মাদারীপুরের ১০ হাজার তাঁত পরিবার বিলুপ্তির পথে

0
219
নিত্যানন্দ হালদার,মাদারীপুর :খটখট শব্দে এক সময় মুখরিত ছিল মাদারীপুরের বিভিন্ন তাঁত পল্লী।কারিকর পাড়ায় ভ্রমণ করার সময় এখন আর সেরকম শব্দ শোনা যায় না।শহর-বন্দর-গ্রাম-গঞ্জে তাঁতে বোনা শাড়ি-লুঙ্গি,চাঁদর,তোয়ালে,রুমাল ও গামছা চোখে পড়ে না বললেই চলে।অভাব-অনটন,পুজির অভাব ও প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে মাদারীপুরের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প আজ বিলুপ্তির পথে।জেলার চারটি উপজেলার প্রায় ১০ হাজার তাঁতি পরিবার নিজস্ব পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় আত্মনিয়োগ করেছে।কেউ কেউ তাদের পূর্ব পেশা ধরে রাখার চেষ্টা করলেও নানাবিধ সমস্যার কারনে এ পেশা ধরে তাঁত পল্লীর সাথে সম্পৃক্তরা।
পাকিস্তান আমলে ও স্বাধীনতার পর কারিকর পাড়ায় ঢুকলে কান ঝালাপালা হয়ে যেতো মাকুর খটখট শব্দে।আশির দশকের শেষদিক পর্যন্ত মোটামুটি সচল থাকলেও মাদারীপুরের তাঁত শিল্পের এখন মৃত প্রায় অবস্থা।এখানকার তাঁত কারখানায় তৈরি করা হতো গামছা,প্লেকার্ড লুঙ্গি,শাড়ী, চাঁদর,গামছা,তোয়ালে ও বিছানার চাঁদর।এ সকল উৎপাদিত পোষাক পরিচ্ছদের জন্য বিখ্যাত ছিল মাদারীপুরের প্রায় ১০ হাজার তাঁত কারখানা। এখানকার তাঁতিদের তৈরি উন্নত মানের বস্ত্রাদি টেকেরহাট,রাজৈর,কুনিয়ারহাট,শ্রীনদীহাট,রাজারহাট,শিরখাড়াহাট,চরমুগরিয়া বন্দর,শিবচর,উৎরাইলহাট,শেখপুরহাট,মাদারীপুর পুরান বাজার,মস্তফাপুরহাট,টরকী,গোপালপুর,ভুরঘাটাসহ আশপাশের জেলাগুলোতেও ব্যাপক চাহিদা ছিল।তখন এ শিল্প বেশ লাভজনক ছিল।উৎপাদিত তাঁত বস্ত্রাদি ছাড়া এলাকার জনগন অন্য কোন বস্ত্র ব্যবহার করতো না।পরবর্তীকালে নানা কারণে উৎপাদিত সমগ্রীর চাহিদা হ্রাস পেতে থাকে।
সুতা, রং ও তাঁতশিল্পের বিভিন্ন উপকরণের মূল্য বাড়তে থাকায় পণ্যের মূল্যও বৃদ্ধি পায়। ফলে তাঁতশিল্প তার লাভজনক অবস্থা অনেকটাই হারিয়ে ফেলে।এ কারণে তাঁতনির্ভর পরিবারগুলোতে নেমে আসে চরম দুঃখ, দুর্দশা ও দুর্ভোগ।এ সময়ে আকস্মিকভাবে সুতাসহ তাঁত যন্ত্রাংশের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় তাঁত শিল্পে এ সঙ্কট সৃষ্টি হয়।এ ছাড়াও টেক্সটাইল মিলগুলোতে উন্নত মানের বস্ত্রাদি উৎপাদন হওয়ায় এবং চোরাই পথে আসা ভারতীয় শাড়ির অবাধ বাজার সৃষ্টি হওয়ায় তাঁত বস্ত্রের চাহিদা আকস্মিকভাবে হ্রাস পেতে থাকে।
