বানিযারচর গীর্জা ট্রাজেডি দিবস আজ

0
149

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি : ননী মন্ডলের বয়স প্রায় ৫৫। গীর্জায় বোমা হামলায় হারিয়েছে একমাত্র সন্তান ঝিন্টু মন্ডলকে। ছেলের বিচারের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে কয়েকদিন আগে হারিয়েছেন স্বামীকে। এখন পুরোই নিস্ব: হয়ে কবে সন্তান হত্যার বিচার পাবেন তাও জানেন না।

তিনি বলেন, না খেয়ে আমার ছেলে ঝিন্টু মন্ডল গীর্জায় গিয়েছিল। হঠাৎ করে বিকট শব্দ শুনি। দৌঁড়ে এসে দেখি আমারা ছেলে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কয়েকজন আমার ছেলেকে উদ্ধার করল। তখন ওর মুখে পানি দিতে দিতে চলে গেল। বিচারের আশায় আশায় থাকতে থাকতে আমরা স্বামীও চলে গেছেন। তার শেষ ইচ্ছা ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেতেও পারলেন না। আমিও দেখতে পারব কিনা তাও জানিনা। শনিবার বিকালে বসে বসে এ প্রতিবেদকের কাছেই এমন কথা বলছিলেন ননী মন্ডল।

আজ ৩রা জুন। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার বানিয়ারচর ক্যাথলিক গীর্জা বোমা হামলা ট্রাজেডির ১৮তম বছর। ২০০১ সালের এই দিনে ভয়াবহ বোমা হামলায় খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের ১০ জন নিহত ও আরো অর্ধশত মানুষ আহত হয়। কিন্তু এ হত্যাকান্ডের ১৮ বছর পার হলেও বিচার কাজতো দূরে থাকা অভিযোগ গঠন করতে পারেনি সিআইডি। ফলে হতাশা আর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতদের পরিবার। নিহতদের বাবা-মা ও তাদের স্বজনরা এখনো শুধু চোখের জল ফেলে যাচ্ছেন সন্তান হত্যার বিচারের আশায়।

এদিকে প্রতি বছরের ন্যায় দিবসটি পালন উপলক্ষে নিহতদের আত্মার শান্তি কামনায় গীর্জার পক্ষ থেকে প্রার্থনা সভা, কবর জিয়ারত, প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, পুষ্পমাল্য অর্পণ ও শোক র‌্যালীসহ বিভিন্ন কর্মসূচী হাতে নেয়া হয়েছে।

মামলার বিবরণ ও প্রত্যক্ষদর্শী এবং নিহত পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ২০০১ সালের ৩রা জুন সকাল ৭টার দিকে মুকসুদপুর উপজেলার বানিয়ারচর ক্যাথলিক গীর্জা সাপ্তাহিক প্রাথর্না চলছিল। প্রার্থনা চলার কিছু সময় পর হঠাৎ করে বিকট শব্দে বোমা বিষ্ফোরিত হয়। মুহুর্তের মধ্যে পুরো এলাকায় আতংক ছড়িয়ে পড়ে। প্রার্থণারতকারীরা দিক-বিদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। ঘটনাস্থলে প্রাথর্নারত অবস্থায় ১০জন নিহত হয়। আহত হয় আরো অর্ধ শতাধিক।

নিহতরা হলো রক্সিড জেত্রা, বিনোদ দাস, মন্মথ সিকাদার, সঞ্জীবন বাড়ৈ, পিটার সাহা, অমর বিশ্বাস, সতীশ বিশ্বাস, ঝিন্টু মন্ডল, মইকেল মল্লিক ও সুমন হালদার। তবে যে ১০জন নিহত হয়েছে এর মধ্যে ৭জনই হলো মা বাবার একমাত্র সন্তান। এ বোমা হামলার ঘটনায় মুকসুদপুর থানায় ওই গীর্জার তৎকালীন ফাদার পিতাঞ্জা মিম্মো বাদী হয়ে হত্যা ও পিটার বৈরাগী বাদী হয়ে বিষ্ফোরক মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পরপরই হত্যাকারীদের ধরতে তৎপর হয়ে ওঠে পুলিশ। কিন্তু কোন কুল-কিনার করতে পারেনি। পরে এ মামলা দুটি সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়।

