শওকত আহসান ফারুক: আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন নিয়ে পড়েছি। বেড়ে উঠা কুমিল্লা শহরে, শৈশব কেটেছে জন্মভুমি হাটখোলা কুমিল্লা গ্রামের বাড়িতে। শহর ও গ্রামের রসায়ন নিয়ে গড়েছি নিজের জীবন।
এখন আবসর জীবন যাপন করছি। পঁয়ষট্টি বৎসরের জীবনে ফিরে দেখা অতীত ও ঐতিহ্য নিয়ে লিখছি, রুম নাম্বার ১৪৬। সেটিকেই এখানে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা।
১৪৮.
আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণার মাত্র ১৩ দিনের মধ্য বিজয় সূচিত হলো। যৌথবাহিনী কাছে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর পূর্ব কমান্ড ঢাকায় আত্মসমর্পণ করলে যুদ্ধের সমাপ্তি হলো। পূর্ব পাকিস্তান আনুষ্ঠানিভাবে পাকিস্তান থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে, এক নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করে।
মনে করা হয়ে থাকে যুদ্ধে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর হাতে প্রায় ২,০০০,০০০ থেকে ৩,০০০,০০০ জন বেসামরিক নাগরিক খুন এবং চার লাখেরও বেশি নারী ধর্ষিতা হয়েছিলো।
ডিসেম্বরে সংঘটিত তৃতীয় পাক-ভারত যুদ্ধের শেষে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান করে নেয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনে ভারতের রযেছে বিশাল ভূমিকা। এক কোটি শরণার্থী, মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং, অস্ত্র, অর্থ, যুদ্ধের নির্দেশনা, মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে লড়াই করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ভারতের কতজন জওয়ান নিহত হয়েছে তা নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে কিছুটা। তবে সব কিছু বিচার বিশ্লেষণ করে, ২৬ মার্চের থেকে প্রায় ১২ থেকে ১৪ হাজার ভারতীয় সৈন্য আমাদের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
পূর্ব রণাঙ্গনে ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানিদের প্রায় ৭ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য নিহত এবং ৮ হাজার আহত হয়েছিলো। ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে ঢাকা রেসকোর্সে সামরিক ও অসামরিক মিলেয়ে প্রায় এক লাখ পাকিস্তানি আত্মসমর্পণ করেছিলো।
পাকিস্তানি হানাদার ও তার দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর হাতে সারাদেশে ২৫ মার্চ রাত থেকে প্রায় নয় শতাধিক বুদ্ধিজীবী নির্মম ভাবে নির্যাতিত হয়ে শহীদ হয়েছিলেন।
প্রায় ১ লক্ষাধিক সশস্র মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন স্বাধীনতা যুুদ্ধে, তারমধ্যে কয়েক সহস্র মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগের বিনিময়ে,
বিজয়ের পতাকা উড়ছে স্বাধীন বাংলাদেশে।
১৪৯.
আমি ও তারেক ‘৭২ জানুয়ারির ৮/৯ তারিখে সিনেমা দেখতে চলে গেলাম সোনামুড়া হয়ে আগরতলা। সিমেমা শুরুর পূর্বে ভারতীয় তথ্যচিত্র দেখতে পেলাম বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি কারগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডনের হিথ্রো বিমান বন্দরে এসে পৌঁছলেন, সেই চিত্র দেখা মাত্র সারা সিনেমা হলের দর্শক দাঁড়িয়ে উল্লাসে, উচ্ছাসে মেতে উঠলো। আনন্দে আমাদের চোখ ভিজে গেলো।
১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিরর রহমান পকিস্তানি কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে একটি সামরিক বিমানে খুব গোপনে বঙ্গবন্ধুকে লন্ডনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ঐ বিমানে আরও ছিলেন ড. কামাল হোসেন ও তাঁর স্ত্রী হামিদা হোসেন। ২৯০ দিনের কারাবাসের অবসান হলো।
দেশদ্রোহী মামলায় বঙ্গবন্ধুর গোপনে বিচার করে তাঁকে হত্যার সকল প্রকার আয়োজন প্রায় সম্পন্ন করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান। বঙ্গবন্ধুর এই প্রহসনের বিচার বন্ধ এবং তাঁর মুক্তির জন্য পাকিস্তানের সামরিক জান্তাকে চাপ দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ৬৭টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে চিঠি দিয়েছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী ইউরোপের ও যুক্তরাষ্ট্র সফর করে বিশ্বজনমত বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের অনুকূলে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফলে পাকিস্তানের সামরিক জান্তার পক্ষে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা সম্ভব হয়নি। এটা ইন্দিরা গান্ধীর দূরদর্শিতা ও কুটনৈতিক বিজয়।
