এবার সমঝোতার পথে হাঁটছে নোমান গ্রুপ

0
157

এবার সমঝোতার পথে হাঁটছে নোমান গ্রুপ। জাল দলিল দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা তসরুপ করার পর, এখন সেই দলিলকে মূল দলিল তৈরির জন্য জমির মূল মালিকের সাথে সমঝোতা করছে নোমান গ্রুপ। এ লক্ষ্যে তৈরি হচ্ছে ড্রাফট। খসড়া ড্রাফটে মূল জমি আবার ক্রয় এবং অন্যান্য জমিগুলোতেও মালিক হিসেবে মালিক মিসেস শারমিন আক্তার ও কাজী মশিউর হোসেইনের স্বাক্ষর দেয়ার কথা চূড়ান্ত হয়েছে। ফলে জমির মূল্য হিসেবে বিপুল অংকের অর্থ লেন-দেন হবে। আর এই সমঝোতার ফলে নিজেদের অর্থনৈতিক অনিয়মকে এক ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে যাচ্ছে নোমান গ্রুপ। একাধিক সুত্র নিশ্চিত করেছে যে, মামলা-মোকদ্দমা, হয়রানি এবং প্রাণ ভয়ে নোমান গ্রুপের সাথে সমঝোতায় রাজি হয়েছেন জমির মূল মালিক মিসেস শারমিন আক্তার ও কাজী মশিউর হোসেইন।

বিশেষ সুত্রে জানা যায় যে, সম্প্রতি উঁচ্চ আদালতের দায়েরকৃত ১৩৯০/২৪ নং রিভিশন মামলা থেকে বাঁচার জন্য নোমান গ্রুপ কর্তৃপক্ষ পিটিশনার মিসেস শারমিন আক্তার ও তাহার স্বামী কাজী মশিউর হোসেইনকে বিভিন্ন মিথ্যা মামলা ও মৃত্যুর হুমকি দিয়ে এবং অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ করে রিভিশন মামলা প্রত্যহার করে নিয়ে নিম্ন আদালতে শারমিন আক্তার ও মশিউরকে ইসমাইল স্পিনিং, নোমান স্পিনিং, নোমান টেক্সটাইল, সুফিয়া ফেব্রিক্স,ইসমাইল আন্জুমান আরা ফেব্রিক্স, জাবের এন্ড জুবায়ের এক্সসরিজ, জাবের এন্ড জুবায়ের ফেব্রিক্স লিঃ এর বর্নিত ভুয়া ও অকার্যকর দলিল স্বীকার করিয়ে সোলেনামা করাতে একাধিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যাতে নোমানগ্রুপ কর্তৃপক্ষ ব্যাংক জালিয়াতি থেকে রক্ষা পেতে পারে এবং সরকারি রেজিষ্ট্রেশন-ফি ফাঁকি দিতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নোমান গ্রুপের চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম জানান, ওরা একটা প্রস্তাব দিয়েছে। আমরা এখনো এ বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত নিই নাই।ডিক্রিমূলে মালিকানার আদেশ প্রসঙ্গে নোমান গ্রুপের চেয়ারম্যান বলেন, জমির মালিক হিসেবে শারমিন আক্তার কিংবা মশিউর রহমান দীপুকে স্বীকৃতি দেয়ার অভিযোগ সম্পূর্ন অবান্তর কারণ কখনোই তারা জমির প্রকৃত মালিক ছিলেন না। আর জাল দলিল দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋন নেয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমি দৃঢ়ভাবে এসকল মানহানিকর ভিত্তিহীন অভিযোগ অস্বীকার করছি।