এরপর দেশের অন্যান্য স্থানের বোমা হামলার আলামতের সাথে এ বোমা হামলার আলামতের মিলে গেলে সরকার নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জেহাদ এ বোমা হামলা চালায় বলে এক প্রকার নিশ্চিত হয় সিআইডি। ফাদার পিতাঞ্জার দাযের করা হত্যা ও পিটার বৈরাগী বাদী হয়ে দায়েরকৃত বিষ্ফোরক মামলায় ৩৭ জনকে আসামী করা হয়। সম্প্রতি এ দুটি মামলার প্রধান আসামী হরকাতুল জেহাদ নেতা মুফতি হান্নানের ফাঁসি কায্যকর হয়েছে। এছাড়া জামিনে রয়েছে ১২ জন, জামিনে গিয়ে পলাতক রয়েছে ৬ জন ও কারাগারে রয়েছে ৭ আসামী।

কিন্তু হত্যাকান্ডের দীর্ঘ ১৮ বছর পার হলেও এ সংক্রান্ত বিস্ফোরক ও হত্যা মামলার কোন সুরাহা করতে পারেনি সিআইডি। বিচার কাজতো দূরে থাকা আদালতে অভিযোগ গঠন করাও সম্ভব হয়নি সিআইডির পক্ষে। এমনকি এ পর্যন্ত মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বদল হয়েছে ২২ বার। এসকল জঙ্গি সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হলেও এখন পযর্ন্ত এ বোমা হামলার মূল পরিকল্পনাকারীকেও সনাক্ত করতে পারেনি সিআইডি।

এদিকে, নিহতদের স্মরণে বানিয়ারচর ক্যাথলিক গীর্জায় বিভিন্ন কর্মসূচীর আয়োজন করা হয়েছে। সকালে নিহতদের কবরে ছিটানো হবে মঙ্গল জল। পরে নিহতদের আত্মার শান্তি কামনায় গীর্জায় করা হবে প্রার্থনা। এরপর নিহতদের সমাধীতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবে খ্রীষ্টান সম্প্রাদারে লোকজন। বিকালে একটি শোক র‌্যালী বের করা হবে। সন্ধ্যায় প্রজ্জ্বলন করা হবে মোমবাতি।

নিহত সুমন হালদারের বাবা সূখরঞ্জন হালদার ক্ষোভের সাথে বলেন, এ বোমা হামলার ঘটনায় আমার আমাদের সন্তানদের হারিয়েছি। কিন্তু আজ ১৮ বছর হয়ে গেলও আজ সরকার আমাদের সন্তান হত্যার বিচার করেনি। সন্তান হত্যাকারীদের বিচার দেখতে পাবো এ আশায় এখনো বেঁচে আছি।

নিহত সঞ্জীবন বাড়ৈ এর বোন মেরী বাড়ৈ বলেন, দেখতে দেখতে ১৮ বছর কেটে গেলও ভাই হত্যার বিচার পাইনি। আর এ জীবনে পাবো কিনা তাও জানিনা। কত বার কর্মকর্তারা এলেন আর গেলেও তারপরও অভিযোগপত্র দিতে পারেনি সিআইডি।

বানিয়ারচর গীর্জার ফাদার ফরেজারোম রিকো গমেজ বলেন, ঘটনার দীর্ঘ ১৮ বছর পার হলেও বিচার কাজের কোন অগ্রগতি না হওয়ায় ক্ষোভ রয়েছে নিহতদের পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে। নিহতদের আত্মার শান্তি কামনায় গীর্জার পক্ষে থেকে প্রার্থনা সভা, কবর জিয়ারত, প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, পুষ্পমাল্য অর্পণ ও শোক র‌্যালীসহ বিভিন্ন কর্মসূচী হাতে নেয়া হয়েছে।

গোপালগঞ্জ জেলা সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক ও তদন্তকারী কর্মকর্তা ফতেহ মো: ইফতেখারুল আলম জানান, আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। এ মামলায় যে সব আসামীরা গ্রেফতার আছে তাদের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বেশ কিছু আসামী গ্রেফতার হয়েছে। তারা জেএমবি ও হুজির সদস্য। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরনের ঘটনায় এরা জড়িত রয়েছে। এ মামলায় তাদের সংশ্লিষ্টতা প্রমানের বিষয়গুলো অতি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। দ্রুত রহস্য উদঘাটন করে মমলার চার্জশীট দেওয়া।

গোপালগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাকলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এ্যাডভোকেট মো: আব্দুল হালিম জানান, এ মামলার বারবার তদন্ত কর্মকর্তা বদলী ও তদন্ত শেষ না হওয়ার ফলে দীর্ঘ দিনেও চার্জশীট দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে বিচার কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। সিআইডি দ্রুত তদন্ত শেষ করে চার্জশিট জামা দিলে বিচার কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here