আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা সঠিক পথে পরিচালনা করা এবং জনসেবাসহ জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পূর্ণ দায়ভার জনপ্রশাসনের ওপর ন্যস্ত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশে বিদ্যমান জনপ্রশাসনের সামগ্রিক পরিস্থিতি আজ চরমভাবে বিশৃঙ্খল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময় থেকে ধারাবাহিক দাবিদাওয়া ও আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অধীনস্থ কর্মচারীরাও এর বাইরে ছিলেন না। বিভিন্ন সময়ে কলমবিরতিসহ নানা কর্মসূচির ফলে জনসেবার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দ পর্যন্ত। ফলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতির পরিবর্তে পরিস্থিতি ক্রমাগত অবনতির দিকেই ধাবিত হয়েছে। জনপ্রশাসনের এই দুর্বলতা থেকে দ্রুত উত্তরণ ঘটাতে না পারলে এর প্রভাব আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সম্ভাব্য গণভোটের ওপর পড়বে-এ আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সারাদেশেই অস্থিরতা বিরাজ করছে। এরই প্রমাণ মিলেছে ১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার পরদিন প্রকাশ্য দিবালোকে একজন সম্ভাব্য প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদীর ওপর গুলি চালানোর ঘটনায়। এই ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা নাজুক অবস্থায় রয়েছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী গত ১৮ মাসে দেশে মব ও রাজনৈতিক সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু নভেম্বর মাসেই সারাদেশে প্রায় শতাধিক রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৫ জনের বেশি মানুষ, যা সাম্প্রতিক মাসগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব সহিংসতার পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, আধিপত্য বিস্তার, মিছিল ও মহড়াকেন্দ্রিক সংঘর্ষ, প্রার্থিতা নিয়ে বিরোধ, শাখা প্রশাখায় দলীয় কমিটিতে স্থান পাওয়া না-পাওয়ার দ্বন্দ্ব এবং অঞ্চলভেদে চাঁদাবাজির জন্য ক্ষমতার লড়াই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এসব সংঘাতে ঝরে গেছে অমূল্য প্রাণ। একটি প্রাণেরও মূল্য নির্ধারণ করা আমাদের কারও পক্ষে সম্ভব নয়, কারণ প্রতিটি প্রাণই অমূল্য।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত সাড়ে ১১ মাসে সারাদেশে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে প্রায় ৩০০টি। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, এসব ঘটনায় অন্তত দেড় শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এসব পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, জনপ্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। নির্বাচনের আগে প্রশাসনের সর্বস্তরে যদি প্রয়োজনীয় গতি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা না যায়, তবে সহিংসতা ও প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়বে-এ আশঙ্কা থেকেই যায়।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রশাসনের ভেতরের অস্থিরতার অন্যতম কারণ হলো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ধারাবাহিকতা, নিয়োগপ্রাপ্তদের দ্বারা অধস্তনদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ, সময়মতো পদোন্নতি না পাওয়া, পদায়নে পক্ষপাত, মেধা-যোগ্যতা ও সততার যথাযথ মূল্যায়ন না করে বিভিন্ন অজুহাতে কর্মকর্তাদের ওএসডি করা কিংবা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো। অতীতের নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে মাঠ প্রশাসনে নিয়োগ দেওয়াও অনেকের কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে পদোন্নতি জটিলতার কারণে শূন্য পদ থাকা সত্ত্বেও যোগ্য কর্মকর্তাদের যথাযথ স্থানে পদায়ন করা হচ্ছে না। অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে বিভিন্ন বদলি পদায়ন নিয়ে যে সকল কেলেঙ্কারি ঘটেছে তা কারণেই অজানা নয়। এতে কেউ কেউ খুশি হলেও বেশিরভাগ কর্মকর্তারাই নাখোশ। কেননা প্রশাসনের অস্থিমজ্জার মেরুদন্ড বলে কথা। এমন নজিরবিহীন দুর্নীতির ঘটনা অতীতে কখনো ঘটেছে বলে জানা নেই কারো।
সাড়ে তিন দশকের সরকারগুলোর শাসনামলে যে জনপ্রশাসন কাঠামো গড়ে উঠেছিল, তা ছিল রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট। জনগণের স্বার্থ ছিল উপেক্ষিত। ধারবাহিক বৈষম্য, ক্ষোভ, বঞ্চনা থেকেই ছিলো পরিবর্তনের প্রত্যাশা।
এ কারণে প্রশাসনের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট তীব্র হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে বেশিরভাগ মানুষ। পরিবর্তন হয়েছে ঠিকই কিন্তু ধারাবাহিকতা রয়েই গেছে অতীতের মতোই। বরং জার্সি বদলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে কতিপয় কর্মকর্তা। উল্লেখযোগ্য সুবিধাও ভোগ করছে।
এ প্রসঙ্গে একাধিক কর্মকর্তার অভিমত হলো-“গণ-অভ্যুত্থান হয়েছিল বৈষম্য দূরীকরণ ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়নের জন্য। কিন্তু বাস্তবে আমরা তার উল্টো চিত্র দেখছি। নানা অজুহাতে বৈষম্য আরও বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবে কাজে মনোনিবেশ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রশাসনের স্বাভাবিক গতি ফেরাতে চলমান বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধ করা জরুরি। অন্যথায় অন্তর্র্বতী সরকার ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারবে না।”
জনপ্রশাসনকে জনগণের স্বার্থে আরও কার্যকর ও সক্রিয় করা না গেলে এই ব্যর্থতার দায়ভার কে নেবে-সে প্রশ্নও থেকেই যায়।
শুরুতেই অন্তর্র্বতী সরকার জনপ্রশাসন সংস্কারের লক্ষ্যে একটি জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল। কমিশন নানা বিচার-বিশ্লেষণের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে, যেখানে যোগ্যতা, নিষ্ঠা, সততা ও দায়বদ্ধতার আলোকে একটি জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও নিরপেক্ষ জনপ্রশাসন গড়ে তোলার সুপারিশ ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে এখনো কোনো দৃশ্যমান বা কার্যকর উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি।
জনজীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসনকে জনবান্ধব করার প্রত্যাশা ছিল সর্বমহলের। বাস্তবে পোশাকের রং পরিবর্তন ছাড়া সংস্কারের উল্লেখযোগ্য কোনো দৃষ্টান্ত এখনো চোখে পড়েনি। মানসিকতার পরিবর্তন যে সবচেয়ে জরুরি, তা এখনো অধরাই রয়ে গেছে। তবে এক্ষেত্রে শুধু পুলিশ প্রশাসনকে এককভাবে দায়ী করা যায় না। আমাদের নাগরিক হিসেবেও নৈতিক দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে প্রশ্ন উঠছে-আমরা কতটা দায়িত্বশীল আচরণ করছি? আইনানুগভাবে দায়িত্ব পালনে পুলিশকে আমরা কতটা সহযোগিতা করছি? অনেক ক্ষেত্রে আইনভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলে আমরাই অযাচিত ক্ষমতা ও প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনের মনোবল দুর্বল করি।
লেখক: ফিরোজ আলম মিলন, সিনিয়র সাংবাদিক।





