ডিজিটাল বাংলাদেশ: একুশের পরে (৪)

0
307

মোস্তাফা জব্বার: আমি মনে করি ২০২১ সালের পরবর্তী জ্ঞানভিত্তিক সমাজ, ডিজিটাল শিল্প বিপ্লবের দেশ বা উন্নত বাংলাদেশ কিংবা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন হবে দেশটির ডিজিটাল রূপান্তর। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে এখন থেকে সমাজ-সভ্যতার অগ্রগতির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো ডিজিটাল প্রযুক্তি।

আমরা এই প্রযুক্তির সমষ্টিকে ডিজিটাল শিল্প বিপ্লব, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, সোসাইটী ৫.০, ৫জি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, বিগডাটা বা অন্য যে কোন নামেই ডাকিনা কেন সকল অগ্রগতির নিয়ামক হচ্ছে ডিজিটাল রূপান্তর। সেজন্য আপাতত আমাদের কৌশল হলো চারটি। সেই চারটি কৌশল আমাদেরকে ২০২০-২১ সাল পার করে দিতে পারে। তবে নতুন প্রেক্ষিত ও নতুন প্রযুক্তির সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য এই কৌশলগুলোকে পরিবর্তনশীল করতে হতে পারে। আমাদের আপাত কৌশলগুলো হলো
১. শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তর ও মানবসম্পদ উন্নয়ন,
২. সরকারের ডিজিটাল রূপান্তর ও জনগণের সকল সেবা ডিজিটালকরণ
৩. শিল্প ও অর্থনীতির ডিজিটাল রূপান্তর
৪. একটি ডিজিটাল জীবনধারা গড়ে তোলা ও বাংলাদেশকে জন্মের প্রতিজ্ঞায় স্থাপন করা।

প্রথম কৌশলটি ডিজিটাল শিল্পবিপ্লব বা জ্ঞানভিত্তিক সমাজের উপযোগী মানব সম্পদ সৃষ্টি নিয়ে। আমরা এজন্য শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তরের বিষয়টিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছি। এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা আবশ্যক। দ্বিতীয় কৌশলটি সরকারের ডিজিটাল রূপান্তর বা একটি ডিজিটাল সরকার প্রতিষ্ঠা বিষয়ক। এর আওতায় সরকার পরিচালনা পদ্ধতি ডিজিটাল করা ছাড়াও জনগণের কাছে সকল সংস্থার সেবাকে ডিজিটাল উপায়ে উপস্থাপন করার বিষয়টিও রয়েছে। তৃতীয় কৌশলটি মূলত শিল্প ও অর্থনীতির ডিজিটাল রূপান্তর।

শিল্প-কল-কারখানা-ব্যবসা-বাণিজ্যসহ অর্থনীতির সকল ধারার ডিজিটাল রূপান্তর এর প্রধান উদ্দেশ্য। সামগ্রিকভাবে এই কৌশলের উদ্দেশ্য একটি ডিজিটাল, সৃজনশীল বা জ্ঞানভিত্তিক অথর্র্নীতিও গড়ে তোলা। চতুর্থ কৌশলটি হলো তিনটি কৌশলের সম্মিলিত রূপ বা একটি ডিজিটাল-জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্ন পূরণ। একই সাথে একটি ধর্মভিত্তিক জাতীয়তা ও সাম্প্রদায়িক চেতনার বিপরীতে একটি আধুনিক ভাষাভিত্তিক জাতি রাষ্ট্র গড়ে তোলার স্বপ্ন এটি।

কৌশল ১: ডিজিটাল শিক্ষা: শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তর ও মানবসম্পদ উন্নয়ন: বাংলাদেশের মতো একটি অতি জনবহুল দেশের জন্য দেশটির ডিজিটাল রূপান্তর ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রধানতম কৌশল হতে হবে এর মানবসম্পদকে সবার আগে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বা ডিজিটাল শিল্প যুগের উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তর করা। এদেশের মানবসম্পদের চরিত্র হচ্ছে যে, জনসংখ্যার শতকরা ৬৫ ভাগই পয়ত্রিশের নিচের বয়সী।

