বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ

0
106

বোরো ধানের দাম না পাওয়া কৃষকের কান্নার ক্ষত এখনো শুকায়নি। রাগে-দুঃখে ক্ষোভে কৃষকরা পাকা ধানে আগুন পর্যন্ত দিয়েছে। সে বঞ্চনার ব্যথা না সারতেই বন্যার মতো বড় বিপদ এসে হাজির। যেন মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা ঢলে প্রধান প্রধান নদীর পানি বেড়ে গিয়ে তলিয়ে গেছে উত্তর ও উত্তরপূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। শেষ তিন দিনে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখনো লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও বগুড়ার বিস্তীর্ণ জায়গা পানির নিচে তলিয়ে আছে।

গাইবান্ধার ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি কিছুটা কমলেও এখনও বিপদসীমার অনেক উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। নদীর বাঁধ ভাঙা পানি এখনো নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।

তবে বন্যাকবলিত এলাকার পানিবন্দি পরিবারগুলোর মধ্যে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি সংকট, স্যানিটেশনের অব্যবস্থা, গবাদিপশুর খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গাইবান্ধা ও গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভা এবং ৪৯টি ইউনিয়নের ৩৮৩টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়ে পড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৩২৮ জন। ৪৪ হাজার ৭৯২টি বসতবাড়ি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৮০টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৭৪ হাজার ১০৪ জন অসহায় মানুষ আশ্রয় নিয়ে আছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, এ পর্যন্ত জেলায় ১ হাজার ১৫০ টন চাল, ২০ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ৬ হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া গেছে। সেখান থেকে ইতিমধ্যে ৯৫০ টন চাল, ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ৫ হাজার ৬০০ শুকনো খাবার দুর্গত মানুষের মধ্যে বিতরণ কাজ চলছে।

বন্যাদুর্গত অঞ্চলের কৃষকরা জানাচ্ছেন, এবার মৌসুমি সবজি বেগুন, মুলা, চিচিঙ্গা, মিষ্টি কুমড়া, শসা ও ঢেঁড়স রোপণ করেছিলেন অনেকে। কিন্তু বন্যায় সবজির সব ক্ষেত তলিয়ে গেছে। এছাড়া কয়েক হাজার একর আউশ ধান ও আমনের বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। এ মৌসুমে নতুন করে আউশের বীজতলা তৈরি করে আউশ ধান চাষ করতে পারবে কি-না তা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে।

শুধু ফসল নয় বন্যায় ভেসে গেছে বিভিন্ন জেলার বিস্তীর্ণ মাছের ঘেরও। নদী, হাওর ও বিল পানিতে থই থই করছে কিন্তু কোথাও মাছ পাচ্ছেন না জেলেরা। এ কারণে বাজারে মাছের সরবরাহও কমে গেছে।

জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলে বন্যাকবলিত এলাকায় ফসলি জমির বেশি ক্ষতি হয়েছে লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী ও কুড়িগ্রামে। নীলফামারীতে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে প্রায় ১১৮ হেক্টর জমির ফসল।

লালমনিরহাটের দু’দফা বন্যায় ডুবে গেছে ৩২৫ হেক্টর, গাইবান্ধায় ৬৪৭ হেক্টর, কুড়িগ্রামে ৯ উপজেলার প্রায় ১৪০০ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। অন্যদিকে, বগুড়ায় তিন উপজেলায় ৮ হাজার ৬০৩ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে পানিতে। এসব এলাকায় চলছে মানুষের হাহাকার। শুকনো খাবার ও পানীয় জলের তীব্র হাহাকার চলছে এসব এলাকায়। পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না। ইতোমধ্যে গাইবান্ধা কুড়িগ্রামসহ উত্তরের কয়েকটি জেলাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন অনেকে।

এদিকে ভারতের পাশাপাশি চীনের বন্যার পানি বাংলাদেশে এলে বন্যা পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ ও স্থায়ী রূপ নেবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। রোববার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি ক্যাপ্টেন এ বি তাজুল ইসলাম জানান, বর্তমানে দেশের ২৮টি জেলা বন্যাকবলিত। চীনের পানি যখন পুরোদমে আসা শুরু করবে তখন বন্যা ভয়াবহ হতে পারে। সরকার আশঙ্কা করছে এবারের বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। সেইভাবে আগাম প্রস্তুতিও সরকারের আছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here