করে রাজনৈতিক ন্যারেটিভ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, আবার কেউ কেউ একেবারে অস্বীকারও করছেন। এই দুই অবস্থানই বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বাস্তবতা হচ্ছে একটি পর্যায়ে জঙ্গিবাদ ছিল, এখনও কিছু প্রবণতা রয়েছে। আমরা এটিকে মোকাবিলা করতে চাই।
উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কিছু উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর সংগঠিত হওয়ার প্রবণতা বেড়েছিল, যার কিছু প্রভাব এখনও রয়ে গেছে। তবে বর্তমান সরকার এ ধরনের তৎপরতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, এই ঝুঁকি এমন নয় যে আতঙ্কিত হতে হবে, কিন্তু সমস্যাকে অস্বীকার করলে সমাধান সম্ভব নয়। আমরা এটিকে শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনতে চাই।
জেল থেকে বেরিয়ে আসা জঙ্গিদের নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কিছু মানুষ বেরিয়েছিল, তবে তাদের কার্যক্রম নজরদারিতে রয়েছে। এটি সরকারের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ যে এসব বিষয় মোকাবিলা করা হবে। বাংলাদেশে এ ধরনের প্রবণতা সরকারের জন্য যেমন অস্বস্তিকর, তেমনি জনগণের জন্যও।
কেউ পুনরায় একই ধরনের অপরাধে জড়িত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজনে জামিন বাতিলের জন্য সরকার আদালতে আবেদন করবে বলেও জানান তিনি।
জঙ্গি মামলার আসামিদের জামিন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, জামিন মানে অপরাধ থেকে অব্যাহতি নয়। যদি কেউ পুনরায় একই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, সরকার তাদের জামিন বাতিলের জন্য জোরালোভাবে আপিল করব। তিনি বলেন, জঙ্গিবাদকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা আমাদের লক্ষ্য। এটি কতটা সম্ভব হবে জানি না, তবে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, আমরা ‘জঙ্গি’ শব্দ ব্যবহারে সতর্ক থাকতে চাই। কাউকে আদালতের রায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে ‘জঙ্গি’ আখ্যা দেওয়াও ঠিক নয়। এ ধরনের সাধারণীকরণ অতীতে অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করেছিল। তবে উগ্রবাদী প্রবণতা যে রয়েছে, তা আমরা স্বীকার করি এবং তা নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হবে।
উপদেষ্টা দাবি করেন, বর্তমান সরকার এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং অতীতের মতো কোনো ধরনের শিথিলতা নেই। যে কোনো অপরাধের তদন্ত, দোষীদের শনাক্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করা এসবই জঙ্গিবাদ মোকাবিলার অংশ।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সমাজের একটি ছোট অংশ উগ্র মতাদর্শে প্রভাবিত হয়ে ভিন্ন ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিল। কখনও কখনও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে দেশ শেষ পর্যন্ত উদার গণতান্ত্রিক পথেই এগিয়েছে। সরকার এই প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।