এদিকে, রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গাজীপুর জেলা থানার ১৩২ নং পাগাড় মৌজার সি.এস ও এস.এ ৪৩৫, ৪৩৭, ৪৩৮, ৪৪০, ৪৬৯, ৪৭০, ৪৭১, ৪৭২, ৪৯৩, ৪৯৪, ৪৯৬, ৪৯৭, ৪৯৮, ৪৯৯, ৫০০, ৫০৩, ৫০৫, ৫১০, ৫৫৪, ৫৫৫, ৫৫৯, ৫৬৭নং ইত্যাদি দাগ সহ আরো অন্যান্য দাগের জমিতে ঢাকা ও গাজীপুর জেলার দেওয়ানি আদালতের ৫২/২০০০ইং, ৫৪/০৯ইং, ৯৫/২০০৫ইং তিনটি মামলার রায় ও ডিগ্রীমূলে ১৬ আনা সম্পত্তির মালিক মিসেস শারমিন আক্তার ও কাজী মশিউর হোসেইন দম্পতি। বিভিন্ন সময়ে দলিল জাল-জালিয়াতি ও তথ্য গোপন করে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে ওই জমি ক্রয় করেন নোমান গ্রুপের চেয়ারম্যান মোঃ নুরুল ইসলাম। জাল দলিলে ক্রয় করে এসব জমি ইসমাইল স্পিনিং মিলস লি:, নোমান স্পিনিং মিলস লি:, নোমান টেক্সটাইল মিলস লি:, জাবের এন্ড জুবায়ের এক্সেসরিজ মিলস লি: ইসমাইল আঞ্জুমান আরা ফেব্রিক্স লি: ও জাবের এন্ড জুবায়ের ফেব্রিক্স লি: এবং স্ত্রী সুফিয়া খাতুন, নিকটাতাত্মীয় ইমরান আহমদ চৌধুরী, সামশুল ইসলাম চৌধুরীর নামে একাধিক জাল ও ভুয়া দলিল সৃষ্টি করে।

ওই সব জাল দলিলেই ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, ডাচ বাংলা ব্যাংক পিএলসি ,বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক পিএলসি ,লংকা বাংলা ফাইন্যান্স ,অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি ,এনসিসি ব্যাংক পিএলসি, ঢাকা ব্যাংক পিএলসি এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টাড ব্যাংক  ইত্যাদি ব্যাংক থেকে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকার ঋন নেন।

অন্যদিকে দেওয়ানী ৫২/২০০০ইং, ৫৪/০৯ইং, ৯৫/০৫ইং মামলার রায় ও ডিগ্রীমূলে মিসেস শারমিন আক্তার ও তাহার স্বামী কাজী মশিউর হোসেইন এর ১৬ আনা স্বত্ব স্বীকার করে তাদের নিকট থেকে পৃথক পৃথক দলিলের মাধ্যমে নোমান গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সুফিয়া খাতুনের নামে বিগত ০৪/১০/২০০৬ইং ও ০৮/১১/২০১০ইং তারিখে টঙ্গী সাব রেজিঃ অফিসের রেজিঃকৃত ৩৯৮২নং ও ২২৫৯১নং দলিলমূলে এবং পুত্র-কন্যা ও নোমান ফ্যাশনের নামে বিগত ২৭/০৪/০৯ইং তারিখে ৬১৪৯নং ও ৬১৫০নং রেজিঃকৃত দলিলমূলে ক্রয় করে ডাচ বাংলা ব্যাংক থেকে লোন নেন।