শতকরা ৪৯ ভাগের বয়স ২৫ বছরের নিচে। ২০১৫ সালের শুরুতে শুধু শিক্ষার্থীর সংখ্যাই ছিলো প্রায় ৪ কোটি। ১৭ সালে এই সংখ্যা ৫ কোটি ছাড়িয়েছে। ঘটনাচক্রে ওরা এখন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করে শিল্পযুগের প্রথম-দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্তরের দক্ষতা অর্জনে নিয়োজিত। ওরা চতুর্থ স্তরের শিল্পায়নের কোন খবরও জানেনা। ওদেরকে ডিজিটাল শিল্প বিপ্লব, সৃজনশীল অর্থনীতি বা জ্ঞানভিদ্তিক অর্থনীতির শিক্ষা দিতে না পারলে আমরা এই যুগটাকেও মিস করবো। ছাত্র-ছাত্রী ছাড়া অন্য শিক্ষিতরা সিংহভাগ প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ গ্রহণে সক্ষম।

অন্যদিকে বিদ্যমান জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক নারী, যাদের বড় অংশটি ঘর-কন্না ও কৃষিকাজে যুক্ত থাকলেও একটি স্বল্পশিক্ষিত নারী সমাজ পোশাক শিল্পে স্বল্পদক্ষ জনগোষ্ঠীতে লিপ্ত হয়ে গেছে। সামনের দিনে এই প্রবণতাটি থাকবেনা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্ট্টারনেট অব থিংস, বিগ ডাটা এনালাইসস ও রোবোটিক্স এই অবস্থার পরিবর্তন করবে। পোশাক শিল্পে একদিকে স্বল্প দক্ষ নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ কমবে-অন্যদিকে দক্ষ নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। আমাদের চ্যালেঞ্জ হবে স্বল্পদক্ষ নারীদেরকে চুতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দক্ষতা প্রদান করা। বিদ্যমান কায়িকশ্রমভিত্তিক শ্রমশক্তিকে নতুন প্রযুক্তিতে দক্ষ শ্রমিকে পরিণত করাটার প্রতি এখন থেকেই গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যদিকে নারীদের পোশাক শিল্প কেন্দ্রিক দক্ষতার ওপর একমাত্র নির্ভরতা না রেখে নতুন প্রযুক্তির দক্ষতা দিতে হবে।

পোশাক শিল্প খাতটিতে এই ধরনের আরও অনেক দক্ষ নারীর কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা থাকায় এদেরকে আরও দক্ষ করে গড়ে তোলা যায়। এজন্য এই খাতে যথাযথ উচ্চ দক্ষতা বিষয়ক প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত নারী সমাজের জন্য প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা যথাযথ নয়। এদেরকে ডিজিটাল যুগের শিক্ষা দিতে হবে। সুখের বিষয় যে, ডিজিটাল যুগে নারীদের কর্মক্ষেত্র এতো ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে যে, তাদেরকে আর পশ্চাদপদ বলে গণ্য করার মতো অবস্থা বিরাজ করছেনা।

মানবসম্পদ সৃষ্টির প্রধান ধারাটি তাই নতুন রূপে গড়ে ওঠতে হবে। প্রচলিত ধারার শিক্ষায় নিয়োজিত জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জ্ঞানকর্মী বানাতে হলে প্রথমে প্রচলিত শিক্ষার ধারাকে বদলাতে হবে। এজন্য আমরা আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কৃষি শ্রমিক বা শিল্প শ্রমিক গড়ে তোলার কারখানা থেকে জ্ঞানকর্মী তৈরি করার কারখানায় পরিবর্তন করতে পারি। আমাদের নিজের দেশে বা বাইরের দুনিয়াতে কায়িক শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক ও শিল্প শ্রমিক হিসেবে যাদেরকে কাজে লাগানো যাবে তার বাইরের পুরো জনগোষ্ঠীকে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষম ডিজিটাল কাজে সুদক্ষ তথা জ্ঞানকর্মীতে রূপান্তর করতে হবে।

বস্তুত প্রচলিত ধারার শ্রমশক্তি গড়ে তোলার বাড়তি কোন প্রয়োজনীয়তা হয়তো আমাদের থাকবেনা। কারণ যে তিরিশোর্ধ জনগোষ্ঠী রয়েছে, বা যারা ইতিমধ্যেই প্রচলিত ধারার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পেয়েছে এবং আরও বহু বছর পেতে থাকবে তাদের প্রচলিত কাজ করার দক্ষতা থাকছে এবং তারাই এই খাতের চাহিদা মিটিয়ে ফেলতে পারবে। বরং এই জনগোষ্ঠী এখনই বেকারত্বের যন্ত্রণায় ভুগছে। ফলে নতুন প্রজন্মকে ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থার সহায়তায় জ্ঞানকর্মী বানানোর কাজটাই আমাদেরকে সর্বাগ্রে করতে হবে। এর হিসাবটি একেবারেই সহজ।

