‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত নয়ন বন্ডের হাতে ঠিক কতজন তরুণীর সর্বনাশ হয়েছে তার সঠিক হিসাব নেই পুলিশের কাছেও। তবে নয়নের ‘বিশেষ কক্ষ’ থেকে উদ্ধার একটি ল্যাপটপে বহু পর্নো ভিডিও পাওয়া গেছে।
পুলিশের সূত্র বলছে, নয়ন বন্ডের ওই বিশেষ কক্ষের গোপন জায়গায় সুকৌশলে আইপি ক্যামেরা (ইন্টারনেট ক্যামেরা) বসানো থাকত।
রিফাত শরীফ হত্যার প্রধান আসামি নয়ন বন্ড কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর তার সম্পর্কে এমন বহু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। অন্যান্য অপরাধীর মত নয়নের উত্থানটাও ছিল বেশ চমকের। সন্ত্রাসের পাশাপাশি ইয়াবা ব্যবসায়ও ছিল তার বড় হাত। এসব অপরাধের মধ্য দিয়ে অল্প সময়ের ব্যবধানে এলাকার নেতৃত্বাস্থানীয়দের নজরে চলে নয়ন। তার সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠে এলাকার রাজনৈতিক মহলের।
পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গেও নয়নের উঠাবসা ছিল চোখে পড়ার মত। নয়নের নিপীড়নের শিকার বহু নারীকে পুলিশ কর্মকর্তাদের ভোগ করার সুযোগ করে দিত নয়ন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নয়ন বন্ড প্রথমে ছিঁচকে চোর ছিল। একপর্যায়ে মেয়েদের হ্যান্ডব্যাগ, মোবাইল ফোন নিয়ে দৌড় দিত। তবে নিষিদ্ধ মাদকের জগতে ঢুকে সে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে। বছর খানেক ধরে জেলার প্রভাবশালী লোকজনের সঙ্গে নয়নের ওঠবস শুরু হয়। কয়েক মাস ধরে সে বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
এছাড়াও কলেজের সামনে সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে বসে থাকত। কলেজের ছাত্রছাত্রীদের আটকে মোবাইল ফোন কেড়ে নিত। না দিলে বেদম মারধর করত। কলেজের ছাত্রাবাসে যখন-তখন দলবল নিয়ে ঢুকে তাণ্ডব চালাত নয়ন বন্ড। কলেজের ছাত্রীদের মধ্যে যাকে পছন্দ হত তার আর রেহাই ছিল না। তাকে কাছে পেতে সবকিছুই করত নয়।
বরগুনা শহরে সাধারণ লোকজন জানায়, নয়ন বন্ডের ক্ষমতার উৎস শহরের কারও কাছেই অজানা নয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা সমাবেশে নয়নকে স্থানীয় প্রভাবশালীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশতে দেখা গেছে। নয়নকে নষ্ট রাজনীতিতে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন অসাধু রাজনীতিকরা।
হলিউডের বিখ্যাত সিনেমা ‘০০৭ লাইসেন্স’র নায়কের নামানুসারে নিজের নামের সঙ্গে ‘বন্ড’ যুক্ত করেন নয়ন। এর পর সিনেমাটির গল্পের আদলে গড়ে তোলেন সন্ত্রাসী বাহিনী। নয়নের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, নয়নের ঘরে সাদা দেয়ালে লাল রঙ দিয়ে এক জায়গায় লেখা ০০৭ (নয়নের সন্ত্রাসী গ্রুপের সাংকেতিক নাম)।
প্রসঙ্গত, গত ২৬ জুন সকালে রিফাত শরীফকে বরগুনা সরকারি কলেজ এলাকায় শত শত মানুষের সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ওইদিনই ঘটনার একটি ভিডিও ভাইরাল হলে সারা দেশে ব্যাপক আলোচিত হয়। রিফাতের বাবা ১২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরো চার-পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেন। এতে এক নম্বর সাক্ষী করা হয় ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও রিফাতের স্ত্রী মিন্নিকে। এর মধ্যে প্রধান আসামি নয়ন বন্ড গত ২ জুলাই পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। গত ১৩ জুলাই রিফাতের বাবা পুত্রবধূর গ্রেফতার দাবি করলে আলোচনা নতুন মোড় নেয়।
পরদিন একই দাবিতে মানববন্ধন হয়, যেখানে বক্তব্য দেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলে সুনাম দেবনাথ। এরপর মিন্নিকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া হয়। রিমান্ডের তিন দিনের মাথায় মিন্নিকে আদালতে হাজির করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেয়া হয়। ঘটনার ধারাবাহিকতায় এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মিন্নিকে সাক্ষী থেকে আসামি করার বিষয়টি ‘শম্ভুবাবুর খেলা’ বলে দাবি করেন মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হক কিশোর। তার মেয়েকে নির্যাতন করে পুলিশ তাদের শিখিয়ে দেয়া বক্তব্য অনুযায়ী আদালতে জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।









