মোতাহার হোসেন: ভারতের অমৃতসরে স্বর্ণ মন্দির অবস্থিত। শিখদের ধর্মীয় তীর্থ স্থান এটি। এর আসল নাম দরবার সাহিব বা হরমন্দির সাহিব। লক্ষকোটি স্বর্ণমুদ্রা দ্বারা নির্মিত, অভ্যন্তরে কোটি কোটি টাকার স্বর্ণাদি থাকার কারণে এবং দেখতেও স্বর্ণাভাব হওয়ায় লোকমুখে প্রচলিত হয়ে যায় স্বর্ণ মন্দির। স্বর্ণ মন্দির শিখদের তীর্থস্থান। সারা পৃথিবীর সকল শিখদের প্রধান তীর্থ কেন্দ্র হিসেবে স্বর্ণ মন্দির প্রতিষ্ঠিত।
১৯৮০’র দশকে স্বর্ণ মন্দিরের শিখ নেতৃত্ব স্বর্ণ মন্দিরকে ভ্যাটিকান স্টেট স্ট্যাটাসে স্বাধীনতা দেওয়ার দাবী উত্থাপন করে এবং এই দাবী ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। ১৯৮৪’র দিকে অবস্থা এমনি হয়ে দাঁড়ায় যে এ দাবী মেনে নেওয়া অথবা কঠিন কোন সিদ্ধান্তে যাওয়া ছাড়া বিকল্প কোন পথ ছিল না।
এ সময়ে ভারত বর্ষের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, ভারতের সবচাইতে সফল প্রধানমন্ত্রী, নেহেরু তনয়া, শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। গান্ধী দেখলেন এ দাবী নেয়ার অর্থ হচ্ছে অমৃতসরকে স্বাধীন ঘোষণা করা। স্বর্ণ মন্দিরকে ভাটিকান স্ট্যাটাসে স্বাধীন ঘোষণা করা হলেও তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে আন্দোলনরত বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আরো বেশী সক্রিয় হয়ে উঠবে। পরিণতিতে, ভারতে চরম অশান্তি এবং সার্বভৌম ভারতে জাতীয় ঐক্য হুমকির সম্মুখীন হবে।
এমতাবস্থায়, ১৯৮৪ সালে জুন মাসে অপারেশন ব্লু স্টার নামে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি চৌকস দল আধুনিক রণসজ্জ্বায় সজ্জিত হয়ে স্বর্ণ মন্দির আক্রমণ করে। উল্লেখ্য স্বর্ণ মন্দিরে অবস্থিত শিখ যারা এমনিতে দেহে এবং মন্দিরে অস্ত্র ধারণ করে রাখত, তাদের সাথে প্রচন্ড সংঘর্ষ হয়। ভারতীয় চৌকস দল ব্লুস্টার সফলভাবে এ আন্দোলন মাসাকার করে দিতে সক্ষম হয়। এটা ছিল ১৯৮৪’র জুন মাসের ঘটনা। এ ভয়াবহ হত্যাকান্ডে স্বর্ণ মন্দিরে অবস্থিত নিহত অনেক শিখের রক্তের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য শিখরা ছিল দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
এমতাবস্থায় ইন্দিরা গান্ধীর নিরাপত্তার দ্বায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাগণ, শংকিত হয়ে পড়েন। ইন্দিরা গান্ধীর দেহ রক্ষীদের মধ্যে শিখ দেহরক্ষীদেরকে নিরাপত্তা কর্মকর্তাগণ সড়িয়ে দেন। ব্যাপারটি জানতে পেরে, ইন্দিরা গান্ধী ওই শিখ দেহরক্ষীদের পুণরায় ফিরিয়ে আনেন। তার নিরাপত্তার দ্বায়িত্বে। ইন্দিরা কি মনে করে তাদের ফিরিয়ে আনলেন একমাত্র তিনিই জানেন। উনি নিশ্চয়ই বিশ্বাস করেছিলেন, এই শিখ দেহরক্ষীরা তার জন্য বিপজ্জনক হবে না। কিন্তু ইশ্বরের ইচ্ছা তা ছিল না।
অপারেশান ব্লু স্টারের মাত্র চার মাস পরে ৩১শে অক্টোবর ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধী তার দেহরক্ষী দ্বারা নিহত হন। শিখ দেহরক্ষীদের মধ্যে সৎবন্ত সিংহ ও বিয়ন্ত সিংহ একটি ছোট দরজায় ইন্দিরার দেহরক্ষার দ্বায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। ৮৪’র ৩১শে অক্টোবর ঐদিনে, ইন্দিরা গান্ধী দিল্লির এক নং সফদরজং রোডস্থ প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন থেকে উদ্যান হয়ে ছোট দরজা দিয়ে যাওয়ার সময় সৎবন্ত সিংহ ও বিয়ন্ত সিংহ সরাসরি শ্রীমতি গান্ধীকে গুলি করে (ব্রাশ ফায়ার)। মিসেস গান্ধী সাথে সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। অন্যান্য কর্মকর্তাগণ দ্রুত ইন্দিরা গান্ধীকে দিল্লির জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান।
সাড়াদেশে রেড এলার্ট জারি করা হয়। হত্যাকারীদের মধ্যে সৎবন্ত সিংহ ঘটনাস্থলেই অন্যান্য নিরাপত্তা রক্ষীদের গুলিতে নিহত হয় এবং বিয়ন্ত সিংহ ও ষড়যন্ত্রকারী কেহার সিংহকে পরবর্তীতে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করা হয়।
রাজীব গান্ধী ছিলেন তখন পশ্চিম বঙ্গের কলকাতা শহরের বাইরে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে দিল্লি নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। দিল্লি পৌঁছতে উনার প্রায় কয়েক ঘন্টা সময় লেগে যায়। যদিও ইন্দিরা সাথে সাথেই ইন্তেকাল করেছিলেন। তবুও নিরাপত্তার স্বার্থে তার মৃত্যু সংবাদ ঘোষণা করা হয় নি। রাজীব দিল্লি না পৌঁছানো পর্যন্ত। রাজীব দিল্লি পৌঁছানোর পর ঘোষণা করা হয়, ইন্দিরা আর ইহজগতে নেই।
স্বর্ণ মন্দির এখনও আগে যেমন ছিল তেমনি আছে। তবে নেই কোন আন্দোলন, অদ্ভুত ধরনের স্বাধীনতার জন্যও তাদের এখন কোন আন্দোলন নাই। ইন্দিরাও নাই। এক রক্তের প্রতিশোধ রক্ত দিয়েই এক রক্তাক্ত পরিসমাপ্তি। ভারতের অখন্ডতা রক্ষায় জীবন দিলেন শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী’।
লেখক: মোতাহার হোসেন, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, সাবেক পরিচালক বিআইডব্লিউটিএ।