গোধূলি লগ্নে কি ভোরের ফুল ফুটবে

0
154

সাজ্জাদ আলম খান: বিশ্বখ্যাত কবি Robert Herrick তার To Daffodils কবিতায় প্রার্থনা জানিয়েছিলেন, বিকেলেও যেন ফুলটি প্রস্ফুটিত থাকে। লিখেছিলেন, ‘Fair Daffodils, we weep to see/ You haste away so soon/ As yet the early-rising sun /Has not attain’d his noon.’ কিন্তু প্রকৃতির কাছে সে প্রার্থনার সারা মেলেনি। কবি মনের আকুতি ঊর্ধ্বাকাশে লীন হয়ে যায়। তাতে কবি কতটুকু হতাশ হয়েছিল, তা জানা যায়নি।

তাতে কি, ড্যাফোডিল তার সৌন্দর্য নিয়ে আজও সুবাস ছড়াচ্ছে চারপাশে। আমরাও কী ব্যাংকিং খাত নিয়ে সে ধরনের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। ?নির্বাচনী বছর বলে, অর্থমন্ত্রীর বিশেষ নজর কেড়েছে, পতনমুখী এই খাত। নিশ্চিত করেছেন, এই বছরে বিপর্যয়টা ঠেকানো হবে। কিন্তু ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ কড়া নাড়ছে ?এই খাতে। সুরক্ষায় নেয়া হচ্ছে না টেকসই পদক্ষেপ। কথামালায় প্রত্যাশা জাগিয়ে তোলা হচ্ছে। ব্যাংক ঋণের সুদ হার কমিয়ে আনতে অব্যাহত চাপের মুখে অর্থমন্ত্রী বেইল আউট কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছেন। এতে শুধু তিনি রেওয়াজ ভাঙেননি; কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছেন। তবুও সুদ হার কবে কমানো হবে, তা ব্যাংক উদ্যোক্তারা হলফ করে বলতে পারছেন না।

ব্যাংকিং খাতের উদ্যোক্তাদের চাপ বেশ প্রবল, তা আগে এত প্রকট আকারে দেখা যায়নি। গেল ৩০ এপ্রিল ছুটে গেলেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস অফিসে। ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বললেন, নির্বাচনী বছরে বিপর্যয় ঘটাতে দেয়া যাবে না। ঘোষণা এলো নিয়ন্ত্রণমূলক সংস্কারের। জানিয়ে দিলেন, অর্থসংকট কাটিয়ে উঠতে সরকারি তহবিলের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা যাবে। এর আগে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ বেসরকারি ব্যাংকে রাখার বিধান ছিল।

এক এপ্রিল ফের বৈঠকে বসলেন নীতি নির্ধারকরা। জানা গেল সেখানকার সিদ্ধান্ত। সমঝোতার পরে জানালেন, মুদ্রা প্রবাহ বাড়বে, কিন্তু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বাধ্যতামূলক নগদ জমার হার সিআরআর এক শতাংশ কমিয়ে দিল সরকার। এর ফলে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর হাতে যাবে ১০ হাজার কোটি টাকা। বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেট পেশের মাসেই তিনি তা করতে চান, সে সময়ে তা হবে কিনা, তা নিয়ে রয়েছে সংশয়।

ব্যাংকগুলোতে এখন আমানত কমছে। চাহিদা অনুযায়ী সময়মতো টাকা ফেরত দিতে পারছে না কোনো কোনো ব্যাংক। সিআরআর কমানোতে ঋণ বাড়বে। তাতে আবার পুরনো খেলাপি রোগে জড়িয়ে পড়তে পারে। ব্যাংকগুলোর ঋণ আমানত অনুপাতের সীমা সমন্বয়ের সময় বাড়ানো হলো। নতুন সময় ২০১৯ সালের মার্চ পর্যন্ত। এর সুফল পুঁজিবাজারে মিললেও, দফায় দফায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন নিয়ন্ত্রক সংস্থার দক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

অনিয়ম আর দুর্নীতির করাল গ্রাসে দেশের ব্যাংকিং খাত। খেলাপির ভারে জর্জরিত এ খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার তাগিদ নীতি নির্ধারকদের কর্ণকুহুরে আর পৌঁছায় না। সরকারি ব্যাংকগুলো তহবিল জোগানে বরাবরই আস্থা রেখেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওপর। আর এখন বিপর্যস্ত বেসরকারি ব্যাংকও আস্থা রাখতে চায় সরকারের ওপর। তবে আস্থা রেখে পুরোপুরি নিরাশ হচ্ছে না সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক।

নতুন প্রজন্মের ফারমার্স ব্যাংক বাঁচাতে ৭১৫ কোটি টাকার তহবিল হচ্ছে। সরকারি চার ব্যাংক ও ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ এ তহবিলের জোগান দেবে। তহবিল জোগানোর বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা গেছে বাংলাদেশ ব্যাংকে। স্বায়ত্তশাসিত কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ফরমান জারি, প্রমাণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজনৈতিক চাপ কতটুকু। ব্যাংকটির অবস্থা এতই খারাপ, বেসরকারি ব্যাংক হওয়ার পরও এটিকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের হস্তক্ষেপ লাগছে। তীব্র তারল্য সংকট, মূলধন ঘাটতি, ঋণ বিতরণে অনিয়মসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত ফারমার্স ব্যাংক।

গ্রাহকের আমানতও ফেরত দিতে ব্যর্থ হচ্ছে ব্যাংকটি। ফলে সরকার না বাঁচালে ব্যাংকটির ভেঙে পড়া ছাড়া কোনো গতি ছিল না। ব্যাংকিং খাতকে এ কলঙ্ক থেকে বাঁচাতেই সরকার ফারমার্স ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে সব রকম চেষ্টা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় ৭১৫ কোটি টাকা মূলধন জোগানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

