আমার হয়ে ওঠার গল্প (৪)

0
270

হাফিজুর রহমান: এমন কোন বিখ্যাত মানুষ আমি নই যার স্মৃতিকথা না থাকলে পৃথিবী রসাতলে যাবে। তবু যে লিখছি, তার কারণ বোধকরি দ্রুত-চলমান সময়। বিংশ-শতাব্দীর মধ্যকাল থেকে এখন পর্যন্ত যে জটিল-ঋজু-কঠিন আবার উপভোগ্য অভিজ্ঞতা বুকে নিয়ে এগিয়েছি, তার কিছুটা পাঠকের কাছে তুলে ধরার উদ্দেশ্যেই এই প্রয়াস।

৪.
খুব ছোট্টবেলায় দাদীকে হারিয়েছিলাম। সম্ভবত: ক্লাস-ওয়ানে পড়ি। স্কুল থেকে ফিরে খাওয়া সেরে দৌড়ে বেরিয়েছিলাম খেলতে। রাস্তা পেরিয়ে মামা-বাড়ির এক সম্পর্কীয় নানী বললো, কীরে ! তোর দাদী এক্ষুনি মরে গেল, তুই জানিস না ?

তার আগে মৃত্যু কী- এটা জানিনি। হয়তো বুঝিনিও। দৌড়ে বাড়ির ভিতরে গিয়ে দেখি বিরাটকায় উঠোনটা লোকে লোকারণ্য। সবাই কান্নাকাটি করছে। আমি বোকার মতো তাই দেখছিলাম। কেন জানিনা, একসময়ে আমিও কেঁদে ফেললাম। তখন সন্ধ্যা নেমেছে। পরদিন সকালে সাদা-কাপড়ে মোড়ানো ধবধবে হলুদ-সাদা-দাদীর মুখখানিই আমার জীবনজোড়া স্মৃতি তাঁর। আর কিছু মনে পড়েনা।

দাদীর মৃত্যুর মাত্র তেরোদিনের মাথায় চলে গেলেন সেজোচাচা। বেশ কিছুদিন ক্যান্সারে ভুগেছিলেন। তখন এই মারাত্মক রোগটি সম্পর্কে লোকজনের ধারণা কমই ছিল। বম্মা ( সেজো-চাচার স্ত্রীকে বম্মা ডাকতাম। তিনি আমাদের খালা ও ) কোন একটা উপন্যাসে ক্যান্সার সম্পর্কে জেনেছিলেন। মির্জাপুরের কুমুদিনী হাসপাতাল থেকে ফিরে বেশিদিন বাঁচেন নি। নি:সন্তান এই চাচা আমাদেরকেই সন্তান-জ্ঞানে স্নেহ করতেন।

শুনেছি আমার শৈশবে আম্মা একবার আমাকে নিয়ে খুলনায় যাচ্ছিলেন। গল্লামারি নদী পার হয়ে রিক্সায় চড়লে আমি ভয়ে আড়ষ্ঠ হয়ে পড়ছিলাম। আম্মা তো রেগে আগুন। আম্মাকে রিক্সায় তুলে দিয়ে সেজো-চাচা আমাকে কোলে নিয়ে কাস্টম-ঘাট পর্যন্ত প্রায় চার মাইল পথ হেঁটে গিয়েছিলেন। চাচার জীবনকালে আমার সংসার-উদাসী আব্বা সংসারের খোঁজ কমই রাখতেন। সমাজ-সেবামূলক কর্মকাণ্ডে মশগুল ছিলেন নিশ্চিন্তে ।

অল্পদিনের ব্যবধানে এই দুটি মৃত্যুশোক দাদাকে দুমড়ে মুচড়ে খানখান করে দিয়েছিল। তবু দৃঢ়-চিত্তের অধিকারী মানুষটি কাউকে কখনো বুঝতে দেন নি কিছুই। অকাল-মৃত্যুদুটি সেই ছোট্ট আমিটাকেও কম কাতর করেনি। বম্মা যেন চাচা হয়ে উঠলেন। যদ্দিন বেঁচে ছিলেন বম্মা আমাদেরকে সন্তান-স্নেহে প্রতিপালন করেছেন। আমার এক ভাই রফিকে তো নিজের ছেলে বলেই পরিচয় দিতেন। আমরাও চাচার অভাব তাঁকে দিয়ে পূরণ করে নিতাম।

দাদীর আহ্লাদটুকু পেয়েছিলাম দাদার কাছে। মরহুম মহাতাপ উদ্দীন গোলদার। অসাধারণ ব্যক্তিত্ব-সম্পন্ন একজন সাধারণ মাপের মানুষ। তাঁর জীবন-কাহিনী সত্যিই কৌতুহলপূর্ণ। জন্মেছিলেন ভদ্রা-নদীর ওপারের বর্ধিষ্ণু গ্রাম চিংড়ায়। ওখানে তাঁর বাবার গাতি-তালুক দেখভাল করতেন। ডুমুরিয়ায় বসবাসকারী মরহুম নেছারউদ্দীন তাঁর একমাত্র কন্যা-সন্তানের জন্য তাঁকেই মনোনীত করেছিলেন। তাঁর হয়তো মনে হয়েছিল এমন যোগ্য পাত্রের হাতে মেয়েটিকে তুলে দিতে পারলে বিষয়-বৈভব ও কন্যাটির সুরক্ষা নিশ্চিত হবে।

