মধ্যপ্রাচ্যের সৃষ্ট যুদ্ধের আঁচ এবার এসে লেগেছে বাংলাদেশের মানুষের ঘরে। বাড়ছে জ্বালানির দাম, গ্যাসের সংকটে ব্যাহত হচ্ছে শিল্পকারখানার উৎপাদন, কমছে সার উৎপাদন। এর প্রভাব পড়ছে পরিবহন থেকে কৃষি, খাবারের দাম থেকে মানুষের আয়-রোজগারে।
এই সংকট দীর্ঘ হলে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক। একই সঙ্গে চলতি বছর দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার কথা ছিল যাদের, তাদের সংখ্যাও বড়ভাবে কমে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের জুনের মাঝামাঝি সময়ের মূল্যায়নে এসব ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। সরকারকে বাজেট সহায়তা দেওয়ার জন্য প্রস্তাবিত একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই মূল্যায়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ এমন এক সময়ে এই সংকটে পড়েছে, যখন অর্থনীতি আগে থেকেই নানা চাপে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি বেশি, ব্যাংক খাত দুর্বল এবং সরকারের হাতেও খরচ করার মতো অর্থ কমে এসেছে। গত কয়েক বছরে দেশে দারিদ্র্যও বেড়েছে। নতুন কর্মসংস্থান খুব বেশি তৈরি হয়নি, মানুষের আয়ও সেভাবে বাড়েনি। এর সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি যোগ হওয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, শুধু ২০২৫ সালেই দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ১৪ লাখ বেড়েছে।
২০২৬ সালের পরিস্থিতিও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু না হলে এ বছর প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন। কিন্তু এখন সেই সংখ্যা কমে দাঁড়াতে পারে মাত্র ৫ লাখে। অর্থাৎ যুদ্ধের কারণে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ হারাতে পারেন আরও অনেক মানুষ। যুদ্ধের আরেকটি বড় প্রভাব পড়তে পারে পণ্যের দামে। বিশ্বব্যাংক বলছে, এ বছর দেশে দারিদ্র্য বাড়ার ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধির ভূমিকা থাকবে প্রায় ১০ শতাংশ।
বিশেষ করে জ্বালানির দাম বাড়লে এর প্রভাব শুধু তেল বা গ্যাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবহন খরচ বাড়বে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়বে, কারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। শেষ পর্যন্ত খাবারসহ নানা পণ্যের দামও বাড়তে পারে। জ্বালানির বাড়তি দাম যদি ধাপে ধাপে সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো হয়, তাহলে মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। এর পরের ধাপে খাবার ও অন্যান্য পণ্যের দামও বাড়বে। আর এই চাপ সবচেয়ে বেশি পড়বে দরিদ্র মানুষের ওপর। ফলে ধনী-গরিবের মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়তে পারে। যদিও অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত সপ্তাহে বলেছেন, জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু না হলে মূল্যস্ফীতি আরও কমত বলেও তিনি মনে করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, দেশে সার উৎপাদন এবং শিল্পকারখানার কার্যক্রম-সবই এর কারণে চাপে পড়ছে।
বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা হলো, জ্বালানির জন্য আমরা অনেকটাই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি।
দেশের মোট প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহের অর্ধেকের বেশি আসে গ্যাস থেকে। কিন্তু দেশে গ্যাসের উৎপাদন ২০১৬ সালের সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় ১৫ শতাংশ কমে গেছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং এলএনজির ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে ওই অঞ্চলে যুদ্ধ বা সরবরাহে কোনো বড় সমস্যা হলেই বাংলাদেশ সরাসরি ধাক্কা খায়।
যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় গ্যাস কোম্পানি পেট্রোবাংলার ছয়টি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির মধ্যে পাঁচটিকেই ‘ফোর্স মেজর’ ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যার কারণে চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে (এমএমবিটিইউ) ২৪ থেকে ২৮ ডলার হয়েছে। আগে যে দামে পাওয়া যেত, তার তুলনায় এটি দ্বিগুণেরও বেশি।
সরবরাহের সংকটের মধ্যে বাংলাদেশও এলএনজি পাওয়ার জন্য বেশি দাম দিতে বাধ্য হচ্ছে। গত সপ্তাহে সেপ্টেম্বর মাসে সরবরাহের জন্য দুটি এলএনজি চালান কিনতে বাংলাদেশকে প্রতি ইউনিটে ২৪ ডলারের বেশি দিতে হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার মধ্যেই এই বাড়তি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এ কারণে সরকার এখন দেশে আরও বেশি এলএনজি গ্রহণ ও প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা বাড়ানোর পথ খুঁজছে।
এই সংকট নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু বলেছেন, সমস্যার সমাধান একদিনে হবে না। তিনি বলেন, আগের সরকার বা আগের সময় থেকে যে সমস্যাগুলো উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া গেছে, সেগুলো রাতারাতি ঠিক করা সম্ভব নয়। সময় লাগবে।