সরেজমিন জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে,তাঁতি পরিবারগুলোর চলছে চরম দুঃসময়।পরিবারের অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ভেঙে পড়েছে। উৎপাদন খরচ পোষাতে না পেরে অনেকে কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে।অনেকে এ পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গেছে। তাঁতিদের উৎপাদিত সামগ্রী বাজারজাত করণের সঙ্গে জড়িত ছিল আরও কয়েক হাজার ব্যবসায়ী।তারা নিয়মিত তাঁতিদের কাছ থেকে বস্ত্রাদি নিয়ে যেত।তাঁত শিল্পীরা তাদের কারখানায় শাড়ি, প্লেকার্ড লুঙ্গি, গামছা, বিছানার চাদর ও তোয়ালে বুনতো।বিশেষ করে রাজৈর উপজেলার উপজেলার বদরপাশা,শংকরদী,তাতীকান্দি,ইশিবপুর,তেলিকান্দি,কুঠিবাড়ী,কবিরাজপুর,শ্রীকৃষ্ণদী,হোসেনপুর,স্বরমঙ্গল,কাশিমপুর,দারাদিয়া,মঠবাড়ী,আমগ্রাম, কুঠিবাড়ী, ইশিবপুর,নগর গোয়ালদী,বৌলগ্রাম,মাচারং,মাদারীপুর সদর উপজেলার পেয়ারপুর, কুমড়াখালী, থানতলী, মিঠাপুর, বাহাদুরপুর,শিরখাড়া,শ্রীনদী,ঘুনসী শ্রীনদী,বাইচর,গোলাবাড়ী, পাকদি, শিবচর উপজেলার বহেরাতলা, সেনেরবাট, ভদ্রাসন বাজার, পাঁচ্চর, ঠাকুরবাজার ও কালকিনি উপজেলার ভুরঘাটা, উমেদপুর,মাইজপাড়া,আইসার কমলাপুর,লক্ষ্মীপুর,সাহেবরামপুর ও ডাসারসহ বিভিন্ন স্থানে তাঁতশিল্প ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
রাজৈর উপজেলার আমগ্রাম ইউনিয়নের মঠবাড়ী গ্রামের ৯০ বছরের বৃদ্ধ ইব্রাহিম মুন্সি জানান,আমাদের মঠবাড়ী গ্রামে তিন শত ষাট ঘর তাঁতী পরিবার ছিল। কালেরচক্রে আজ শুধু তাঁত শিল্প স্মৃতিই বহন করছে।এ পরিবারগুলোর মূল পেশাই ছিল তাঁত শিল্প। পুঁজির অভাব ও প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে এ পেশা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে পরিবারগুলো।
রাজৈর উপজেলার বদরপাশা ইউনয়নের উত্তর বদরপাশা গ্রামের আঃ রাজ্জাক বেপারী (৭০)জানান, প্রায় ৩০০ বছর আগ থেকে তারা বংশ পরম্পরায় এ পেশার সঙ্গে জড়িত।এ গ্রামে এক সময় প্রায় ২শ’ পরিবার তাঁতশিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিল।প্রয়োজনীয় উপকরণের মূল্য,মিল-কারখানার বস্ত্রের সঙ্গে তারা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পেরে এ শিল্প ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে তারা।আঃ রাজ্জাক আরও জানান,এক সময় উন্নত মানের প্লেকার্ড লুঙ্গি, শাড়ি ও অন্যান্য বস্ত্রাদি তৈরি করতে তারা।এখানকার তাঁত শিল্পের বস্ত্রের কদর না থাকায় বন্ধ হয়ে গেছে তাদের তাত শিল্প।
এ ইউনিয়নের বদরপাশা মধ্যপাড়া গ্রামের মোঃ আনিছ উজ্জামান জানান,তাদের বাড়িতে বিগত ২০ বছর আগেও প্রায় সাড়ে ৩শ তাঁত ছিল।এখানকার তাঁতের শাড়ী,লুঙ্গি,গামছা,তোয়ালে,চাদর ও অন্যান্য উৎপাদিত বস্ত্রের কদর ছিল অত্যাধিক।কিন্তু আজ তাত শিল্প শুধুই স্মৃতি।তিনি আরো বলেন,আধুনিক প্রযুক্তির ছোয়ায় বয়ন শিল্পের অনেক উৎকর্ষ অর্জিত হলেও উন্নতি হয়নি।প্রায় ২০ বছর আগে টেকেরহাট বন্দরে প্রথম বিদ্যুৎচালিত পাওয়ারলুম তাঁত আসায় হস্ত চালিত তাঁতশিল্পের কদর কমে যায়।