বিয়ের ধার্যকৃত তারিখের পূর্বদিনে কাছারি-ঘরের ছোট্ট কুঠুরি-ঘরের দপ্তরে একাকী বসে প্রয়োজনীয় কেনাকাটার ফর্দ মিলাচ্ছিলেন। একটু রাত হয়ে এলে পশ্চিম দিকের জানালা দিয়ে একটা গাদা-বন্দুকের গুলি এসে তাঁর বুকে মৃত্যু-পরওয়ানা লিখে দিল। সেই থেকে সেই ছোট্ট কুঠুরিটি বন্ধই থাকত। জীবনে একদিন মাত্র ঢুকেছিলাম ঘরটিতে। তাও বাড়ির মৌলভী-সাহেবের সাথে। ওটা তাঁর স্টোর-রুমের মতো ব্যবহৃত হতো।

হত্যাকাণ্ডের পর সকলেই ভেবেছিলেন, বিয়েটা ভেঙে গেল। অনেকে দাদাকে নিজেকে মৃত্যুর মুখামুখি দাঁড় না করানোর পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু একমাত্র দাদার অনড় সিদ্ধান্তের কারণেই বিয়েটা হতে পেরেছিল।

আমরা জন্মের পর থেকে বাড়িটার যে শ্রী-সৌন্দর্য দেখে বড়ো হয়েছিলাম, তার সবটুকুই দাদার হাতে সাজানো।

আমাদের পাঁচ-ভাইয়ের মধ্যে দাদার সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিল মেজোভাই অলিয়ার। আমাকে দাদা কেমন যেন অন্যরকম এক বাঁধনে জড়িয়ে রাখতেন। মনে আছে, আর্মস্ট্রং চাঁদে নামলে দাদাকে খবরটা জানিয়েছিলাম। তাঁর অভ্যস্ত ধ্যানধারণায় কেমন একটা ধাক্কা খেয়েছিলেন যেন। তবু আমি বলেছি বলে কথাটা বিশ্বাস করে নিয়েছিলেন। এরপর থেকে আমার নাম দিয়েছিলেন বৈজ্ঞানিক। অথচ এই বিজ্ঞান ও তার জটিল রহস্যগুলি আমার কাছে কখনো সবটুকু খোলেনি। হৃদয় নিয়েই থেকেছি চিরকাল, গাণিতিক সূত্র ও যুক্তি দুর্বোধ্য মনে হয়েছে খুব।

যখন খুলনার সেন্ট যোসেফস স্কুলে ক্লাস এইটে পড়ি, তখন একরাতে দাদা না-ফেরার দেশে চলে গেলেন। কোন এক হাটবারে সন্ধ্যার পরে হাট থেকে ফিরে তাঁর আগলা-ঘরের বারান্দায় বসে কতো যে গল্প করলেন। পরদিন আমি খুলনায় যাবো বলে হাট থেকে মস্তবড়ো এক কাইনমাছ এনেছিলেন। বম্মাকে ডেকে বললেন, বৌমা। মাছের মাথাটা বৈজ্ঞানিককে দিয়ো। গল্প করতে করতে হঠাৎ বললেন, দাদা। শীত করছে যে !

ঘর থেকে লেপ এনে দিলাম। তবুও কাঁপছেন শীতে। আরো একটা লেপ। তারপরও শীত কমে না দেখে দালানে বম্মার কামরায় এনে শোওয়ানো হলো। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানিনা। সকালে উঠলাম কান্নার শব্দ শুনে। দাদা আর নেই। শীতের বাড়াবাড়ি হলে সেই রাতেই সরকারি ডাক্তারকে আনা হয়েছিল। তাঁর উপস্থিতিতেই ভোরবেলায় দাদার প্রাণবায়ুটুকু উড়ে চলে যায়।

পরে শুনেছিলাম, ঐদিন হাটে গিয়ে আমাদের রাইস-মিল-এ ঢুকে চতুর্দিক ঘুরেঘুরে দেখছিলেন। এক সময়ে মিলে কর্তব্যরত কাক্কুকে দীর্ঘক্ষণ নিরীক্ষণ করে নাকি বলেছিলেন, যাই রে শহীদ। ভালো থাকিস।

আমার এখনো মনে হয়, দাদা কি টের পেয়েছিলেন, তিনি চলে যাচ্ছেন !

কেউ কেউ তো নাকি টের পান। হয়তো তিনিও পেয়েছিলেন। কিন্তু আমাকে দিয়ে গেলেন এক মর্মভেদী অন্তর্মুখিনতা। তীব্র বেদনাবোধের এক-সমুদ্র অন্তর্গূঢ় নৈ:শব্দ। অব্যক্ত হাহাকার।

মনে আছে, রোজার দিনে সেহেরি খাওয়ার সময় হলে বাড়ির বাইরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে এক একটা নাম ধরে হাঁক ছাড়তেন। ওঠো তোমরা। সেহেরি খেয়ে নাও। তিনি সকলের প্রিয় জামাই। ডুমুরিয়ার আঞ্চলিক উচ্চারণে সাড়া দিত সবাই, উঠিছি জামোই !

এখনো কি কান পাতলে ভোর-রাতে তাঁর ডাক শোনা যাবে !

আপনি যেখানেই থাকুন দাদা, ভালো থাকুন। আল্লাহ্ আপনার সহায় হোন। আমিন। (চলবে………)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here