সরকারের উন্নয়ন ধারাবাহিকতা (৭)

0
223

দেশইনফো প্রতিবেদক: বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তোরণ ঘটেছে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন নীতি সংক্রান্ত কমিটি (সিডিপি) গত ১৫ মার্চ এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণের জন্য মাথাপিছু আয়, মানব সম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক এ তিনটি সূচকের যে কোন দুটি অর্জনের শর্ত থাকলেও বাংলাদেশ তিনটি সূচকের মানদন্ডেই উন্নীত হয়েছে।

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের (ইকোসক) মানদন্ড অনুযায়ী এক্ষেত্রে একটি দেশের মাথাপিছু আয় হতে হবে কমপক্ষে ১২৩০ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় তার থেকে অনেক বেশি অর্থাৎ ১৬১০ মার্কিন ডলার। মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশ অর্জন করেছে ৭২ দমমিক ৯। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক হতে হবে ৩২ ভাগ বা এর কম যেখানে বাংলাদেশের রয়েছে ২৪ দশমিক ৮ ভাগ।

‘যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে আজকের এই উত্তরণ – যেখানে রয়েছে এক বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়ার ইতিহাস’ সরকারের রুপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের এটি একটি বড় অর্জন। এটি সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশের সাহসী এবং অগ্রগতিশীল উন্নয়ন কৌশল গ্রহণের ফলে যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কাঠামোগত রূপান্তর ও উল্লেখযোগ্য সামাজিক অগ্রগতির মাধ্যমে বাংলাদেশকে দ্রুত উন্নয়নের পথে নিয়ে এসেছে।

জাতীয় শিল্পনীতি-২০১৬ প্রণয়ন করা হয়েছে। ট্রেডমার্ক (সংশোধন) আইন ২০১৫ প্রণয়ন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা) বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিপুল অবদান রাখছে। ৮টি ইপিজেডে সেপ্টেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত পুঞ্জিত রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬১,০৪৯.৪৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার; বিনিয়োগ হয়েছে ৪,৪২৩.৮৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার; বাংলাদেশি নাগরিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে ৪ লাখ ৮০ হাজার ৪৪৩ জনের, যার মধ্যে ৬৪ শতাংশ নারী। চালু হয়েছে ৪৬৫টি শিল্প। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বেপজার আওতাধীন ইপিজেডের শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহে ২৬ হাজার ৬৩৮ বাংলাদেশি শ্রমিকের প্রত্যক্ষ

শিল্পায়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ এগিয়ে চলছে। এতে ১ কোটির বেশি লোকের কর্মসংস্থান হবে।

বিশ্ববাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার উদ্দেশে যুগোপযোগী ‘রপ্তানি নীতি ২০১৫-১৮’ প্রণয়ন করা হয়েছে। ২০১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ১৯৯টি দেশে ৭৪৪টি পণ্য রপ্তানি করে ৩৪ হাজার ৮৩৫ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিজেএমসি’র পাটজাত দ্রব্য রপ্তানির পরিমাণ ৮৮ হাজার ৫১৩ মেট্রিক টন এবং মোট রপ্তানি আয় ৭৯০ কোটি ২৯ লাখ টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়েছে ২২৩ কোটি ডলার। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের শেষ বছর ২০০৬ সালে যা ছিল মাত্র ৪৫.৬ কোটি মার্কিন ডলার। ২০১৬ সালে মোট এফডিআই এসেছে ২৩৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

বেসরকারি খাতে ৪৬টি টেলিভিশন, ২২টি এফএম রেডিও এবং ৩২টি কমিউনিটি রেডিও চ্যানেলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সংসদে স্পিকার ছাড়াও সংসদ নেতা, উপনেতা, বিরোধী দলের নেতাও নারী, যা বিশ্বে নজিরবিহীন।

মন্ত্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীসহ দুই পূর্ণমন্ত্রী এবং তিন প্রতিমন্ত্রী, সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২১ নারী সরাসরি নির্বাচিত এবং সংরক্ষিত ৫০টি আসনে নারী এমপি রয়েছেন। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্বে ষষ্ঠ।

পুলিশ বাহিনীতে নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে মহিলা পুলিশ ইউনিটের অংশগ্রহণ। নারীদের জন্য আর্মড পুলিশ ব্যাটেলিয়ন গঠন; প্রথমবারের মতো বিজিবি-তে নারী সদস্য নিয়োগ। আপিল বিভাগে সর্বপ্রথম নারী বিচারপতি নিয়োগ। বুয়েট ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো নারী উপাচার্য।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে ৬০ শতাংশ নারীদের জন্য সংরক্ষিত। সরকারি চাকরিতে মেয়েদের জন্য গেজেটেড পদে ১০ শতাংশ, নন-গেজেটেড পদে ১৫ শতাংশ কোটা। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক নিয়োগে নারীদের অগ্রাধিকার।