জ্বালানির দাম বাড়ার আরেকটি সমস্যা হলো সরকারের ওপর বাড়তি চাপ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের ২ দশমিক ৮ শতাংশে উঠতে পারে। সব মিলিয়ে সরকারের মোট ভর্তুকির চাপ দাঁড়াতে পারে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন থেকে ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এই পরিমাণ ছিল প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন থেকে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
সরকারকে এই বাড়তি টাকা জোগাতে হলে অন্য খাতে খরচ কমাতে হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, এতে সামাজিক নিরাপত্তা বা জরুরি প্রয়োজনের খাতে সরকারের ব্যয় কমে যেতে পারে। জ্বালানি সংকট শুধু শিল্পকারখানা বা পরিবহনেই আটকে নেই। এর প্রভাব পড়ছে কৃষিতেও।
সারসহ কৃষির বিভিন্ন উপকরণ আমদানি ও সরবরাহে সমস্যা হলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন ছোট কৃষকেরা। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই কৃষির ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্বব্যাংক বলছে, কৃষির বিভিন্ন উপকরণের সরবরাহে সমস্যা হলে ছোট কৃষকেরা খাদ্যনিরাপত্তা ও আয়- দুই দিক থেকেই বড় ধাক্কার মুখে পড়তে পারেন।
বাংলাদেশের কৃষি অনেকটাই সারনির্ভর। দেশে প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে ৩৯১ দশমিক ৯ কেজি সার ব্যবহার করা হয়। এই পরিমাণ বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে সার সরবরাহে সমস্যা হলে বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন দ্রুত চাপে পড়ে।
বাংলাদেশ একদিকে যেমন অনেক সার আমদানি করে, অন্যদিকে দেশে সার উৎপাদনের জন্যও নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ দরকার। এরই মধ্যে দেশের ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে পাঁচটিকে গ্যাসের সংকটের কারণে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। এদিকে ইউরিয়ার দামও ৩০ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, সংকট দীর্ঘ হলে সারের দাম দ্বিগুণও হয়ে যেতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য নতুন নয়। রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পরও বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সারের দাম দ্রুত বেড়েছিল। এতে বাংলাদেশে খাবারের দাম বেড়েছিল, পাশাপাশি কৃষকদের জন্য সারে ভর্তুকি দিতে সরকারের খরচও বেড়ে গিয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতেও অনেকটা একই ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
যুদ্ধের প্রভাব পড়তে পারে দেশের স্বাস্থ্য খাতেও। বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা এবং দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে প্রায় ১৯ হাজার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ৬ হাজার ২০০টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের খরচ বাড়ছে।
দেশের প্রায় ৬৪টি সরকারি বড় হাসপাতালের শুধু বিদ্যুৎ বিলেই মাসে প্রায় ৬ লাখ থেকে ১১ লাখ ডলার খরচ হয়। বিদ্যুৎ না থাকলে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোকে জেনারেটর চালাতে হয়। এতে জ্বালানি খরচও বাড়ছে।
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পও এই সংকট থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। দেশের প্রায় ২৫০টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে ওষুধ তৈরির কাঁচামাল আনে। আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা হলে এসব কাঁচামাল আনতেও বাড়তি খরচ হয়। এর পাশাপাশি হাসপাতালগুলোয় ব্যবহৃত ৯০ শতাংশের বেশি সরঞ্জাম আমদানি করতে হয়। ফলে জাহাজভাড়া ও জ্বালানির দাম বাড়লে স্বাস্থ্য খাতের খরচও বেড়ে যায়।
বিশ্বব্যাংক বলছে, এমন সময়ে এসব বাড়তি খরচ স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। কারণ দেশের স্বাস্থ্য খাত এমনিতেই বড় চাপের মধ্যে আছে। মার্চ থেকে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে এবং এতে শত শত শিশু মারা গেছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, সরকারের অর্থের সংকট ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে এই পরিস্থিতি মোকাবিলাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের এই আশঙ্কা যে শুধু ভবিষ্যতের হিসাব নয়, এর কিছু লক্ষণ বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, শিল্পকারখানায় নতুন করে গ্যাসের সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না, কোথাও কাজের সময় কমানো হয়েছে, আবার জ্বালানি সংকটের কারণে কিছু কারখানা বন্ধও হয়ে গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কারখানা বন্ধ হওয়া এবং শ্রমিকদের চাকরি হারানোর ঘটনা নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, সেটিই পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝায়। অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের বলেন, এটাই এখন বাস্তবতা। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন সেই বাস্তবতাটাকেই আরও স্পষ্ট করে দেখিয়েছে।
সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার





