অনিয়মের আখড়া সিটি ব্যাংক

0
91
পরীমণি, পরীমনি, সিটি ব্যাংকের এমডি,মাসরুর আরেফিন

ঋণ প্রদানে নিয়ম মানছে না বেসরকারি খাতের সিটি ব্যাংক। বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে নিয়ম না মেনে ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকটিতে কর্মরত কর্মকর্তাদের ঋণ প্রদানেও করা হয়েছে অনিয়ম। তা ছাড়া যেসব কর্মকর্তা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত তাদের শাস্তি না দিয়ে উল্টো পুরস্কৃত করে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক তদন্ত প্রতিবেদনে সিটি ব্যাংকের এসব অনিয়মের চিত্র ফুটে উঠেছে।

সাবেক এমডির অনিয়ম

২০১৯ সালের কথা। নিজের বেতন বাড়ানো, বাড়তি মেয়াদে গৃহঋণ, বেতনের হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেন, নিয়ম লঙ্ঘন করে পছন্দের কর্মকর্তাকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ায় পদ ছাড়তে হয় সিটি ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হুসেইনকে। ২০০৭ সালে সিটি ব্যাংকে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে যোগ দেন সোহেল। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের নভেম্বরে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান। দ্বিতীয় দফায় সোহেল হুসেইনের এমডির দায়িত্ব পালনের মেয়াদ ছিলো ২০১৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। পর্ষদের চাপে মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯ মাস আগেই পদত্যাগ করেন তিনি।মাত্রাতিরিক্ত অনিয়মের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বেশ কয়েকটি বিধি নিষেধ লঙ্ঘিত হয়েছে সিটি ব্যাংকে। পর্ষদের কোনো সদস্য এমডির এসব অনিয়ম ভালো চোখে নেননি। যে কারণে পদত্যাগ না করে আর কোনো উপায় ছিল সোহেল আর কে হুসেইনের।  বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি মোতাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বেতন ও অন্যান্য সুবিধাদি নিয়োগপত্রে উল্লেখ করা থাকে। চুক্তির বাইরে এমডির আর কোনো সুবিধা নেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু সোহেল আর কে হুসেইন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা উপেক্ষা করে নির্ধারিত বেতন-ভাতার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অতিরিক্ত বেতন ও অন্যান্য সুবিধা নিয়েছেন। এভাবে বেতনের অতিরিক্ত প্রায় ১ কোটি টাকা নিয়েছেন তিনি।  বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০ বছর মেয়াদে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা বাড়ি বানানোর (হাউস বিল্ডিং) ঋণ নিয়েছেন সোহেল আর কে হুসেইন। চাকরিকাল ৬০ বছর ধরে তাকে এই ঋণ ১৬ বছরের বেশি মেয়াদে দেওয়ার সুযোগ নেই। ঋণের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ বছর। এতে ঋণ আদায়ে অনিয়শ্চয়তার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এক বছরের ব্যবধানে ঋণের বিপরীতে মামলা পরিচালনায় আইনগত ব্যয় বেড়েছে ৩৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। ২০১৭ সালে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৫ কোটি টাকার বেশি। অথচ আগের বছর ব্যয় হয়েছিল সাড়ে তিন কোটি টাকা। মামলার পেছনে যে পরিমাণ অর্থ খরচ হয়েছে, সেই তুলনায় আদায় যৎসামান্য।  প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যোগদানের ৫ মাসের মাথায় সাফায়েত উল্যাহকে ৭০ লাখ টাকা বাড়ি বানানোর ঋণ এবং আরও ৪০ লাখ টাকা বাণিজ্যিক ঋণ দেওয়া হয়েছে। এই ঋণ কতদিনে পরিশোধ করতে হবে, তার কোনো মেয়াদ উল্লেখ করা হয়নি। সীমা লঙ্ঘন করে এত দ্রুত ঋণ প্রদান বিধি বহির্ভুত হিসেবে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।  প্রতিবেদনের শেষ অংশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয় সিটি ব্যাংক। সব সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা পাশ কাটিয়েছে ব্যাংকটি। এর পরপরই পদ ছাড়তে বাধ্য হন সিটি ব্যাংক লিমিটেডের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হুসেইন।

পরিচালক আব্দুল ওয়াদুদের অনিয়ম

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরের চিঠি মোতাবেক লাকী শিপ বিল্ডার্সকে নিয়ম না মেনে অভিনব কৌশলে ঋণ দেওয়া হয়। এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট (সিআরএম) ডিভিশন প্রধান আব্দুল ওয়াদুদ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ওয়াদুদ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু সিআরএম ডিভিশন প্রধানের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে মাত্র একদিনের বেতন কাটার মতো লঘু শাস্তি দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, তাকে আরও কয়েকটি বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে বলা হয়Ñ যে কর্মকর্তাকে শাস্তি প্রদানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তরফ থেকে নির্দেশনা রয়েছে সেই কর্মকর্তাকে মাত্র একদিনের বেতন কর্তনের মতো শাস্তি কীভাবে কঠোর শাস্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং কোন বিবেচনায় বিশেষ ইনক্রিমেন্ট প্রদানসহ পদোন্নতি দেওয়া হলো তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

লিগ্যাল বিভাগের প্রধান সাফায়াত উল্যাহর অনিয়ম

নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত সিটি ব্যাংকের আরেক কর্মকর্তা লিগ্যাল বিভাগের প্রধান সাফায়াত উল্যাহ। নিয়ম না মেনে তাকে দ্রুত পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ২০১৬ সালের ১৬ মে সিটি ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে যোগদানের পর তাকে মাত্র ৯ মাসের মধ্যে পদোন্নতি এবং ৬ শতাংশ হারে বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। পুনরায় আবার এক বছরের মধ্যে সাফায়াত উল্যাহকে ২৬ শতাংশ বিশেষ বেতন বৃদ্ধি করা হয়। কিসের ভিত্তিতে এ ধরনের পদোন্নতি প্রদান ও বিশেষ বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ বা যৌক্তিকতা পায়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন টিম। পদোন্নতি নীতিমালা লঙ্ঘন করে একজন কর্মকর্তাকে এত দ্রুততার সঙ্গে এ ধরনের পদোন্নতি করা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত ও অযৌক্তিক বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ব্যাংকটির প্যানেল আইনজীবী তালিকা পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, শাফায়াত উল্যাহ ব্যাংকটির লিগ্যাল ডিভিশনের প্রধানের দায়িত্বে নিয়োজিত অথচ তার লিগ্যাল কন্সালট্যান্সি ফার্ম চৌধুরী অ্যান্ড উল্যাহ’ প্যানেলভুক্ত আইনজীবী যা বিধিবহির্ভূত এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যাংকের হোম লোন সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণেও দেখা যায় সাফায়েত উল্যাহকে সীমাতিরিক্ত হোম লোন প্রদান করা হয়েছে। হোম লোন নীতির আলোকে এসভিপি গ্রেডের জন্য নির্ধারিত ঋণসীমা ছিল ৭০ লাখ টাকা। কিন্তু সাফায়েত উল্যাহকে ২০ বছর মেয়াদে ১ কোটি ১০ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে। ব্যক্তির চাকরিকাল কত তা পর্যালোচনা না করেই তার গৃহঋণ ৮ শতাংশ সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে যা পরবর্তীতে কখনও পরিবর্তন করা হয়নি। নীতিমালা পরিবর্তন করে একজন কর্মকর্তাকে এত দ্রুততার সঙ্গে এ ধরনের স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি সীমাতিরিক্ত ঋণ প্রদান করা সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত বলে জানানো হয়। এ ছাড়াও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত পরিদর্শন বিভাগ ব্যাংকের ৩৯ জন নির্বাহী কর্মকর্তাকে (এসভিপি থেকে এমডি পর্যন্ত) ২২ কোটি ৬০ লাখ টাকা প্রদত্ত ঋণের স্থিতি সম্পর্কে ব্যাংকটিকে বিশদ জানাতে বলা হয়েছে।

কর্মকর্তার মো. জাহেদ আলমের অনিয়ম

ব্যাংকের কর্তা তিনি। গ্রাহকের আমানতের সুরক্ষা দেওয়াই তাঁর কর্তব্য। সেই রক্ষকই এবার হয়েছেন ভক্ষক। জালিয়াতি করে তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন গ্রাহকের কষ্টের ২ কোটি ২০ লাখ টাকা! প্রতারণায় কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া ব্যাংকের এই কর্মকর্তার নাম মো. জাহেদ আলম। তিনি সিটি ব্যাংক অক্সিজেন শাখার রিলেশনশিপ ম্যানেজার। ২০১৫ সাল থেকে ২০২৩ সালের জুলাই পর্যন্ত সিটি ব্যাংক অক্সিজেন শাখার বিভিন্ন গ্রাহকের ২ কোটি ২০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন অভিযুক্ত জাহেদ। একইভাবে গত ২৬ জুলাই সাইফুর রহমান নামের এক গ্রাহকের ৪৯ লাখ ৫০ হাজার টাকার পে-অর্ডার জালিয়াতি করেন তিনি। এ ঘটনা তদন্তের পর মোট ২ কোটি ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পায় নিরীক্ষা বিভাগ। এরপর গত ৩১ জুলাই খুলশী থানায় মামলা করলে পুলিশ জাহেদ আলমকে গ্রেপ্তার করে। পরে খুলশী থানা এজাহারটি সাধারণ ডায়েরি করে দুদক বরাবর পাঠায়। এরপর ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জাহেদকে আদালত হাজির করা হয়। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠান। বুধবার দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮ ৪৭১ এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় জাহেদকে আসামি করে মামলা করেন একই কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. ফয়সাল কাদের।

সৈয়দপুর সিটি ব্যাংকের অনিয়মদুর্নীতি

নীলফামারীর সৈয়দপুর দি সিটি ব্যাংক লিমিটেড জড়িয়ে পড়েছে একের পর এক অনিয়ম দুর্নীতিতে। ২০২৩ সালের ১৮ জুন এক নারী গ্রাহকের এফডিআরের ৩৪ লাখ টাকা উধাও হয়ে যায় অ্যাকাউন্ট থেকে। ওই খবরটি জাতীয় দৈনিক ভোরের দর্পণসহ বেশ কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশ হলে গ্রাহকের মধ্যে তোলপার সৃষ্টি হয়। পরদিন ব্যাংক বন্ধ থাকায় গ্রাহকরা অনেকটা ছিল টাকা হারানোর আতংকে। রোববার ১৮ জুন ব্যাংক খোলা হলে অ্যাকাউন্ট চেক করতে গ্রাহকদের উপচেপড়া ভীড় লেগে যায় ব্যাংকে। এদিনও কয়েকজন গ্রাহকের একাউন্টে জমাকৃত টাকা শুন্য থাকায় তা সমন্বয় করা হয়। এর পরিমাণ প্রায় অর্ধ কোটি টাকা। এ ছাড়া ওইদিন শতাধিক গ্রাহক ব্যাংক থেকে তাদের আমানত তুলে নেয়। সৈয়দপুর শাখার এ অনিয়ম ও দূর্নীতি তদন্তে প্রধান কার্যালয় থেকে অডিটের জন্য ২ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আসেন। তারা গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট চেক করা, অভিযোগের ভিত্তিতে সমন্বয় ও আমানত উত্তোলনে সহযোগিতা করাসহ অন্যান্য বিষয় তদন্ত করছে বলে জানানো হয়।  অপরপাশে এক নারী গ্রাহক ব্যাংকে গিয়ে তার অ্যাকাউন্ট চেক করলে হিসাবে গড়মিল মেলে। যার পরিমান ১৪ লাখ টাকা। এদিকে শহরের গোলাহাট এলাকার শেফালী রানী নামে অপর এক গ্রাহকের প্রায় ১০ লাখ টাকার হিসেব মিলছে না। একই এলাকার মনোরঞ্জন নামের আরেক গ্রাহকের ১৮ লাখ টাকাও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে হাওয়া হয়ে গেছে। এভাবে আরও প্রায় ৩ জন গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট শুন্য পাওয়া যায়। ওই গ্রাহকরা ব্যাংকের এমন কাজে ক্ষিপ্ত। তারা অভিযোগ দিতে চাইলে তা গ্রহণ করা হয়নি। শাখা ম্যানেজার দিশেহারা। তিনি দ্রুত টাকা সমন্বয় করে সমাধানের চেষ্টা করার কাজে ব্যতিব্যস্ত। ওই ব্যাংকে প্রায় ৪২ লাখ টাকার অনিয়মের ঘটনা বেড়িয়ে আসে।

 

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here