জলবায়ুর প্রভাবে আমাদের বাস্তুতন্ত্রও হুঁমকির মুখে পড়েছে। বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem) মূলত কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানের পরিবেশগত উপাদানের সম্মিলিত প্রকাশকে বোঝায়। আবহাওয়া ও পরিবেশবিদ্যায় বাস্তুতন্ত্র দিয়ে খাদ্যশৃঙ্খল, জীবসম্প্রদায়ের আবাস, জীবিকা, চলাফেরা, প্রজাতিভেদে সম্পর্ক, শক্তি ও খাবারের বিনিময় ইত্যাদির সামগ্রিক দিককে ইঙ্গিত করে।
অন্যদিকে, জলবায়ু বলতে কোনো স্থানের একটি ব্যপক সময় ব্যবধানে(১৫-২০বছর) আবহাওয়াগত উপাদানের নানা দিক ও প্রভাবক নিয়ে আলোচনাকে বুঝিয়ে থাকে। দুটির মধ্যে সম্পর্ক হচ্ছে, জলবায়ু বাস্তুতন্ত্রের একটি আলোচ্য অংশ মাত্র অন্যদিকে একটি বড় আঙ্গিকের সমন্বয়ক্ষেত্র হলো বাস্তুতন্ত্র।
বাস্তুতন্ত্রকে যদি সোজা কথায় বলি, তা হল পরিবেশ। আমাদের পরিবেশ নানা রকম জৈব এবং অজৈব উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। আমাদের পরিবেশের একটি অন্যতম উপাদান হল জলবায়ু। আসলে বাস্তুতন্ত্র বলতে বোঝায় একই প্রজাতির জীবের আবাসস্থলকে। একটি প্রজাতি ও তার সঙ্গে যুক্ত সকল উপাদান গুলিই এককথায় বাস্তুতন্ত্র।
পরিবেশ তথা বাস্তুতন্ত্রের গঠনের বিভিন্ন উপাদান যেমন- মৃত্তিকা, জল, বায়ু এগুলি সবই জলবায়ুর উপাদান। সুতরাং বলা যায় আমাদের বাস্তুতন্ত্র গঠনের মূল উপাদানই হল জলবায়ু। এই জলবায়ুই কোনো অঞ্চলে বাস্তুতন্ত্রের ধরণ বা গঠন ঠিক করে। যেমন ধরুন- মরুভূমি অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে পাহাড়ি অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের বা সমভূমি অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের গঠন সম্পূর্ণ আলাদা।
এই যে বাস্তুতন্ত্রের গঠন তা অনেকটাই জলবায়ুর উপর নির্ভরশীল। এই পৃথিবীতে প্রচুর বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠেছে, আর এর কারণ হল স্থান ভেদে জলবায়ুর এবং আবহাওয়ার তারতম্যতা। এই আবহাওয়ার পরিবর্তন বাস্তুতন্ত্রের উপর প্রচুর প্রভাব ফেলছে। যেমন বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মরু অঞ্চলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলস্বরূপ বরফের গলনের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। আর এরফলেই সমুদ্রতলের উচ্চতা বেড়ে যাচ্ছে। যার ফলে উপকূলবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী জীব সহ (like coral) অন্যান্য জীবেদের বাস্তুতন্ত্রেও তার প্রভাব পরছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, বাস্তুতন্ত্র এবং জলবায়ু পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। জলবায়ুই ঠিক করে কোনো অঞ্চলে কিরূপ বাস্তুতন্ত্র গড়ে উঠবে।
সম্ভবত এই শতাব্দীতে বিভিন্ন প্রজাতির বিলুপ্তির ক্ষেত্রে সর্বাধিক ভূমিকা রাখতে পারে বৈশ্বিক উষ্ণতা। জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত আন্তঃসরকারি প্যানেল (আইপিসিসি) বলছে, ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস গড় তাপমাত্রার বৃদ্ধি ২০-৩০ শতাংশ প্রজাতিকে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে ফেলে দিতে পারে। যদি তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই গড় ২ ডিগ্রীতে গিয়ে পৌঁছায়, তাহলে বেশিরভাগ বাস্তুতন্ত্রের জন্যই টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে উঠবে।
বিলুপ্তির হুমকিতে রয়েছে এমন বেশিরভাগ প্রজাতিই এমন অঞ্চলগুলোতে বাস করে যা জলবায়ু পরিবর্তনের দ্বারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। আশঙ্কার ব্যাপার হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন এতটাই দ্রুত ঘটছে যে অনেক প্রজাতির জন্য পরিবর্তিত পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেওয়াটা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে।
পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গার ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে বিভিন্ন ধরনের বাস্তুতন্ত্র দেখতে পাওয়া যায়। বাস্তুতন্ত্র ছাড়া প্রাণী ও উদ্ভিদের বেঁচে থাকা একপ্রকার অসম্ভবই বটে। কারণ কোনো প্রাণী বা উদ্ভিদই অপরের সাহায্য ছাড়া বেঁচে থাকার চিন্তা করতে পারে না।
পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমশ বাড়ছে, বিভিন্ন স্থানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দেখা দিতে শুরু করেছে। আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ফসলি জমি নিশ্চিহ্ন হচ্ছে, বন উজাড় করে সাফ করে দেওয়া হচ্ছে, ভরাট হচ্ছে পুকুর, নদী, খালের মতো পানির উৎসগুলো। এ সবকিছুতেই অসংখ্য বাস্তুতন্ত্র ছিল বা লড়াই করে টিকে আছে।
এই আবহাওয়াজনিত পরিবর্তনগুলো প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে পৃথিবীর বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব পরিবর্তনের সাথে পুরোপুরি খাপ খাইয়ে নিতে একেকটি প্রজাতির শত বছরও লেগে যায়। ফলাফল হিসেবে আমরা অসংখ্য প্রাণ প্রজাতি পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে দেখেছি বিগত শতাব্দীগুলোয়। এই নিশ্চিহ্ন বা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া আগামীর দিনগুলোতে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের ফলে অনেক প্রজাতিই তাদের নিজস্ব বাস্তুতন্ত্রে টিকতে না পেরে শীতপ্রধান অঞ্চলগুলোয় পাড়ি জমাতে পারে। কারণ তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় অত্যধিক গরম সহ্য করা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়বে অনেক প্রজাতির জন্য। কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে সেই সময় কমে আসবে শত কিংবা দশকে! এতে করে অনেক বনই তার নিজস্ব প্রজাতি হারিয়ে ফেলবে, পড়বে অস্তিত্ব সংকটে।
গ্রামে কিংবা শহর ছেড়ে যদি কখনো দূরে কোথাও গিয়ে থাকেন তাহলে নিশ্চয়ই ফাঁকা ঘাসের মাঠ দেখে থাকবেন যেখানে গরুর পাল ঘাস খেয়ে বেড়াচ্ছে। সকালে গরুর মালিকরা হয়তো গরুদের এখানে ছেড়ে দিয়ে যায়, সারাদিন তারা এখানে পড়ে থাকে, ঘাস খায়। দিনশেষে বাড়ি ফেরে। আশঙ্কার কথা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা থেকে রেহাই পাবে না এই অবলা প্রাণীরাও।
কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পশুচারণের এই এলাকাগুলোতেও আসবে ব্যাপক পরিবর্তন, সংকট বাড়বে গো-খাদ্যের। তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় গরু বা এই ধরনের ভূমির উপর নির্ভরশীল অন্যান্য প্রাণীর জন্য টিকে থাকা হয়ে পড়বে মুশকিল। আপনি ভাবছেন, অন্য প্রজাতির মতো এরাও তো তাহলে স্থানান্তর হয়ে গেলেই পারে। কিন্তু না। গৃহপালিত বা খামারে বেড়ে ওঠা এসব প্রাণীর ক্ষেত্রে চাইলেও স্থানান্তর সম্ভব নয়। ফলে নানা অসুখ এমনকি মৃত্যুর পথেও হাঁটতে হতে পারে এসব প্রাণীদের।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ বা তারও বেশি বরফের পাহাড় বা মাউন্টেন গ্লেসিয়ার গলতে শুরু করবে। এর প্রভাব গিয়ে পড়বে কৃষি জমি, নদীর পানি প্রবাহ এবং পানি আটকে রাখা বাঁধের উপর। হারাবে বাস্তুতন্ত্র, নিশ্চিহ্ন হবে অসংখ্য প্রজাতি। ভয়াবহ এক বিপর্যয় থেকে আমরা খুব বেশি দূরে নেই বলেই আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।
বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার ঠিক কতটা জরুরি সেটি বোঝাতে গিয়ে জাতিসংঘ বলছে, আগামী দশ বছর (২০৩০ পর্যন্ত) যদি এই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া চালু রাখা যায় তাহলে বায়ুমন্ডল থেকে সর্বনিম্ন ১৩ থেকে সর্বোচ্চ ২৬ গিগাটন গ্রিনহাউজ গ্যাস সরিয়ে ফেলা যাবে। এই প্রক্রিয়ার অর্থনৈতিক সুবিধার কথাও বলেছে সংস্থাটি। বিনিয়োগের চেয়ে নয়গুণ বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা আসবে এই প্রক্রিয়ায়। সবধরনের বাস্তুতন্ত্রকেই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। এই উদ্যোগ সাধারণ জনগণ যেমন ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে শুরু করতে পারে, তেমনি সামাজিক, সাংগঠনিক এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকেও উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।
মানুষের বেঁচে থাকার স্বার্থের বাস্তুতন্ত্র বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। বাস্তুতন্ত্র মানুষের বেঁচে থাকার প্রায় সকল উপাদানই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে যোগান দিতে পারে। বাস্তুতন্ত্র প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি কমায়, মহামারীসহ নানা ধরনের রোগবালাই থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি-২০৩০) অর্জনের পথেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বাস্তুতন্ত্র। তাই বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া শুরু করা এখন সময়ের দাবি।
লেখক: সাজেদা হক, সম্পাদক ও প্রকাশক, দেশইনফো.কম.বিডি।



