কমেনি হাম সংক্রমণ-মৃত্যু

0
3

চলতি বছরের শুরু থেকে ভোগান্তির নাম হাম। রোগটি নিয়ে ঘরে ঘরে আতঙ্ক। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে সরকার হামসংক্রান্ত তথ্য জানায়। এ সময়ে হামজনিত সমস্যা নিয়ে দেশের হাসপাতালে এসেছে ১ লাখ ৩৭ হাজারের বেশি শিশু। গত ১৩১ দিনে সরকারি হিসাবে মারা গেছে ৮১০ জন। প্রতিদিন গড়ে ১ হাজারের বেশি শিশু হাসপাতালে এসেছে। এ সময় মারা গেছে গড়ে ছয়জনের বেশি।

এদিকে রোগটির সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকার সারা দেশে জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করে। ওই কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশুকে টিকার আওতায় নিয়ে আসার কথা বলা হয়। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ জনকে টিকার আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও ১০৩ শতাংশ শিশুকে টিকাদান করা হয়। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৯৫৮ জন বেশি শিশুকে টিকাদান কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসা হয়।

কিন্তু আড়াই মাস পরও হাম সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসেনি। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচ শিশু মারা গেছে। একই সময়ে আরও এক হাজারের বেশি শিশু রোগটির উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে। এদিকে একই বছরের জুনে জাতীয় ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইনে একই বয়সী প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ শিশু অংশ নেয়। সে হিসাবে প্রায় ৪৬ লাখ শিশু হামের টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থেকে যেতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম-রুবেলার টিকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে কোনো গলদ হয়েছে। হয়তো সব শিশুকে টিকার আওতায় নিয়ে আসতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। কারণ জাতীয় ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইন ও হাম-রুবেলার জাতীয় টিকাদানের মধ্যে ফারাক ৪৬ লাখ শিশু। এজন্যই হয়তো হাম প্রতিরোধী গণটিকাদানের পরও কঠোর কোনো রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে এখনো হামের সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে আসছে হাজারের বেশি শিশু আর মৃত্যুও হচ্ছে গড়ে পাঁচ-ছয় শিশুর। হাম মোকাবিলায় ব্যাপক গবেষণা জরুরি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ কালবেলাকে বলেন, হাম প্রতিরোধে বিক্ষিপ্তভাবে কাজ করা হচ্ছে। এপ্রিলে সারা দেশে ১ কোটি ৮০ লাখের বেশি ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুকে নির্ধারণ করা হলো। এরপর ফলাও করে প্রচার করা হলো লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি শিশুকে টিকার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। কিন্তু জুনে এসে দেখা গেল জাতীয় ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইনে একই বয়সী ২ কোটি ২৬ লাখ শিশুকে ভিটামিন এ প্লাস ক্যাপসুল খাওয়ানো হলো। তাহলে এ ৪৬ লাখ শিশু কী হাম প্রতিরোধী টিকার বাইরে ছিল? এজন্যই হয়তো দেশে গণটিকাদান কর্মসূচির পরও রোগটি এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সরকারি হিসাবে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৪৪ জন। তার মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ১ লাখ ২২ হাজার ১৫০ জন, আর নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১৫ হাজার ১৯৪ জনের। তাদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৭১৭ জন। এর মধ্যে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৫৬ জন। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৮১০ জন শিশু। তাদের মধ্যে হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৯৫ জন আর ৯৫ জনের। বাকি ৭১৫ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৩ এপ্রিল পর্যন্ত ১৯ দিনে মৃত্যু হয়েছে ১০৩ জন, ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত ৩২ দিনে ২০৮, ৪ মে পর্যন্ত ৫০ দিনে ৩১১, ১০ মে পর্যন্ত ৫৬ দিনে ৪০৯, ২৩ মে পর্যন্ত ৬৯ দিনে ৫১২, ৩ জুন পর্যন্ত ৮০ দিনে ৬০১, ২৬ জুন পর্যন্ত ১০৩ দিনে ৭০২ জন এবং ২৪ জুলাই পর্যন্ত ১৩১ দিনে ৮১০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

