বাহুবলে প্রাথমিক শিক্ষার কার্যক্রম  ‘মনিটরিং টিম’ গঠন 

0
157
নিরঞ্জন গোস্বামী শুভ, হবিগঞ্জ : হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মোট রয়েছে ১০৩টি ।  বর্তমানে সর্বমোট যে ১০৩ টা বিদ্যালয় তাও শুধু নামেই মাত্র। এসব বিদ্যালয়ের দেখা-শোনার জন্য সার্বিক তথ্য সংগ্রহ করা।
কি কি প্রয়োজন আছে কি নেই এসবই করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে রাখা হয়েছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস।উপজেলার অন্তর্গত পর্যবেক্ষণ করতে উপজেলা শিক্ষা অফিসে মূল কাজে সহায়তা ও পর্যবেক্ষণ করতে ১ জন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং ২ জন সহকারি প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আছেন। কিন্তু কোনো কাজই করা হচ্ছে না, নাকি আমাদের দেশে কর্তব্য বলতে কিছুই নেই । ফলে এখন জনগনের মধ্যে কেবল একটি প্রশ্ন তাদের বাচ্চাদের প্রাথমিক শিক্ষার ভবিষ্যত ?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অযোগ্যদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া, শিক্ষকদের যখন খুশি তখন স্কুলে আসা-যাওয়া, শ্রেণী কক্ষে গাইড বই দেখে পাঠদান করানো, অন্য কাজের দোহাই দিয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নির্ধারণ না করা। সরকার বরাদ্দ দিলেও প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণীতে পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ না থাকা, কোনো কাজ না থাকা সত্ত্বেও ক্লাস ফাঁকি দিয়ে উপজেলা পরিষদে প্রধান শিক্ষকদের সময় কাটানো, ক্লাসরুমে শিক্ষকদের মোবাইল ফোন নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ে নিজেদের ছবি আপলোড নিয়ে ব্যস্ত থাকা, শিক্ষকদের মধ্যে আবার রয়েছে শক্ত গ্রুপিং। এরিয়ার সকল শিশুকে সংশ্লিষ্ট প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে না পারাসহ নানা কারণে বাহুবলে প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার ঘটছে না।
উপরন্তু শিক্ষকদের ‘সভ্যতার সংকটে’ বহু অভিভাবক সন্তানদের ‘ব্যবসার জন্য গজিয়ে ওঠা’ কিন্ডারগার্টেন (কেজি) স্কুলগুলোতে ভর্তি করিয়ে দিচ্ছেন। পরিস্থিতি এমন জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে যে, বহু শিক্ষক তাঁর নিজের সন্তানকেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি না করে কেজি স্কুলে পড়াশুনার জন্য পাঠাচ্ছেন। আর কেজি স্কুলও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যর্থতায় মনের আনন্দে পড়াশুনার নাম করে ব্যবসা করে যাচ্ছে।
পরিস্থিতির উত্তরণে সম্প্রতি বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জসীম উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন শুরু করেছেন। মাত্র দু’দিনে ছয়টি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করে দৈন্যদশার চিত্র খূঁজে পেয়েছেন তিনি। শোকজ করেছেন ১৭ জন শিক্ষককে। সকাল সোয়া ৯টায় বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হলেও এসব শিক্ষক হাজির হয়েছিলেন সাড়ে ১০টার পরে। এজন্য তাদেরকে শোকজ করা হয়েছে। শোকজ পাওয়া শিক্ষকরা হলেন, মৌড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩ শিক্ষক, বিষ্ণুপুর সরকারি প্রাথমিকের ৭, ডুবাঐ সরকারি প্রাথমিকের ৪, কালিবাড়ি সরকারি প্রাথমিকের ১ এবং গাজীপুর সরকারি প্রাথমিকের ২ জন শিক্ষক। এই শোকজের খবর শুনে উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
বাহুবলে প্রাথমিক শিক্ষার দৈন্যদশা ঘুচাতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উপজেলা প্রশাসনের সাতজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়ে ‘মনিটরিং টিম’ গঠন করেন। ওই টিম বাহুবলের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো পরিদর্শন করবে। ওই কর্মকর্তারা পরিদর্শনে কি কি ১৫টি প্রশ্নের উত্তর খূঁজবেন। পরে পরিদর্শন প্রতিবেদনাগুলো উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হবে। সেই প্রতিবেদন নিয়ে সমন্বয় সভায় আলোচনার পর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জসীম উদ্দিন বলেন, বাহুবল উপজেলা শিক্ষাক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে, শিক্ষাকে এগিয়ে নিতেই উপজেলা প্রশাসন কাজ করছে।
