চীনের কাছ থেকে শৃঙ্খলা শেখার পরামর্শ

0
5

চীনের কাছ থেকে শুধু অর্থ, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি নয়, উন্নয়ন পরিচালনার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও শেখা উচিত পাকিস্তানের। এক দশকের বেশি সময় ধরে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) নিয়ে কাজ চললেও চীনের উন্নয়নের পেছনে থাকা প্রশাসনিক দক্ষতা ও পরিকল্পনার কাঠামো থেকে পাকিস্তান যথেষ্ট শিক্ষা নেয়নি বলে মনে করছেন দেশটির বাণিজ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিনা আয়রা।

জিও নিউজে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, সিপিইসির বিভিন্ন প্রকল্পে চীনের প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ এসেছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র, যন্ত্রপাতি ও অর্থায়ন পাওয়া গেলেও চীনের উন্নয়নের পেছনে থাকা প্রশাসনিক কাঠামোর প্রতি তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

হিনা আয়রার মতে, চীনের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের ফল নয়। ভূমি, নগর, অবকাঠামো, অর্থায়ন, শিল্প ও স্থানীয় সরকারকে সমন্বয় করে বড় পরিসরে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সিপিইসি এখন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। ২০২৫ থেকে ২০২৯ সালের কর্মপরিকল্পনায় অবকাঠামোর পাশাপাশি প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন, সবুজ উন্নয়ন, মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি ও আঞ্চলিক যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই সিপিইসি শুধু বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের তালিকায় সীমাবদ্ধ থাকলে পাকিস্তান চীনের অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি কাজে লাগাতে পারবে না বলে মনে করেন তিনি।

চীনের বর্তমান উন্নয়নের কিছু পরিসংখ্যানও এই পার্থক্য তুলে ধরে। ২০২৫ সালের শেষে দেশটির স্থায়ী শহুরে জনসংখ্যা ৯৫ কোটি ৩৮ লাখে পৌঁছেছে। শহুরে জনসংখ্যার হার দাঁড়িয়েছে ৬৭ দশমিক ৮৯ শতাংশে। একই বছরে চীনে ১ কোটি ২৬ লাখ ৭০ হাজার নতুন শহুরে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। উচ্চপ্রযুক্তি উৎপাদন খাতের মূল্য সংযোজনও বেড়েছে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ।

অন্যদিকে পাকিস্তানের ২০২৩ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী শহুরে জনসংখ্যা প্রায় ৩৯ শতাংশ। তবে বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রচলিত প্রশাসনিক সংজ্ঞার কারণে দেশটির প্রকৃত নগরায়ণের মাত্রা সরকারি পরিসংখ্যানে কম দেখানো হতে পারে।

এর ফলে সড়ক, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, আবাসন, গণপরিবহন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রকৃত চাহিদা পরিকল্পনায় যথাযথভাবে প্রতিফলিত নাও হতে পারে।

পাকিস্তানের বড় শহরগুলোতে নগর ব্যবস্থাপনার আরেকটি সমস্যা হলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি। উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পৌরসভা, ক্যান্টনমেন্ট, প্রাদেশিক দপ্তর ও বিভিন্ন বিশেষায়িত সংস্থা একই শহরের বিভিন্ন অংশ পরিচালনা করে। ফলে অর্থনৈতিকভাবে একটি শহর যে এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত, প্রশাসনিকভাবে তা অনেক সময় একই কাঠামোর মধ্যে থাকে না।

করাচির ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক আগেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের দুর্বলতাকে নগর পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের অন্যতম বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

লেখকের মতে, এখানেই চীনের অভিজ্ঞতা পাকিস্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চীনকে হুবহু অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। তবে আঞ্চলিক উন্নয়ন, শহর ও গ্রামের সমন্বিত পরিকল্পনা, সবুজ রূপান্তর এবং পরিবহন ও অবকাঠামোর মধ্যে সমন্বয়ের মতো বিষয়গুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে।

পাকিস্তানে নগর উন্নয়ন অনেক সময় শুধু নির্মাণকাজ হিসেবে দেখা হয়। কোথায় সড়ক হবে, কোথায় ফ্লাইওভার হবে, কোথায় আবাসন প্রকল্প হবে বা কোথায় গণপরিবহনের করিডোর তৈরি হবে- এসব নিয়ে প্রকল্প নেওয়া হয়। কিন্তু এসব অবকাঠামোর সঙ্গে কর্মসংস্থান, ভূমি ব্যবহার, পরিবহন, জমির মূল্য ও ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণের সম্পর্ক অনেক সময় পরিকল্পনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে পাকিস্তানের নগরায়ণকে ‘প্রতিকূল গতিপথে’ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। অপরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণ, আবাসন ও নাগরিক সেবা ব্যবস্থার দুর্বলতার কথাও সেখানে বলা হয়েছে।

এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিশ্বব্যাংক পাঞ্জাবের ১৬টি মাধ্যমিক শহরের জন্য ৪০ কোটি ডলারের একটি কর্মসূচি অনুমোদন করে। এতে শুধু অবকাঠামো নয়, স্থানীয় নগর প্রশাসনের আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো, রাজস্ব আদায়, পানি ও পয়োনিষ্কাশন, ড্রেনেজ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ এই কর্মসূচির মাধ্যমে উপকৃত হতে পারে।

লেখকের মতে, পাকিস্তানের জন্য চীনের কাছ থেকে প্রযুক্তিগত সহায়তার অর্থও নতুন করে ভাবতে হবে। শুধু কর্মকর্তাদের চীন সফরে পাঠিয়ে জ্ঞান অর্জন করানো যথেষ্ট নয়। বরং চীনা শহর, পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠান, নগর উন্নয়ন সংস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তোলা প্রয়োজন।

পাকিস্তানি পরিকল্পনাবিদদের চীনের শহরগুলো কীভাবে পরিবহন ও ভূমি ব্যবহার সমন্বয় করে, স্থানীয় সরকার কীভাবে ডিজিটাল তথ্য ও কর্মদক্ষতার সূচক ব্যবহার করে এবং শিল্পাঞ্চল কীভাবে যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়- এসব বিষয় নিয়ে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

লেখক আরও বলেছেন, পাকিস্তানের প্রয়োজন চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা অনুকরণ করা নয়। বরং নিজেদের সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে তথ্যনির্ভর পরিকল্পনা, দক্ষ প্রশাসন, সমন্বিত অবকাঠামো পরিকল্পনা, ভূমির মূল্য ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহির মতো পদ্ধতি কাজে লাগানো।

তার মতে, সিপিইসির পরবর্তী পর্যায়ে অবকাঠামো ও অর্থায়নের পাশাপাশি ‘প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা’ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত। চীন থেকে শুধু পুঁজি ও প্রযুক্তি নেওয়ার বদলে কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা নেওয়া দরকার।

সূত্র: জিও নিউজ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here