শমীন্দ্রনাথ, যে বালক তারার আলোয় ঘুমাল

0
372

কুলদা রায়: রবীন্দ্রনাথ যাঁর চেহারা আর স্বভাবের মধ্যে নিজের শৈশবকে খুঁজে পেয়েছেন – কৌতুক ছলে নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে যাঁকে ‘শমী ঠাকুর’ বলে অভিহিত করেছেন-তিনি কনিষ্ঠ পুত্র পঞ্চম ও শেষ সন্তান শমীন্দ্রনাথ। ১৮৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর শনিবার সন্ধ্যা ছ’টায় জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতেই শমীন্দ্রের জন্ম।

বড় দাদা এবং দিদিদের মতো শমীর শৈশব কেটেছে কখনও জোড়াসাঁকোতে, কখনও শিলাইদহ-কুঠিবাড়িতে। বেশিরভাগ সময়ই স্নেহময়ী জননী মৃণালিনী দেবীর অভিভাবকত্বে – দাদা ও দিদিদের স্নেহছায়ায়। কেন না, পিতা রবীন্দ্রনাথ সে সময় শুধু জমিদারির তত্ত্বাবধায়ক কিংবা পুত্রকন্যার জনকরূপে নিজের সংসারে আবদ্ধ নন। পারিবারিক জীবনের বাইরে আছে তাঁর সাহিত্যিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন। তাই তাঁকে যোগ দিতে হয় কলকাতা-কংগ্রেসের অধিবেশনে, ‘খামখেয়ালি সভা’র অনুষ্ঠানে, ঢাকা কিংবা নাটোরে অনুষ্ঠিত রাজনৈতিক প্রাদেশিক সম্মিলনে, বিজ্ঞানী বন্ধু জগদীশচন্দ্র বসুর বক্তৃতা-সভায় এবং ত্রিপুরার মহারাজা রাধাকিশোর মাণিক্যের সংবর্ধনা-উৎসবে। এরই মাঝে আছে ‘ভারতী’ পত্রিকার সম্পাদনা, জমিদারি-সংক্রান্ত মামলা-মোকদ্দমা।

দিদি মাধুরীলতা লিখছেন বাবাকে, “…খোকাবাবু (শমী) ভালো আছে। তার হাম বেরিয়েছে। তুমি বোধ হয় মায়ের কাছ থেকে শুনেছে। এখন বেশ মীরির সঙ্গে খেলাধূলা করছে। তোমাকে লিখছি, ওর সেটা ভাল লাগছে না। ও চায় এখন ওর সঙ্গে খেলা করি। খোকাতে, আমাতে, রাণীতে (মেজ বোন রেণুকা) আর মীরাতে (ছোট বোন) মিলে তাসের দূর্গ করে, আর পুতুল সৈন্য করে প্রায় ঘণ্টাখানেক খেলা করি…” আর একটি চিঠিতে মাধুরীলতার লিখেছেন, “রথী (ভাই) জব্বরের কাছে লাঠি খেলা শেখে আর শমীকে শেখায়/ কাল বাদলা ছিল বলে হয়নি।” ২১ আগস্ট ১৮৯৯ মাধুরীলতার ছিঠি, “মীরা পণ্ডিত মহাশয়ের কাছে ‘ক, খ, গ’ পড়ছে। শমী বাবু বড় বেশী পরের দিকে নজর রেখে কাজ করেন। তিনি ’18’ অবধি গুণতে শিখেছেন, এবং রোজ একখানা ছিঠি লেখেন।…”

১৯০১ সালের ডিসেম্বর মাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে স্থাপন করেছেন ব্রহ্মবিদ্যালয়। সেখানে বাসাও করেছেন। রথীন্দ্রনাথ ছিলেন ছাত্র। শমীর তখন মাত্র চার বছর বয়স। দিদি মীরার সঙ্গে ছবি আঁকতে যেতেন।