এ গ্রামের সোনা মিয়া বেপারী জানান,এক সময় তাতের মাকুর খটখট শব্দে এলাকা মুখরিত ছিল।সে শব্দ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমাদের এলাকাও যেন মৃত্যুপুরিতে পরিণত হয়েছে।
রাজৈর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, আমগ্রাম ইউনিয়নের মঠবাড়ী গ্রামে ৩৬০ ঘর তাঁতি পরিবার ছিল।এদের প্রত্যেকেরই ৩/৪ খানা করে তাঁত ছিল।বদরপাশা ইউনিয়নের বদরপাশা মধ্যপাড়া,উত্তর বদরপাশা প্রায় ৫ হাজার তাতী পরিবার। যার সবই বন্ধ হয়ে গেছে। কালকিনি,মাদারীপুর সদর ও শিবচর উপজেলায়ও ছিল ৫ হাজারেও অধিক তাত পরিবার। যার সবই বন্ধ হয়ে গেছে।পরিবারগুলোর সবাই আছে; কিন্তু তাঁতগুলো আর নেই। শিবচর উপজেলার পাচ্চরের ঠাকুর বাজারে একটি ঘরে সাড়ে ৩শ’ তাঁত ছিল।সেখানে গিয়ে দেখা গেছে তাঁতগুলো আর নেই।এখন শুধু স্মৃতিই বহন করছে।জেলার বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে,ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের অতীতের সেই জৌলুস ও কর্মচাঞ্চল্য আর নেই।
১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত ১২ বছরে সুতার মূল্য ৫০ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে।বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক রঙে ভেজাল মিশ্রিত থাকে।সুতার সঙ্গে পালা দিয়ে রঙের দামও বেড়ে যায়। ফলে কাপড় ও অন্যান্য বস্ত্রাদির খরচও বেড়ে যায়।বাজারে আসে মিল থেকে তৈরি বাহারী রঙের নানাবিধ তোয়ালে,বিছানার চাদর। রকমারি ডিজাইন না থাকায় এবং মূল্য বৃদ্ধির কারণে দিনে দিনে তাঁতে তৈরি বস্ত্রাদির চাহিদা কমে যায়।এসব কারণে তাঁতশিল্পে দেখা দেয় ধস।আর জীবন ধারণের তাগিতে তাঁত শিল্পীদের অনেকেই পেশা বদল করে চলে যায় ভিন্ন পেশায়।
১৯৭৭ সালে তাতীদের সার্বিক অবস্থার উন্নতির জন্য তাঁত বোর্ড গঠিত হয়।এর উদ্দেশ্য ছিল তাঁিতদের ন্যায্যমূল্যে সুতা, রঙ, কেমিক্যালস্ প্রদান ও তাঁিতদের পুজির ব্যবস্থা করা।১৯৮৪ সালে সরকার তাঁিতদের জন্য শিল্প ঋণ ব্যবস্থার পদপে গ্রহণ করেছিল। তাঁিতরা আগে ডিলারের মাধ্যমে বা মিল হতে সরাসরি সুতা সংগ্রহ করতে পারায় এ শিল্পে টিকে ছিলেন পরবর্তীতে সরকার মিল থেকে সুতা সংগ্রহ বন্ধ করায় এবং তাঁত বোর্ড কর্তৃক প্রদত্ত ঋণ না পাওয়ায় এবং বাজার থেকে উচ্চমূল্যে সুতাসহ অন্যান্য উপকরণ ক্রয় করার কারণে প্রায় ১০ হাজার তাঁত বন্ধ হয়ে যায়।এ সকল পেশার জনগন অন্য পেশায় চলে গেছে।মাদারীপুরের ঐতিহ্যবাহী তাত শিল্প এখন শুধু ঐতিহ্যই বহন করছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here