মাসিক মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২ এপ্রিল পর্যন্ত ৪০ জন, ২ থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত ২৩৪, ৩০ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ৩১১ জন মারা যায়। জুনে মৃত্যু হয় ১৩৩ জনের এবং জুলাইয়ের ২৪ দিনে মারা গেছে ৯২ জন। এ পরিসংখানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে মে মাসে। তারপর এপ্রিলে। মে মাসের তুলনায় জুনে প্রায় ৫৭ শতাংশ মৃত্যু কমেছে। তবে এখনো প্রতিদিন প্রাণহানির সংখ্যাটি উদ্বেগজনক।

সম্প্রতি আইসিডিডিআর,বির (আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণাকেন্দ্র, বাংলাদেশ) ইনফেকশাস ডিজিজেস ডিভিশনের সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ও সিনিয়র ডিরেক্টর এবং ভাইরোলজি ল্যাবরেটরি অ্যান্ড জিনোম সেন্টারের প্রধান ড. মোস্তাফিজুর রহমান এক সেমিনারে বলেছেন, এ বছর হাম পরিস্থিতি কেন নতুন করে দেখা দিয়েছে, তা বোঝা জরুরি। পাশাপাশি ভাইরাসের পরিবর্তন, টিকার কার্যকারিতা বা অন্য কোনো কারণ এর পেছনে ভূমিকা রাখছে কি না, সেটিও গবেষণার মাধ্যমে খুঁজে দেখা প্রয়োজন।

নিয়ন্ত্রিত হামের সাফল্য থেকে বড় ধাক্কা কয়েক বছর আগেও দক্ষিণ এশিয়ায় টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতো বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে নিশ্চিত হামের রোগী ছিল ২৪৭ জন এবং ২০২৫ সালে ১৩২ জন। দীর্ঘদিনের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) ফলে হামজনিত মৃত্যু খুবই কমে এসেছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশে ৪২ হাজার ১৭৪টি হামের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে, যা ওই সময়ে বিশ্বের যে কোনো দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ।

সংস্থাটি বাংলাদেশের জাতীয় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিকে উচ্চ এবং আঞ্চলিক ঝুঁকিকে মাঝারি হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতা কমে যাওয়া এবং শিশুদের মধ্যে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতিকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে ডব্লিউএইচও। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি টিকাদানেও সফলতা নেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর ২০২৬ সালের এপ্রিলে সরকার হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে।

প্রথমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এবং পরে সারা দেশে এ কর্মসূচি চালানো হয়। এতে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। সরকারের দাবি, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, লক্ষ্যমাত্রাই প্রকৃত শিশুসংখ্যার তুলনায় কম ছিল।

জুনে জাতীয় ভিটামিন এ প্লাস ক্যাম্পেইনে একই বয়সী প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ শিশু অংশ নেয়। সে হিসাবে প্রায় ৪৬ লাখ শিশু হামের টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থেকে যেতে পারে। হামে মৃত্যুর প্রায় ৮০ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রায় ৮০ শতাংশ শিশুই আগে হামের টিকা পায়নি।

আবার আইসিডিডিআর,বি এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের ১৯ গবেষকের আরেকটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, এপ্রিল-মে মাসে চিকিৎসা পাওয়া ৩৪১ শিশুর মধ্যে যারা মারা গেছে, তাদের ৫২ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের কম। অর্থাৎ নিয়মিত টিকাদানের পূর্ণ সময়সূচি শেষ করার আগেই তারা আক্রান্ত হয়েছিল।

ডব্লিউএইচওর তথ্যেও দেখা গেছে, চলমান প্রাদুর্ভাবে প্রতি পাঁচজন আক্রান্তের চারজনই পাঁচ বছরের কম বয়সী। হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ গেল আরও ৫ শিশুর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল হামবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচ শিশু মারা গেছে। এ নিয়ে হামের উপসর্গে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭১৫ জনে। একই সময়ে নিশ্চিত হামে ৯৫ জন মারা গেছে। নিশ্চিত হামে কেউ মারা না গেলেও হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে পাঁচজন।

এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম-সংক্রান্ত রোগে প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮১০ জনে। এ ছাড়া নতুন করে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১৮৭ জনের। একই সঙ্গে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে ৯৫০ জনের। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৪ হাজার ৭১৭ জন। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করেছে ১ লাখ ১ হাজার ৫৬ জন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here