বিদ্যমান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অবিলম্বে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলন করতে হবে। এটি বস্তুত একটি রূপান্তর। প্রচলিত দালানকোঠা, চেয়ার-টেবিল, বেঞ্চি বহাল রাখলেও এর শিক্ষকের যোগ্যতা, শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং শিক্ষার বিষয়বস্তু পরিবর্তন করতে হবে।

আমি ছয়টি ধারায় এই রূপান্তরের মোদ্দা কথাটা বলতে চাই।

ক. প্রথমত প্রোগ্রামিংসহ ডিজিটাল প্রযুক্তি বিষয়টি শিশুশ্রেণি থেকে বাধ্যতামূলকভাবে পাঠ্য করতে হবে। প্রাথমিক স্তরে ৫০ নাম্বার হলেও মাধ্যমিক স্তরে ১০০ ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে বিষয়টির মান হতে হবে ২০০। স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা, ইংরেজি-বাংলা-আরবি মাধ্যম নির্বিশেষে সকলের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য হতে হবে। পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরিক্ষায় বিষয়টিকে অপশনাল নয়, বাধ্যতামূলক করতে হবে। এজন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই খাতের অবস্থাটি নাজুক। স্কুল ও কলেজ স্তরে শতকরা ৪০ ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নেই। এমনকি যারা শিক্ষকতা করছে তারা এমপিওভুক্ত নয়। ্েই শিক্ষার জন্য উপযুক্ত পাঠক্রম ও প্রয়োজনীয় ও উন্নতমানের পাঠ্যবই থাকতে হবে। শিক্্যষক প্রশিক্ষন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ২০১৮ সাল নাগাদ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে বিষয়টি পাঠ্য হলেও প্রাথমিকে এই বিষয়ে কোন উদ্যোগও নেয়া হয়নি।

খ. দ্বিতীয়ত প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতি ২০ জন ছাত্রের জন্য একটি করে কম্পিউটার/ ল্যাপটপ আনুপাতিক হিসেবে কম্পিউটার ল্যাব গড়ে তুলতে হবে। এই কম্পিউটারগুলো শিক্ষার্থীদেরকে হাতে কলমে ডিজিটাল যন্ত্র ব্যবহার করতে শেখাবে। একই সাথে শিক্ষার্থীরা যাতে সহজে নিজেরা এমন যন্ত্রের স্বত্ত্বাধিকারী হতে পারে রাষ্ট্রকে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষায় ইন্টারনেট ব্যবহারকে শিক্ষার্থী-শিক্ষক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আয়ত্ত্বের মাঝে আনতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহকে বিণামূল্যে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে দিতে হবে। দেশজুড়ে বিণামূল্যের ওয়াইফাই জোন গড়ে তুললে শিক্ষায় ইন্টারনেটের ব্যবহারকে সম্প্রসারিত করবে। ইন্টারনেটকে শিক্ষার সম্প্রসারণের বাহক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। ইন্টারনেটের গতি বাড়াতে হবে এবং ইন্টারনেটেকে সাশ্রয়ী করতে হবে। শিক্ষার ডিজিটাল উপাত্তকে ইন্টারনেটে পাবার ব্যবস্থা করতে হবে।

গ. তৃতীয়ত প্রতিটি ক্লাশরুমকে ডিজিটাল ক্লাশরুম বানাতে হবে। প্রচলিত চক, ডাস্টার, খাতা কলম বইকে কম্পিউটার, ট্যাবলেট পিসি, স্মার্ট ফোন, বড় পর্দার মনিটর/টিভি বা প্রজেক্টর দিয়ে স্থলাভিষিক্ত করতে হবে। প্রচলিত স্কুলের অবকাঠামোকে ডিজিটাল ক্লাশরুমের উপযুক্ত করে তৈরি করতে হবে। ক্লাশরুম ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার দিয়ে করতে হবে। ক্লাশরুম মূল্যায়ন ব্যবস্থাকেও ডিজিটাল করতে হবে। এজন্য শিক্ষক প্রশিক্ষ্যণ অত্যাবশ্যক।