এরমধ্যে তাঁর মা মৃণালিনী দেবী ও মেঝদিদি রেণুকা অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯০২ তাঁদেরকে কোলকাতায় আনা হল। রোগতাপে বিভ্রান্ত রবীন্দ্রনাথ শমীকে তাঁর শিক্ষক সুবোধ মজুমদারের সঙ্গে শান্তিনিকেতনে পাঠিয়েছেন।
মাত্র ছ’বছর বয়সে শমী মাতৃহারা হন। মায়ের পিসি রাজলক্ষ্মী দেবি তাঁদের দেখাশুনার দায়িত্ব নেন।
মায়ের মৃত্যুর ন’মাস পরেই মেজদিদি রেণুকার অকাল মৃত্যু হল।

এরপরে তিনি শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয়ে নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছেন। তাঁর সরল শান্ত হাস্যোজ্জ্বল মুখ, তাঁর নম্র-শিষ্ট আচরণ সকলকে আকৃষ্ট করত, মুগ্ধ করত। নামমাত্র বিলাসিতা ছিল না তাঁর পোশাকে-আশাকে, ব্যবহারে-চালচলনে ছিল না বিন্দুমাত্র অহংকার। কেউ তাঁকে কখনো বিমর্ষ দেখেনি। “আমার ছোট ছেলে শমী লোকজন এলে তাদের মোট ঘাড়ে করে আনত”- বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। শমী বরাবরই দুর্বল স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন – তাই বড় ছেলেরা তাঁকে বেশি ভারী বোঝা বইতে দিতেন না, রেহাই দিতে চাইতেন তাঁরা। কিন্তু শমী তাতে ক্ষুণ্ন হতেন – দুঃখিত হতেন।

অধ্যাপক যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় কিংবা ভূপেশচন্দ্র রায়ের সঙ্গে প্রতি বিকেলে যেতেন শান্তিনিকেতনের প্রতিবেশি গ্রাম ভুবনডাঙায় – সঙ্গে থাকত হোমিওপ্যাথি ওষুধের বাক্স। অসুস্থ-রোগার্তদের প্রয়োজন মতো সে-সব ওষুধ বিলিয়ে দিতেন – কখনও রোগীকে বিছানায় বসিয়ে স্বহস্তে ওষুধ খাওয়াতেন। রুগ্ন ছিলেন বলে খেলাধূলা করার সুযোগ পেতেন না – তাই বিকেলে খেলার মাঠের পরিবর্তে যেতেন গ্রামের পথে।

দাদা রথীন্দ্রনাথ শমীর চেয়ে আট বছরের বড়ো। দাদাই শমীর দেখাশুনা করতেন। কৃষিবিদ্যা শেখার জন্য তিনি আমেরিকা চলে গেলেন। শমী তাঁকে তখন চিঠিতে আশ্রমের খবর দিতেন। লিখতেন তাঁর বন্ধুরা কে কী করছে, তাঁর নিজের পড়াশুনা কেমন চলছে – এ ছাড়া কখন কোন গাছে কী ফুল ফুটেছে, জ্যোৎস্নারাতে কোথায় বেড়াতে যাচ্ছেন তাঁরা, ছাত্রদের সভায় তিনি কোন কবিতা আবৃত্তি করেছেন ইত্যাদি বিচিত্র সব খবর।

বিদ্যালয়-জীবনের ফাঁকে ফাঁকে শমীন্দ্রনাথ বাবা, দাদা ও ছোট দিদির সঙ্গে বেড়াতে গেছেন শিলাইদহের পদ্মাতীরে – কখনওবা বড়দিদি মাধুরীলতার স্বামী-গৃহ মজঃফরপুরে। কখনও আবার রাজলক্ষ্মী দিদিমার সঙ্গে গিরিডিতে। রবীন্দ্রনাথ ২৪ এপ্রিল ১৯০৭ চিঠিতে জানাচ্ছেন, “শমী ঠাকুর সেদিন লাইব্রেরির বই গোছাতে অতিরিক্ত পরিশ্রম করাতে জ্বরে পড়েছে। জ্বরে পড়ে খুব গান ও কাব্যালোচনা করচে। আজকাল হঠাৎ তার গানের উৎসাহ অত্যন্ত বেড়ে উঠেছে। প্রায়ই ‘এ কি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ’ গেয়ে বেড়াচ্ছে।…”