৭১৫ কোটি টাকার মধ্যে আইসিবি দিচ্ছে ৭৫ কোটি টাকা। অবশ্য এর আগেও ব্যাংকটিতে প্রতিষ্ঠানটির ৪৫ কোটি টাকার শেয়ার কেনা রয়েছে। সবমিলিয়ে আইসিবির শেয়ারের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ১২০ কোটি টাকার। আইসিবি ছাড়া সোনালী, জনতা, অগ্রণী এবং রূপালী ব্যাংক ফারমার্স ব্যাংককে ১৬০ কোটি টাকা করে জোগান দেবে। নতুন করে ৭১৫ কোটি টাকার জোগান দেয়া হলে ফারমার্স ব্যাংকের মোট তহবিল জোগানোর পরিমাণ দাঁড়াবে ১ হাজার ১০০ কোটি টাকায়।

এর মধ্যে ব্যাংকটির পরিচালকদের ৩৪০ কোটি টাকা রয়েছে। ডিসেম্বর শেষে আলোচিত এ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২৩ কোটি ১৮ লাখ টাকা; যা এ সময় পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট বিতরণ করা ঋণের ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ। আবার দেখা যাচ্ছে অনিয়ম-দুর্নীতির পর বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তন হলেও নতুন করে মূলধন জোগান দিচ্ছেন না উদ্যোক্তারা।

আবার ঋণের টাকাও ফেরত আনতে পারছে না। সরকারি ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি বাড়ছেই। এই ঘাটতি পূরণের জন্য দেদার টাকা দিয়ে যাচ্ছে সরকারও। আগামী বাজেটে দুই হাজার কোটি টাকা দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ রয়েছে। সোনালী, জনতা, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাকাবের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা।

ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেরই নৈতিকতার বড় স্খলন ঘটেছে। যার ফলে ঘটছে হলমার্ক এবং বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির মতো ঘটনা। এই খাতকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য অনিয়ম প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। সব অনিয়মের বিচার হতে হবে। নৈতিকতার উন্নয়নে এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি আরো জোরদার করতে হবে। নিয়মবহির্ভূত ঘটনা নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। বড় যেসব অনিয়ম ঘটেছে, সেগুলো বিচারের আওতায় আনতে হবে।

এসব ঘটনা প্রশ্রয় দিলে ব্যাংকিং খাতে নৈতিকতার আরো অবক্ষয় ঘটবে। ব্যাংকিং খাতের উদ্যোক্তারা এই সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বলয় বিস্তার করছে নীতি নির্ধারকদের মাঝে। কয়েক মাস আগে ব্যাংকে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আইনি কাঠামো তৈরি করেছে। কিন্তু ব্যাংক যে সাধারণ কর্পোরেটের মতো নয়, সেটা বলার কেউ নেই।

উদ্যোক্তাদের চেয়ে হাজার গুণ বেশি বিনিয়োগ থাকে সাধারণের। স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মতো এখানে মালিকানা স্বত্বটা এক ধরনের নয়। পরিচালনা পর্ষদকে কায়দা করে ব্যবহার করতে পারলেই বেশিরভাগ উদ্যোক্তাদের কব্জায় থাকে পুরো ব্যাংক। নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ায় অনেকে তখন পরিচালনা পর্ষদের অনায্য নির্দেশনাও বাস্তবায়ন করে থাকে।

ব্যাংক উদ্যোক্তারা এখন রাষ্ট্রের কাছে ইনডেমনিটি চায়। অনিয়ম, দুর্নীতির তথ্য যেন সহজেই প্রকাশ ও প্রচার না করা যায়। তথ্য প্রদানে জটিলতা তৈরি করতে, আইনি বেড়াজালে মনোযোগী হয়ে উঠেছেন, ব্যাংক খাতের উদ্যোক্তারা। আপাতত, এ ধরনের আইনি প্রক্রিয়ায় জড়াবেন না অর্থমন্ত্রী, এমনটি তিনি গণমাধ্যম কর্মীদের জানিয়েছেন। কিন্তু এ অবস্থানই বা কত দিন ধরে রাখতে পারবেন? নির্বাচনী বছরে প্রভাব বলয় বিস্তারকারীরা, নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধিতে এগিয়ে থাকেন।

গণমাধ্যমের ওপর দোষ চাপানোর রেওয়াজ অনেক দিনের। বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশনের অভিযোগ এনে নিজ প্রতিষ্ঠানকে পবিত্র হিসাবে চিহ্নিত করা হয় নানা সময়ে। কিন্তু তাতে সবচেয়ে ক্ষতি হয়, সেবা গ্রহীতাদের। নায্যমূল্যে প্রয়োজনীয় সেবা বঞ্চিত হন সাধারণ মানুষ। প্রতারণার জাল হয় বিস্তৃত।

দেশেও তাৎক্ষণিক তথ্য পাওয়ার অধিকার সবসময় মেলে না। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথ বেশ বন্ধুর। সে অভিযাত্রায় আরও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে চান এসব উদ্যোক্তা। অবাধ তথ্য প্রবাহের এ যুগে এমন দাবি বাস্তবায়ন হলে পিছনের পথে চলতে হবে সবাইকে। বেইল আউটের নেপথ্য কুশীলবদের চেনা-জানার সুযোগ কম। কিন্তু কাণ্ডারীকে তো সতর্ক থাকতে হবে। কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, ‘দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার/ লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি-নিশীথে, যাত্রীরা হুশিয়ার!’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here