ঘ. চতুর্থত সকল পাঠ্য বিষয়কে ডিজিটাল যুগের জ্ঞানকর্মী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য উপযোগী পাঠক্রম ও বিষয় নির্ধারণ করে সেইসব কনটেন্টসকে ডিজিটাল কনটেন্টে পরিণত করতে হবে। পরীক্ষা পদ্ধতি বা মূল্যায়নকেও ডিজিটাল করতে হবে। অবশ্যই বিদ্যমান পাঠক্রম হুবহু অনুসরণ করা যাবেনা এবং ডিজিটাল ক্লাশরুমে কেবলমাত্র কাগজের বই দিয়ে শিক্ষা দান করা যাবেনা। কনটেন্ট যদি ডিজিটাল না হয় তবে ডিজিটাল ক্লাশরুম অচল হয়ে যাবে। এইসব কনটেন্টকে মাল্টিমিডিয়া ও ইন্টারএ্যাকটিভ হতে হবে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ডিজিটাল যুগের বা জ্ঞানভিত্তিক সমাজের উপযোগী বিষয়বস্তু শিক্ষা দেয়া। আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্হায় কার্যত এমনসব বিষয়ে পাঠদান করা হয় যা কৃষি বা শিল্পযুগের উপযোগী। ডিজিটাল যুগের বিষয়গুলো আমাদের দেশে পড়ানোই হয়না। সেইসব বিষয় বাছাই করে তার জন্য পাঠক্রম তৈরি করতে হবে।

ঙ. পঞ্চমত: সকল শিক্ষককে ডিজিটাল পদ্ধতিতে পাঠদানের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সকল আয়োজন বিফলে যাবে যদি শিক্ষকগণ ডিজিটাল কনটেন্ট, ডিজিটাল ক্লাশরুম ব্যবহার করতে না পারেন বা ডিজিটাল পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করতে না জানেন। তারা নিজেরা যাতে কনটেন্ট তৈরি করতে পারেন তারও প্রশিক্ষণ তাদেরকে দিতে হবে। কিন্তু শিক্ষকগণ কোন অবস্থাতেই পেশাদারী কনটেন্ট তৈরি করতে পারবেন না। ফলে পেশাদারী কনটেন্টস তৈরির একটি চলমান প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হবে। প্রস্তাবিত ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়কে ডিজিটাল শিক্ষার গবেষণা ও প্রয়োগে নেতৃত্ব দেবার উপযোগী করে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ক্রমান্বয়ে সকল বিশ্ববিদ্যালয়কে ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করতে হবে।

চ. ষষ্ঠত; তিরিশের নিচের সকল মানুষকে তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ জনগোষ্ঠী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তিতে বিশ্বজুড়ে যে কাজের বাজার আছে সেই বাজার অনুপাতে প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্হা করতে হবে। সরকারের যেসব মানবসম্পদ বিষয়ক প্রকল্প রয়েছে তাকে কার্যকর ও সময়োপযোগী করতে হবে। দেশের কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণের ব্যবস্হা করা যেতে পারে। এজন্য সরকার স্হাপিত ইউনিয়ন ডিজিটাল কেন্দ্রসমূহও ব্যবহৃত হতে পারে। আমি বিশেষ করে বিশ্বব্যাঙ্কের এলআইসিটি প্রকল্প, বেসিসের প্রশিক্ষণ প্রকল্পসহ, আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ও অন্যান্য মানবসম্পদ গড়ে তোলার প্রকল্পগুলোকে সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য অনুরোধ করছি। এখনও প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নের ধারা বাস্তবমুখী ও সঠিক নয়।

ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্হা গড়ে তোলাটি হবে সরকারের জন্য কঠিনতম চ্যালেঞ্জ। এখনও যেখানে শিক্ষার হারই ৭০ এর কাছে এবং যেখানে আমরা কেবল শিল্পযুগের শিক্ষায় আছি তাতে এটি হচ্ছে একটি মহাযজ্ঞ। তবে শিক্ষার রূপান্তর ছাড়া ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা ভাবাই যায়না।

কৌশল ২: ডিজিটাল সরকার\ সরকারের ডিজিটাল রূপান্তর ও জনগণের সকল সেবা ডিজিটালকরণ রাষ্ট্র ও সমাজের ডিজিটাল রূপান্তরের আরেকটি বড় বিষয় হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনাকারী সরকারের ডিজিটাল রূপান্তর। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, সরকার নামক প্রতিষ্ঠানটি অত্যন্ত প্রাচীন। এর পরিচালনা পদ্ধতিও মান্ধাতার আমলের।