১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি ভোরে লন্ডন হিথ্রো বিমান বন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে বঙ্গবন্ধু অবতরণ করলে তাঁকে স্বাগত জানিয়েছিলেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও কমনওয়েলথ বিভাগের প্রধান ইয়ান সাদারল্যান্ড ও লন্ডনে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার আপা বি পন্থ। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর লন্ডনে এক বৈঠক মিলিত হয়েছিলেন, তিনি লন্ডন থেকে প্রায় তিরিশ মিনিট ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে টেলিফোন কথা বলেছিলেন।
লন্ডনে এক প্রেস কনফারেন্স জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সুস্পষ্ট ভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অভিনন্দন জানিয়ে ছিলেন, যেইসব দেশ মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা বা সমর্থন দিয়েছে, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং যেসব দেশ সমর্থন করেনি অথচ জনগণ সমর্থন দিয়েছিলেন তাদের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন এবং বিশ্বের সকল দেশের কাছে স্বাধীনতার স্বীকৃতি, পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের জন্য সাহায্য চেয়েছিলেন।
একটি ব্রিটিশ রাজকীয় বিমান কমেট জেটে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন দেশের ফেরার ব্যবস্থা করেছিলেন ব্রিটিশ সরকার। বাংলাদেশে ফেরার পথে বিমানটি দিল্লীতে দুই ঘন্টার যাত্রা বিরতি করে, ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুকে দিল্লী বিমান বন্দরে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন এবং এক বিশাল নাগরিক সংবর্ধনায় বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিয়েছিলেন। তিনি ইংরেজিতে ভাষন শুরু করলে সমবেত সভা থেকে দাবী উঠেছিলো বাংলায় ভাষন দেবার জন্য তিনি বাংলায় ভাষন দিয়েছিলেন। সেদিন শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর ও শেখ মুজিবর রহমান এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন।
১৫০.
১০ ই জানুয়ারি বাহাত্তর, বঙ্গবন্ধু আসছেন।
সকাল থেকেই তেজগাঁও কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে জনতার ঢল নেমেছিলো। রাস্তার দু’পাশে সারিবদ্ধ মানুষ দাঁড়িয়ে আছে একনজর দেখাবে। বিমান বন্দর থেকে রেসকোর্স বিপুল জনসমুদ্র। রাস্তার দু’পাশে অপেক্ষমাণ জনতা। সবার চোখেমুখে এক অন্যরকম উত্তেজনা। বাঙালির মহান নেতা আজ আসছেন। লাখো লাখো মানুষের ভীড় রাজপথ জুড়ে। সবার কণ্ঠে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’। অবশেষে অপেক্ষার পালা শেষ করে তিনি এলেন। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগতঃ জানাতে অস্থায়ী সরকারের সদস্য, মুক্তিযোদ্ধা, সর্বস্তরের জনগণ বরণ করে নিয়েছিলেন ইতিহাসের বরপুত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে।
খোলা জীপে দাঁড়িয়ে জনসমুদ্রের ভেতর দিয়ে রেসকোর্স ময়দানে এসে পৌঁছুতে বঙ্গবন্ধুর সেদিন আড়াই ঘণ্টা সময় লেগেছিলো, রেসকোর্স ছিলো লোকে লোকারণ্য। তিনি ধানমন্ডি ৩২ নাম্বারে না গিয়ে সরাসরি রেসকোর্সে এসে পৌঁছলেন। ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানে অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুকে স্বাগতঃ জানিয়েছিলো সর্বস্তরের জগগণ, ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে।
জাতির পিতা, বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১৭ মিনিট জাতির উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ ভাষন দিয়েছিলেন। দিয়েছিলেন জাতির জন্য এক দিক নির্দেশনা। সেই ভাষনে বাংলাদেশের আদর্শগত ভিত্তি, রাষ্ট্র কাঠামো, স্বাধীনতা বিরোধী ও পাকিস্তানি সহযোগিদের বিষয়ে, বাংলাদেশকে বহির্বিশ্ব স্বীকৃতি দেওযার জন্য অনুরোধ, মুক্তিবাহিনী, ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক সবার কাজ কী হবে, এসব নিয়ে এক দিকনিদের্শনামূলক ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন।
যাঁদের প্রাণের ও ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সেদিন বঙ্গবন্ধু ভাষণের শুরুতে বলেন, “স্মরণ করি আমার বাংলাদেশের ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, বুদ্ধিজীবী, সেপাই, পুলিশ, জনগণকে, হিন্দু, মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের আত্মার মঙ্গল কামনা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করে বঙ্গবন্ধু ভাষন শুরু করেছিলেন।
একজন প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রনায়কের নীতিনির্ধারণী ভাষন ছিলো ১০ জানুয়ারি রেসকোর্সে। দেশ গড়ার সংগ্রামে সবার সহযোগিতার জন্য আহব্বান করেছিলেন রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত লাখ লাখ জনতা দু’হাত তুলে সেই সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ার অঙ্গীকার প্রকাশ করেছিলেন।চলবে………..।