এ বিষয়ে দৈনিক মুক্ত খবর, লাখোকন্ঠ, এই বাংলা, স্বাধীন সংবাদ সহ আরো বেশ কয়েকটি পত্রিকায় বিভিন্ন শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার হলে চট্রগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আধুনগর সরদানী পাড়ার মরহুম ছিদ্দিক আহমদের ছেলে আনোয়ার হোছাইন নামে এক কলেজ ছাত্র দেশ ও জনগণের আমানতের ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ উদ্ধারের স্বার্থে বিগত ১৮/০৭/২২ ও ২২/১২/২০২২ইং তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংক বরাবর অভিযোগ দায়ের করেন। জনস্বার্থে চেয়ারম্যান দুর্নীতি দমন কমিশনসহ ডাচ বাংলা ও ইসলামী ব্যাংক সহ বিভিন্ন ব্যাংক-কে অনুলিপি প্রেরণ করেন। এ বিষয়ে বিগত ৩১/১০/২২ ইং ও ০৪/১১/২২ইং তারিখে দৈনিক   ইনকিলাব ও সকালের সময় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়।  নোমান গ্রুপ উক্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার অংশ হিসেবে ৩৬৩৩ নং একটি জোত টেম্পারিং করে বিগত ২৮/১০/২০১০ইং তারিখে রেজি:কৃত ২১৭৭৮ নং একটি  জাল দলিল সৃষ্টি করে জাবের এন্ড জুবায়ের ফেব্রিক্স লিঃ এর পার্টনার সামশুল ইসলাম চোধুরীকে বাদী সাজিয়ে মশিউর হোসাইন ও তাহার স্ত্রী শারমিন আক্তারের বিরুদ্ধে গাজীপুর ২য় যুগ্ন জেলা জজ আদালতে ৪২/২০২৩নং মামলা দায়ের করেন। মুরাদুল ইসলাম নামে নোমান গ্রুপেরই এক কর্মচারীকে বাদী সাজিয়ে বিজ্ঞ সিনিয়র মেট্রোপলিন ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত, গাজীপুর-এ সিআর ২৫৬/২৩ নং আরো একটি মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় মিসেস শারমিন আক্তার ও কাজী মশিউর হোসেইন থেকে ক্রয়কৃত সম্পত্তি অস্বীকার করেন।

দেওয়ানী ৪২/২০২৩ মামলায় কাজী মশিউর হোসেইন ও শারমিন আক্তার বিগত ০৬/০৬/২৩ইং তারিখে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও জেলা প্রশাসক গাজীপুরকে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, কৃষি ব্যাংকসহ মোট ২১টি ব্যাংক-কে  বিবাদী করার জন্য দরখাস্ত দেন এবং সামশুল ইসলামের দলিলে বর্ণিত ৩৬৩৩ নং জোত ও নামজারি জমাভাগটি আদালতে দাখিল করার জন্য আরেকটি পৃথক দরখাস্ত দাখিল করেন। আদালত উক্ত দরখাস্ত আমলে না নিয়ে বিগত ১২/০৪/২০২৪ইং তারিখে বিবাদীর আবেদন নামঞ্জুর করত: মামলাটি একতরফা শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন। এই আদেশে জজ সাহেব নোমান গ্রুপের পক্ষ অবলম্বন করায় বিবাদী কাজী মশিউর হোসেইন আদালতের জজ সাহেবের বিরুদ্ধে সরাসরি সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বরাবর অভিযোগ দাখিল করেন। অতঃপর প্রধান বিচারপতির নির্দেশে সিনিয়র জেলা জজ মমতাজ বেগমের এক সাক্ষরে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে মামলাটি যুগ্ম জেলা জজ ১ম আদালত, গাজীপুর-এ বদলী করা হয়। জাবের এন্ড জুবায়ের ফেব্রিক্স লিঃ এর পার্টনার সামশুল ইসলামের জাল দলিল ও জাল জোত এবং ব্যাংকের আর্থিক লগ্নি থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকসহ মোট ২১টি ব্যাংক-কে মূল মামলায় পক্ষ করার জন্য বিগত ৩১/০৩/২০২৪ইং তারিখে হাইকোর্টে ১৩৯০/২৪ নং রিভিশন মামলা দায়ের করেন কাজী মশিউর হোসেইন ও মিসেস শারমিন আক্তার।  উক্ত রিভিশন মামলায় নোমান গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম ও ভাইস চেয়ারম্যান সুফিয়া খাতুন। নোমান গ্রুপের পরিচালক আবদুস সামাদ মো: রফিকুল ইসলাম নোমান, নূর-ই-ইয়াছমিন ফাতেমা, মো: আবদুল্লাহ জাবের, আবদুল্লাহ মো: জুবায়ের, আবদুল্লাহ মো: তালহা এবং জাবের এন্ড জুবায়ের ফেব্রিক্স লি: এর পক্ষে পরিচালক মো: নুরুল ইসলামকে বিবাদী করা হয়।

হাইকোর্ট তা আমলে নিয়ে শারমিন আক্তার ও কাজী মশিউর হোসেইনের পিটিশনের পক্ষে সম্মতি দিয়ে রুল ও স্টে আদেশ দেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here