আমরা এখন আধুনিক রাষ্ট্র নামক যে রাষ্ট্রব্যবস্হার কথা বলি এবং জনগণের সেবক সরকার হিসেবে যে সরকারকে চিহ্নিত করি তার ব্যবস্হাপনা বস্তুত প্রাগৈতেহাসিক। এক সময়ে রাজরাজড়ারা সরকার চালাতেন। তবে সেই ব্যবস্থাকে স্থলাভিষিক্ত করেছে ব্রিটিশদের সরকার ব্যবস্থা। সেটি আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে বহন করে আসছি। ব্রিটিশরা চলে যাবার এতোদিন পরও সেই ব্যবস্হা প্রবল দাপটের সাথে রাজত্ব করছে। কথা ছিলো সরকারটি অন্তত শিল্পযুগের উপযোগী হবে এবং তার দক্ষতাও সেই পর্যায়ের হবে। কিন্তু কৃষি যুগে থেকেই আমরা শিল্পযুগের সরকার চালাতে শুরু করার ফলে মানসিকতাসহ সকল পর্যায়েই আমাদের সংকট চরম পর্যায়ের।

একদিকে সামন্ত মানসিকতা ও অন্যদিকে আমলাতান্ত্রিকতা সরকারকে আষ্টেপিষ্টে বেধে রেখেছে। ৪৭ সালের একবার ও ৭১ সালে আরেকবার পতাকা বদলের পরও ব্রিটিশ আমলাতন্ত্র বদলায়নি। একটি স্বাধীন জাতির জন্য যে ধরনের প্রশাসন গড়ে ওঠা দরকার সেটিও গড়ে ওঠেনি। কাজ করার পদ্ধতি রয়ে গেছে আগের মতো। এই অবস্হার পরিবর্তন করতে হবে।

ক. প্রথমত সরকারি অফিসে কাগজের ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বন্ধ করতে হবে। ২১ সালের পর সরকারী অফিসে কাগজ ব্যবহার করা যাবেনা। সরকারের সকল অফিস, দপ্তর, প্রতিষ্ঠান ও সংস্হায় কাগজকে ডিজিটাল পদ্ধতি দিয়ে স্থলাভিষিক্ত করতে হবে। এজন্য সরকার যেসব সেবা জনগণকে প্রদান করে তার সবই ডিজিটাল পদ্ধতিতে দিতে হবে।

এখানেও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারি দপ্তরের বিদ্যমান ফাইলকে ডিজিটাল ডকুমেন্টে রূপান্তরিত করতে হবে। নতুন ডকুমেন্ট ডিজিটাল পদ্ধতিতে তৈরি করতে হবে এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতেই সংরক্ষণ ও বিতরণ করতে হবে। এইসব ডকুমেন্টের ডিজিটাল ব্যবহার এবং সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ডিজিটাল করতে হবে। সরকারের মন্ত্রীবর্গসহ এর রাজনৈতিক অংশকেও এজন্য দক্ষ হতে হবে। সংসদকে ডিজিটাল হতে হবে। সংসদ সদস্যদেরকেও হতে হবে ডিজিটাল ব্যবস্হা ব্যবহারে দক্ষ।

বিচার বিভাগকে কোনভাবেই প্রচলিত রূপে রাখা যাবেনা। মামলা মোকদ্দমার বিবরণসহ, বিচার কার্যক্রম পরিচালনা সম্পূর্ণ ডিজিটাল হতে হবে। বিচারক ও আইনজীবিদেরকে ডিজিটাল ব্যবস্হা ব্যবহারে দক্ষ হতে হবে। সরকারের আইনশৃ্ক্ষলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহ, ভূমি ব্যবস্থা, স্হানীয় প্রশাসন ও জনগণের সাথে সম্পৃক্ত সকল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তরিত করতে হবে। সরকারের কাছে থাকা অতীতের সকল তথ্য ডিজিটাল করতে হবে।

খ. দ্বিতীয়ত সরকারের সকল কর্মচারি-কর্মকর্তাকে ডিজিটাল যন্ত্র দক্ষতার সাথে ব্যবহার করতে জানতে হবে। এজন্য সকল কর্মচারি কর্মকর্তাকে ব্যাপকভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। নতুন নিয়োগের সময় একটি বাধ্যতামূলক শর্ত থাকতে হবে যে, সরকার যেমন ডিজিটাল পদ্ধতিতে কাজ করবে সরকারে নিয়োগপ্রাপ্তদেরকে সেই পদ্ধতিতে কাজ করতে পারতে হবে। হতে পারে যে, প্রচলিত শিক্ষা-প্রশিক্ষণ থেকে এই যোগ্যতা কারও পক্ষে অর্জন করা সম্ভব হবেনা। এজন্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি নিয়োগের শর্ত হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তির সাধারণ জ্ঞানকে একটি শর্ত হিসেবে রেখে এদের সকলের জন্য নতুন প্রশিক্ষণের ব্যবস্হা সরকারকেই করতে হবে। জন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্হায় ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে মেখাতে হবে।

