সে অনেক কাল আগের কথা; পর্দা তখনো রঙিন হয়নি; কিন্তু তার গান ঠিকই রাঙিয়েছিল মানুষের মন। আর মহান মুক্তিযুদ্ধে তার কণ্ঠ হয়ে উঠেছিল অনুপ্রেরণার উৎস। নন্দিত সেই শিল্পীর নাম আব্দুল জব্বার। আজ তার প্রয়াণ দিবস। ২০১৭ সালের আজকের দিনে অনন্তলোকে পাড়ি জমিয়েছেন তিনি।
আব্দুল জব্বার বাংলার এমন এক শিল্পী, যার গান কোনো ছকে বাঁধা থাকেনি। তার গানে উঠে এসেছিল দেশ, মানবতা, জীবন ও প্রেম—সবকিছুই। একদিকে তিনি গেয়েছেন ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, আবার গেয়েছেন ‘তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়’; আবার তার কণ্ঠেই উঠে এসেছিল বিরহ-রোদনের অনন্য গান ‘পথ চিরদিন সাথী হয়ে রয়েছে আমার’।
কুষ্টিয়ার আড়ুয়াপাড়ায় ১৯৩৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জন্ম আব্দুল জব্বারের। পড়াশোনাও করেছেন সেখানেই। ছোটবেলায় গানের তালিম নেন ওস্তাদ ওসমান গণি ও ওস্তাদ লুৎফুল হকের কাছ থেকে।
২০ বছর বয়সে তৎকালীন পাকিস্তান বেতারে তালিকাভূক্ত হন আবুল জব্বার। আর ২৪ বছর বয়সে প্রথম প্লেব্যাক। ১৯৬৪ সালে তালিকাভূক্ত হন বিটিভিতে। ওই বছরই দেশের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘সংগম’-এর গানে কণ্ঠ দেন জব্বার।
আব্দুল জব্বার
১৯৬৮ সালের ‘এতটুকু আশা’ সিনেমায় সত্য সাহার সুরে তিনি গেয়েছেন ‘তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়, দুঃখের দহনে করুণ রোদনে তিলে তিলে তার ক্ষয়’। সময়ের সঙ্গে এই গান হয়ে গেছে কালজয়ী; জীবনের করুণ বাস্তবতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। রবিন ঘোষের সুরে ‘পীচ ঢালা পথ’ সিনেমার টাইটেল গানে কণ্ঠ দেন জব্বার। রাজ্জাক-ববিতা অভিনীত সিনেমাটির সেই গান ‘পীচ ঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি’ কে না শুনেছেন!
১৯৭৮ সালে মুক্তি পায় আবদুল্লাহ আল মামুনের কালজয়ী সিনেমা ‘সারেং বৌ’। এতে আলম খানের সুরে জব্বার গেয়েছেন ‘ও রে নীল দরিয়া’। এ গান তাকে দেশব্যাপী জনপ্রিয়তা এনে দেয়। গানটি এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়েছে যে, পরবর্তী সময়ে এটি বহু শিল্পী কাভার করেছেন। এখনো এ প্রজন্মের শিল্পীরাও নিয়মিত গানটি গেয়ে থাকেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন আব্দুল জব্বার। সেখানে ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ ও ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’সহ বহু গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন তিনি। সেসব গান হয়ে উঠেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণার উৎস। শুধু তাই নয়, যুদ্ধের সময়ে তিনি প্রখ্যাত ভারতীয় কণ্ঠশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে মুম্বাইয়ের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে জনমত তৈরিতে কাজ করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ঘুরে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গণসঙ্গীত পরিবেশন করেও অনুপ্রাণিত করেছিলেন বীর যোদ্ধাদের। বিভিন্ন স্থানে গণসংগীত গেয়ে অর্জিত প্রায় ১২ লাখ রুপি দিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ তহবিলে।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে আব্দুল জব্বার বেছে বেছেই গান করেছেন। তার প্লেব্যাকের সিনেমাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো ‘সংগম’, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’, ‘এতটুকু আশা’, ‘পীচ ঢালা পথ’, ‘দীপ নেভে নাই’, ‘বিনিময়’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘নাচের পুতুল’, ‘মানুষের মন’, ‘আলোর মিছিল’, ‘সূর্যগ্রহণ’, ‘অঙ্গার’, ‘সারেং বৌ’, ‘সখী তুমি কার’ ইত্যাদি।
২০০৬ সালে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকা করেছিল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসি। সেখানে জায়গা করে নেয় আব্দুল জব্বারের গাওয়া তিনটি গান—‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, ‘জয় বাংলার জয়’ ও ‘তুমি কি দেখেছো কভু জীবনের পরাজয়’।
সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৮০ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৬ সালে পান দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার। এছাড়া ২০১১ সালে তাকে চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডসে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়েছিল।