প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, “যাহাকে ঋতু উৎসব বলে তাহার প্রবর্তক হইতেছেন, রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠপুত্র শমীন্দ্রনাথ। ১৩১৩ সালের শ্রীপঞ্চমীর দিন তাহার উদ্যোগে এই ঋতু উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। শমীন্দ্রনাথ এবং আরো দুইজন ছাত্র বসন্ত সাজে, একজন সাজে বর্ষা; আর তিনজন হয় শরৎ। …শমীন্দ্রনাথ এ উৎসবে ‘এ কি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ, প্রাণেশ হে’ গানটি করেন। শান্তিনিকেতনে ঋতু উৎসবের ইহাই প্রথম অর্ঘ্য।” এ ঘটনার সময়ে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে ছিলেন না। ১৩১৫ সালে গ্রীষ্মাবকাশের পর রবীন্দ্রনাথ আনুষ্ঠানিকভাবে ঋতু উৎসবের উদ্বোধন করেন। তার আট মাস আগেই শমী চলে গেছেন অন্য কোনও জগতে – অন্য কোনও উৎসবে। কবি পুত্রশোককে রূপান্তরিত করেছেন প্রকৃতি-বন্দনায়। এই ঋতু উৎসব বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে।

১৯০৭ সালের পূজার ছুটি। কনিষ্ঠা কন্যা মীরার অসুস্থতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বেশ বিব্রত। ছুটিতে শমীকে কোথায় রাখবেন সেই চিন্তায় ব্যাকুল। ভেবেছিলেন আশ্রমের শিক্ষক সুবোধচন্দ্র মজুমদারের সঙ্গে তাঁকে দিল্লী পাঠাবেন। কিন্তু সেখানে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাবের কথা শুনে পিছিয়ে গেলেন। শরণ নিলেন বন্ধু শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের। তাঁকে লিখলেন শমী কোলকাতা পছন্দ করে না, সেখানে যেতেও চায় না – অথচ ছুটিতে শান্তিনিকেতনে তাঁর একলা ঠেকে। তাই তিনি শমীকে শ্রীশচন্দ্রের শ্বশুরালয় মুঙ্গেরে পাঠাতে ইচ্ছুক – কেন না শ্রীশচন্দ্রের পরিবারবর্গ তখন সেখানেই। তা ছাড়া – “শমী এত অল্প জায়গা জোড়ে এবং এত নিরুপদ্রব যে তার আগমনে তোমাদের মুঙ্গের সহরের শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা নেই।”

শেষ পর্যন্ত ১৬ অক্টোবর বিজয়াদশমীর দিন শমীন্দ্রনাথ বন্ধু ভোলার সঙ্গে তাঁর মামার বাড়ি মুঙ্গের যাত্রা করেন। ছুটি-শেষে বিদ্যালয় খোলার মুখে কলকাতায় রবীন্দ্রনাথের কাছে দুঃসংবাদ পৌঁছল শমীর কলেরা হয়েছে। তক্ষুণি (১৭ নভেম্বর) তিনি ডাক্তারসহ ছুটলেন মুঙ্গের – বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যাপক ভূপেন্দ্রনাথ সান্যালকে সেখানে যেতে অনুরোধ জানিয়ে টেলিগ্রামও পাঠালেন। সকলের প্রচেষ্টা নিষ্ফল করে ৭ অগ্রহায়ণ (২৪ নভেম্বর) মাত্র এগারো বৎসর ন’মাস বয়সে শমী শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন। ঠিক পাঁচ বছর আগে এমনই এত সাতই অগ্রহায়ণ শমীর মা মৃণালিনী দেবীর মৃত্যু ঘটেছিল। কী আশ্চর্য যোগ।

পুত্রশোকাতুর রবীন্দ্রনাথ রাত্রে ট্রেনে আসতে আসতে দেখলেন জ্যোৎস্নায় আকাশ ভেসে যাচ্ছে, কোথা কিছু কম পড়েছে তার লক্ষণ নেই। তাঁর মন বললে, কম পড়েনি – সমস্তের মধ্যে সবই রয়ে গেছে, আমিও তারি মধ্যে। সমস্তর জন্যে আমার কাজও বাকি রইল। যতদিন আছি সেই কাজের ধারা চলতে থাকবে। সাহস যেন থাকে, অবসাদ যেন না আসে, কোনওখানে কোনও সূত্র যেন ছিন্ন হয়ে না যায় – যা ঘটেছে তাকে যেন সহজে স্বীকার করি, যা কিছু রয়ে গেল তাকেও যেন সম্পূর্ণ সহজ মনে স্বীকার করতে ত্রুটি না ঘটে।

এই সংকল্প নিয়ে শোকাহত শান্তিনিকেতনে পৌঁছলেন রবীন্দ্রনাথ। স্বাভাবিকভাবেই কথাবার্তা বলছেন আশ্রমিকদের সঙ্গে। তাঁর শান্ত-সংযম ব্যবহারে সকলে স্তম্ভিত। কেবল তাঁর বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ যখন দেখা করতে এলেন, রবীন্দ্রনাথের চোখে দেখা গেছে জলের রেখা। বড়দাদাও শোকবিমূঢ়, কেবল ছোটভাইয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন আর বারবার অস্ফুট স্বরে বলছেন ‘রবি! রবি!’ এরই মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ডেকে পাঠালেন অধ্যাপক যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়কে – যাঁর সঙ্গে পার্শ্ববর্তী গ্রাম ভুবনডাঙায় বেড়াতে যেতেন বালক শমী। একটি পুঁটলি হাতে তুলে দিয়ে বললেন, শমীর এই কাপড়-জামাগুলো ভুবনডাঙার ছাত্রদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ো।

রবীন্দ্র-রচনায় শমীন্দ্রনাথের সাদৃশ্য রয়েছে কোনও বালক চরিত্রের সঙ্গে। ‘ডাকঘর’ নাটকের চিররুগ্ন-সৌন্দর্যমুগ্ধ ও কল্পনাপ্রবণ বালক অমলের মধ্যে শমীর প্রতিচ্ছায়া দেখেছেন কেউ কেউ। শমীর অন্য এক দোসর বৃক্ষ-প্রাণ ‘বলাই’। আর, ‘শিশু’ কাব্যের নায়ক খোকা যে শমীন্দ্রনাথ তা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই স্বীকার করেছেন। তিনি লিখেছেন, “…কবিতাগুলি যখন লিখছিলাম তখন শমী ও তার মায়ের জীবনটাই আমার সামনে ছিল।… খোকা এবং খোকার মার মধ্যে যে ঘনিষ্ঠমধুর সম্বন্ধ সেইটি আমার গৃহস্মৃতির শেষ মাধুরী – তখন খুকী ছিল না – মাতৃশয্যার সিংহাসনে খোকাই (শমীন্দ্র) তখন চক্রবর্তী সম্রাট ছিল। সেইজন্যে লিখতে গেলেই খোকা এবং খোকার মার ভাবটুকুই সূর্য্যাস্তের পরবর্তী মেঘের মত নানা রঙে রাঙিয়ে ওঠে – সেই অস্তমিত মাধুরীর সমস্ত কিরণ এবং বর্ণ আকর্ষণ করে আমার অশ্রুবাষ্প এইরকম খেলা খেলবে – তাকে রিবারণ করতে পারি নে।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here