গ. তৃতীয়ত সকল সরকারি অফিসকে বাধ্যতামূলকভাবে নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকতে হবে এবং সকল কর্মকাণ্ড অনলাইনে প্রকাশিত হতে হবে। সরকারের কর্মকর্তা কর্মচারিদেরকেও সার্বক্ষণিকভাবে নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকতে হবে। সরকার যে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করছে তার সাথে ডাটা সেন্টার স্হাপন, ডাটা সেন্টারের ব্যাকআপ তৈরি বা আরও প্রাসঙ্গিক কাজগুলো করতে হবে।

ঘ. চতুর্থত সরকারের সকল সেবা জনগণের কাছে পৌছানোর জন্য জনগণের দোড়গোড়ায় সেবাকেন্দ্র থাকতে হবে। যদিও এরই মাঝে ইউনিয়ন পর্যায়ে ডিজিটাল কেন্দ্র স্হাপিত হয়েছে তথাপি সিটি কর্পোরেশন ও তার প্রতি ওয়ার্ডে, পৌরসভা ও তার প্রতি ওয়ার্ডে এবং সামাজিক কেন্দ্র, বাজার, ডাকঘর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক ডিজিটাল কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। দেশজুড়ে থাকতে হবে বিণামূল্যের ওয়াইফাই জোন। জনগণকে সরকারের সাথে যুক্ত হবার প্রযুক্তি ব্যবহারকে সকল সুযোগ দিতে হবে। থ্রিজির প্রচলন এই বিষয়টিকে সহায়তা করলেও, এর ট্যারিফ এবং সহজলভ্যতার চ্যালেঞ্জটি মোকাবেলা করতে হবে। সারা দেশে বিণামূল্যের ওয়াইফাই ব্যবস্হা স্হাপন করতে হবে।

ঙ. পঞ্চমত; দেশের বিদ্যমান সকল আইনকে জ্ঞানভিত্তিক সমাজের উপযোগী করতে হবে এবং সেই অনুপাতে আইন ও বিচারবিভাগ ও আইনশৃঙক্ষলা প্রয়োগকারী সংস্হাসমূহকে জ্ঞানভিত্তিক সমাজের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। রাষ্ট্রকে মেধাসম্পদ রক্ষা ও ডিজিটাল অপরাধ মোকাবেলায় সকল প্রকারের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

চ. ষষ্ঠত; সরকারের সাথে যুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহকে ডিজিটাল করতে হবে। অর্থনীতি, শিল্প-কল কারখানা, মেধাসম্পদ, আইন-বিচার, আইনশৃঙক্ষলা রক্ষাকারি বাহিনী ও সামরিক বাহিনীকে ডিজিটাল করতে হবে।

মাত্র ছয়টি করে পয়েন্টে যতো ছোট করে আমি কাজগুলোর কথা উল্লেখ করেছি তাতে মনে হতে পারে খুব সহজেই বোধহয় সব হয়ে যাবে। কিন্তু আমি মনে করি সরকার যুদ্ধকালীন প্রস্তুতিতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেও ২০২১ সালে একটি ডিজিটাল সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে হিমশিম খাবে। আমি নিজে মনে করি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে ডিজিটাল সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

এর প্রধানতম কারণ হচ্ছে সরকার তার নিজের প্রশাসনকে ডিজিটাল করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেনি। সরকারের জনবলের মাঝে প্রযুক্তি ব্যবহারের অদক্ষতা ছাড়াও আছে দুর্নীতির প্রকোপ। ডিজিটাল ব্যবস্হা প্রয়োগ করা হলে সরকারের দুর্ণীতিবাজ আমলারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে তারা ডিজিটাল রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে ঠেকিয়ে দেবার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

ভূমি, বিচার, আইনশৃঙক্ষলা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিশেষভাবে দুর্নীতির কোটারি আছে। এই খাতগুলোতে যদি কঠোরভাবে ডিজিটাল রূপান্তরের প্রয়াস গ্রহণ না করা হয় তবে ডিজিটাল সরকারের ধারনাই ভেস্তে যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here