চা শ্রমিকের জীবনটাও যেন চা গাছের মতোই

0
2

দুটি পাতার একটি কুঁড়ি’—এই কথাটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পাহাড়ঘেরা সবুজ চা বাগান, আঁকাবাঁকা টিলা আর প্রকৃতির মোহনীয় সৌন্দর্য। প্রতিদিন সকালে কিংবা কর্মব্যস্ততার ফাঁকে এক কাপ চা আমাদের ক্লান্তি দূর করে, এনে দেয় প্রশান্তি। কিন্তু সেই চায়ের কাপে সুখ মেশানো মানুষের জীবন কতটা বিষাদে ভরা—তা খুব কম মানুষই ভেবে দেখেন।

আঠারো শতকে উপমহাদেশে সর্বপ্রথম বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু হয়েছিল চট্টগ্রামে। শত বছরের বেশি সময় পেরিয়ে পৃথিবী বদলেছে, বদলেছে জীবনযাত্রার মান। অথচ চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির চা শ্রমিকদের জীবন যেন এখনও আটকে আছে সাদাকালো এক বাস্তবতায়। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি মজুরি, নিশ্চিত হয়নি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা নিরাপদ বাসস্থান। নেই পর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা, নেই নারী ও শিশুদের সামাজিক নিরাপত্তা। যেন আধুনিকতার আলোকিত সময়ে অন্ধকারে পড়ে থাকা এক জনপদ।

বর্তমানে দৈনিক মাত্র ১৭৮ টাকা মজুরিতে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন চট্টগ্রামসহ সারা দেশের চা বাগানের শ্রমিকরা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে যেখানে দুই কেজি চাল কিনতেও হিমশিম খেতে হয়, সেখানে এই আয়ে পরিবার চালানো অনেকের কাছেই অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ২১ মে আন্তর্জাতিক চা দিবস। এসব দিবস কোনো পরিবর্তন আসে না চা শ্রমিকদের জীবনে। এসব চা শ্রমিকরা অধিকাংশ বংশপরম্পরায়। তারা মনে করেন চায়ের গাছ যেভাবে ২৬ ইঞ্চির পর আর বড় হয় না জীবনও তাদের চা গাছের মতই আর পরিবর্তন হয় না।

রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে যারা প্রতিদিন ‘একটি কুঁড়ি আর দুটি পাতা’ সংগ্রহ করে মানুষের শৌখিন চায়ের কাপ ভরিয়ে তোলেন, তাদের জীবনযন্ত্রণা কতটা গভীর—সেই গল্প জানতেই চট্টগ্রামের বিভিন্ন চা বাগান ঘুরে শ্রমিকদের জীবন সংগ্রাম নিয়ে আলাপ করা হয়।

তার মধ্যে ফটিকছড়ি উপজেলার নারায়ণহাট ইউনিয়নের নেপচুন চা বাগানের শ্রমিক তাহেরা বেগম বলেন, সারাদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করি। দিন শেষে পাই ১৭৮ টাকা। কাজ না করলে সেই টাকাও মেলে না। এই টাকায় এখন কীভাবে সংসার চলবে?

একই বাগানের ৯ নম্বর সেক্টরের শ্রমিক হনুফা বেগম বলেন, অনেক পরিবারে পাঁচ-ছয়জন সদস্য। অথচ একজনের এই সামান্য আয়ের ওপরই নির্ভর করতে হয় সবাইকে। ছোট ভাঙাচোরা ঘরে গবাদিপশু আর সন্তানদের নিয়ে থাকতে হয়। বাগান কর্তৃপক্ষ ঘর মেরামতের কথা বললেও বছরের পর বছর তা হয় না। কাজ হারালে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও থাকবে না।

শ্রমিক ও পঞ্চায়েত নেতাদের অভিযোগ, অধিকাংশ চা বাগানে শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয় না। শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবার ঘাটতির পাশাপাশি শ্রম আইন ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির শর্তও যথাযথভাবে মানা হয় না।

এশিয়ার বৃহত্তম শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপের মালিকানাধীন কর্ণফুলী চা বাগানের শ্রমিক কৃষ্ণ মনির দিনও কাটে একইভাবে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত একটানা কাজ করেন তিনি। দুপুরে খেতে যাওয়ারও সময় পান না। দিন শেষে মেলে মাত্র ১৭৮ টাকা। আমরা যারা বাগানের বাইরে পরিবার নিয়ে থাকি, তাদের আরও বেশি কষ্ট করতে হয়। গরিব বলেই এই অল্প টাকায় কাজ করি। কোনোভাবে সংসার চলে।

বৈলগাঁও চা বাগানের অঞ্জনি ত্রিপুরা নামের আরেক শ্রমিক কষ্টের কথা বলতে গিয়ে চোখের জল সামলাতে পারেননি। তিনি বলেন, এত কম বেতনে পরিবার চালানো খুব কঠিন। সামনে ঝড়-বৃষ্টির মৌসুম। কিন্তু বাগান কর্তৃপক্ষ এখনও একটি রেইনকোটও দেয়নি। শুধু একটা পাতলা প্লাস্টিক দেয়, তাতেও শরীর ভিজে যায়।

পঞ্চায়েত নেতা মৃদুল কর্মকার বলেন, চা শ্রমিকদের শ্রমে-ঘামে এই শিল্পের প্রসার ঘটেছে। কিন্তু তাদের জীবনে বঞ্চনা আর দারিদ্র্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। উন্নয়নের গল্প শোনা গেলেও শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নতি চোখে পড়ে না।

চা শ্রমিকরা জানান, বংশপরম্পরায় তারা এই পেশার সঙ্গে জড়িত। তাদের শ্রম আর ঘামের ওপর দাঁড়িয়ে চা শিল্পের প্রসার হলেও বদলায়নি তাদের ভাগ্য। দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করেও যে মজুরি পান, তা দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোই কঠিন। সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও বাসস্থানের মতো মৌলিক সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত।

জাতিসংঘ স্বীকৃত ২১ মে আন্তর্জাতিক চা দিবস পালিত হয়। বিশ্বজুড়ে চা শিল্পের টেকসই উন্নয়ন, চা শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং চায়ের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব তুলে ধরতেই আন্তর্জাতিক চা দিবস পালন করা হয়। প্রথমদিকে বিভিন্ন চা উৎপাদনকারী দেশ, বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোতে অনানুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি পালনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ২০১৯ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে ২১ মে-কে আন্তর্জাতিক চা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর থেকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) দিবসটির সমন্বয় করে আসছে।

সবুজ চা বাগানের সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো শ্রমিক পরিবারের দীর্ঘশ্বাস, বঞ্চনা আর অনিশ্চয়তার গল্প। আন্তর্জাতিক চা দিবসে যখন চায়ের ঐতিহ্য ও সম্ভাবনার কথা বলা হয়, তখন চা শ্রমিকদের মানবিক জীবন, ন্যায্য মজুরি ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবিটিও নতুন করে সামনে আসে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here