১৩ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী ও সাড়ে ১২ হাজার নার্স নিয়োগ। ডিপ্লোমা নার্সদের পদমর্যাদা ও বেতন স্কেল দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়েছে। গার্মেন্টসে কর্মরত নারীদের সুবিধায় আশুলিয়া ও সাভারে ১৬ তলাবিশিষ্ট হোস্টেল নির্মাণ। নারী-পুরুষ বৈষম্য দূরীকরণে ৪০টি মন্ত্রণালয়ে জেন্ডার বাজেট প্রণয়ন।

যুবসমাজের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিতকল্পে দেশের ৬৪টি জেলা ও ৪৯৬টি উপজেলায় বেকার যুবদের উদ্বুদ্ধকরণ, প্রশিক্ষণ প্রদান, প্রশিক্ষণোত্তর আত্মকর্মসংস্থান প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে স্বাবলম্বীকরণ, যুব ঋণ প্রদান, দারিদ্র্য বিমোচন ইত্যাদি কর্মসূচি চালু রয়েছে।

বর্তমান সরকারের মেয়াদে ১৮ লাখ ৮৬ হাজার ২৮৪ যুবক ও যুব মহিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে এবং ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৩০০ জন আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত হয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন।

ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি সরকারের একটি অগ্রাধিকামূলক কর্মসূচি। এ কর্মসূচির আওতায় ডিসেম্বর ২০১৬ মাস পর্যন্ত মোট ১ লাখ ১২ হাজার ৬৮৫ জনকে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং ১ লাখ ১০ হাজার ৩৫১ জনের অস্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

যুবসমাজের জন্য ১১টি নতুন প্রকল্প চালু করা হয়েছে। এসব পূর্ণ বাস্তবায়িত হলে সারাদেশে ১৪ লাখ ৩২ হাজার ১০৪ বেকার যুবক ও যুব মহিলা উপকৃত এবং ৩১ হাজার বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপিত হবে।

১১টি জেলায় আবাসিক যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের কাজ দ্রুতই শেষ হবে এবং ২৯টি যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে। শিশুদের জন্য প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা।শিশুর ঝরে পড়া রোধে বিদ্যালয়ে শিশুবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, মিড-ডে মিল চালু করা হয়েছে।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের সকল বই ই-বুকে রূপান্তর করা হয়েছে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও আইসিটি ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। প্রতিটি বিদ্যালয়বিহীন গ্রামে বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে।

শ্রমজীবী কিশোর-কিশোরী ও অনগ্রসর পরিবারের শিশুদের জন্য শিশুবান্ধব শিখন কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। শিশুদের প্রতিভা ও উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশে ২০১২ সাল থেকে ভাষা ও সাহিত্য, দৈনন্দিন বিজ্ঞান, গণিত ও কম্পিউটার এবং বাংলাদেশ স্টাডিজÑ এই চার বিভাগে সৃজনশীল মেধা অন্বেষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

প্রাথমিক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ এবং বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট চালু করা হয়েছে। দেশের সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের অংশগ্রহণে আন্তঃপ্রাথমিক বিদ্যালয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হচ্ছে। শিশুদের নেতৃত্ব বিকাশে প্রতিটি বিদ্যালয়ে স্টুডেন্টস কাউন্সিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পথশিশু, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত ও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশুদের কল্যাণে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী শিশুদের কল্যাণে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সমন্বিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষা কার্যক্রম, ব্রেইল প্রেস, মানসিক প্রতিবন্ধী প্রতিষ্ঠান, সরকারি বাক-প্রতিবন্ধীদের বিদ্যালয় অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী শিশুদের কল্যাণে কাজ করা হচ্ছে।

শিশু-কিশোরদের সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধে কিশোর-কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্র, সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র, ‘সেফহোম’ ‘প্রবেশন ও আফটার কেয়ার সার্ভিস’ চালু করা হয়েছে। শিশুদের জন্য জাতির পিতার জীবন ও কর্মভিত্তিক গ্রন্থ প্রকাশ এবং পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস সংযোজন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ৬৪টি জেলা ও ৬টি উপজেলায় প্রতিবছর ২৫ হাজার শিশুকে সংগীত, চিত্রাঙ্কন, নৃত্য, আবৃত্তি, নাট্যকলায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। দ্বি-বার্ষিক চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং উপজেলা পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত শিশু নাট্য প্রতিযোগিতা ও উৎসব আয়োজন করা হচ্ছে।

শিশুর সুরক্ষা এবং শিশুমৃত্যু রোধে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছে। ১৯৯০ সালে প্রতিহাজারে নবজাতক শিশুমৃত্যুর হার ছিল ১৪৬, যা ২০১৪ সালে ২৮-এ নেমে এসেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত কল-কারখানার শ্রমিকদের মজুরি ও ভাতা প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের অবসর গ্রহণের বয়সসীমা ৫৭ থেকে ৬০ বছরে উন্নীত করা হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here