গত ১ আগস্ট বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ‘প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে মনিটরিং জোরদারকরণ’ শিরোনামে একটি চিঠি জারি করে বলা হয়, ‘উপজেলার ১০৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। শিক্ষার বিস্তার, শিক্ষার হার বৃদ্ধি ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার অবকাঠামো উন্নয়ন, বাজেট বৃদ্ধিসহ নানা মুখী কর্ম-পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিতে মান সম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করণের বিকল্প নেই। শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে দায়িত্বশীলতা ও গুণগত শিক্ষার দিক থেকে বাহুবল উপজেলা খুব একটা ভালো অবস্থানে নেই। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মনিটরিং জোরদার এবং শিক্ষার বাস্তবায়ন করতে সাতজন কর্মকর্তাকে বিশেষকিছু দায়িত্বে দেয়া হল। দায়িত্ব পাওয়া এই সাত কর্মকর্তাকে বাহুবলের সাত ইউনিয়নের দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে সহকারি কমিশনার (ভূমি, এসিল্যান্ড) মনিটরিং করবেন বাহুবল সদর ইউনিয়ন, উপজেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা মিরপুর ইউনিয়ন, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাতকাপন ইউনিয়ন, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা লামাতাসি ইউনিয়ন, উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা পুটিজুড়ি ইউনিয়ন, উপজেলা প্রকল।প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা স্নানঘাট ইউনিয়ন এবং উপ-সহকারি প্রকৌশলী (জনস্বাস্থ্য) ভাদেশ^র ইউনিয়নের প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করবেন।
দায়িত্ব পাওয়া কর্মকর্তাদেরকে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটি করে বিদ্যালয় পরিদর্শন করতে হবে। পরিদর্শনে গিয়ে তারা কি খূঁজবেন তারজন্য ১৫টি প্রশ্ন প্রস্তুত করে দেয়া হয়েছে উপজেলা প্রশাসন থেকে। প্রশ্নগুলো হল-শিক্ষকরা সময়মত বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া (সকাল সোয়া ৯টা থেকে বিকাল সোয়া ৪টা) করেন কি না, শিক্ষকের পাঠ পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি আছে কি না, দৈনিক সমাবেশ সময়মত এবং সঠিকভাবে হয় কি না, শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির হার এবং এ বিষয়ে শ্রেণি শিক্ষকের কোনো উদ্যোগ আছে কি না, বিদ্যালয়ের সার্বিক শৃঙ্খলার পরিবেশ, ক্লাস অনুযায়ী শিক্ষার্থীর পাঠ মূল্যায়ন হয় কি না, স্কুলের সার্বিক পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা হয় কি না, শিক্ষা উপকরণ ও শিক্ষা সহায়ক ব্যবহার হচ্ছে কি না, অভিভাবক ও মা সমাবেশ প্রতি মাসে হয় কি না, পরিচালনাল সদস্যরা স্কুল পরিচালনায় সার্বিক সহযোগিতা করেন কি না, বিদ্যালয়ে স্কাউটের কার্যক্রম আছে কি না, বার্ষিক পাঠ পরিকল্পনা ও সার্বিক কর্মপরিকল্পনা আছে কি না, পুর্ববর্তী পরিদর্শনের নির্দেশনা বাস্তবায়ন অগ্রগতির বিষয়গুলোর উত্তর জানতে চাওয়া হয়েছে।
 বাহুবল প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল মজিদের মোবাইলে ফোন দিয়ে সাংবাদিক পরিচয় দিতেই বলেন, কিছু জানতে চাইলে অফিসে আসুন, বিষয়টি নিয়ে সবার সাথে কথা বলতে চাই কিন্তু  মোবাইলে কিছু না সবাইকে নিয়ে অভিযান চালান সময় এসেছে।
বাহুবলের প্রাথমিক শিক্ষা উত্তরণে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যে নির্দেশনা দিয়েছেন সেগুলো স্কুলে প্রয়োগ অভাব। আর একটাই একমাত্র প্রাথমিক শিক্ষার নিন্মমুখী হওয়ার কারণ। এখন সংশ্লিষ্টরা তা মেনে চলাটাই হল বাহুবলের প্রাথমিক শিক্ষার উন্নতি মূল মন্ত্র। অপর দিকে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার উন্নতির আরেক কারণ হলে কেজি স্কুল গুলো ব্যবসায়ী না হয়ে শিক্ষার প্রতি দৃষ্টি দিতৈ হবে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষকদের সন্তানই কেজি স্কুলে পড়ে তাদেরকে অবিলম্বে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি না করানোর কারণ দর্শনের জন্য আদেশ দেওয়ার হবে। কারণ এটি জনসাধারণের মধ্যে বহু শিশু সরকারি প্রাথমিকে ভর্তি হতে আগ্রহী হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
উল্লখ্য, এই ভর্তি না হওয়ার  কারণ সব বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ সহ-কারী শিক্ষকদেরকেও জবাবদিহির আওতায় আসতে হতে পারেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here