ভুয়া ওয়েসাইট বানিয়ে প্রতারণায় দেড় শতাধিক বিনিয়োগকারী সর্বশান্ত !

0
143

ভুয়া ওয়েসাইট বানিয়ে প্রতারণা সর্বশান্ত দেড় শতাধিক বিনিয়োগকারী। তাদের মধ্যে মোঃ হাবিবুর রহমান, কাপ্তান বাজারের একজন ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ী। দীর্ঘদিনের পরিচিত অ্যাডভোকেট রহিম নামক এক ব্যাক্তির কথায় মুগ্ধ হয়ে তিনি ”এক্সএক্সপ্রেস ডট আইও” প্রকল্পে বিনিয়োগ করেন ১২ হাজার ডলার, টাকায় যার পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ ডলার।

মনোয়ার হোসেন মনির একটি ট্র্যাভেল এজেন্সিতে চাকরি করেন। দীর্ঘ সময়ের পরিচিত ক্লয়েন্ট জনৈক নারী উদ্যোক্তার কথায় প্রলুব্ধ হয়ে বিনিয়োগ করেন ৮ হাজার ডলার বা প্রায় ৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

মোঃ আলমগীর পুরান ঢাকার একজন ব্যবসায়ী। স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতা কাপ্তানবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি কামাল পাশার অনুরোধে একই স্ক্যামে ১৫ হাজার ডলার বা প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন।

এভাবেই XEXPRESS.IO ডোমেইন নাম দিয়ে, অসংখ্য মিথ্যা ও ভুয়া তথ্য সম্বলিত একটি ওয়েবসাইট বানিয়ে, সেই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ডলার ইনভেস্টমেন্টের পর ”ডেইলী প্রফিট রিটার্ন” পাওয়ার লোভ দেখিয়ে মাত্র ৪মাস পর লেন-দেন বন্ধ করে বিনিয়োগকারীদের পুরো টাকা গায়েব করে দেয়া হয়েছে।কমবেশি ১৫০ব্যক্তি থেকে হাতিয়ে নেয়া টাকার পরিমান ৮লাখ ডলারের ওপর, যা বাংলাদেশী মূদ্রায় ১০ কোটি টাকার ওপরে। আর টাকা ফেরত চেয়ে অনবরত হুমকি পাচ্ছেন বিনিয়োগকারী সাধারণ মানুষ।

ইতিমধ্যে এই বিষয়ে রাজধানীর ওয়ারী থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন একজন ভুক্তভোগী। আরও কয়েকজন ভুক্তভোগীও ঢাকার বিভিন্ন থানায় প্রতারকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। কিন্তু এতকিছুর পরেও প্রতারকরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর অনবরত ভুক্তভোগীদের টেলিফোনে এবং বিভিন্ন ভাড়াটে সন্ত্রাসী বাহিনী ব্যবহার করে হুমকি-ধামকি দিয়ে যাচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এবং বিভিন্নভাবে অনুসন্ধান করে পাওয়া তথ্যমতে, এই প্রতারক চক্রের মূলহোতা জনৈক অ্যাডভোকেট রহিম ওরফে রাহুল আহমেদ। আর তার প্রধান দুই সহযোগী হলেন কাপ্তানবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি কামাল পাশা এবং নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ওয়ারী থানা কমিটির সদস্য ও যাত্রাবাড়ি থানায় বৈষ্যম্যবিরোধী হত্যা ও অস্ত্র মামলার এজাহারভুক্ত আসামী সোহাগ পাঠান ওরফে সোহেল পাঠানওরফেএসএমপাঠান।কয়েকজন ভুক্তভোগীর অভিযোগ অনুযায়ী এই চক্রের সঙ্গে একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার এক নারী উদ্যোক্তারও যোগসাজস রয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অ্যাডভোকেট রহিম বিভিন্ন রেস্তারো এবং হল রুমে সেমিনার আয়োজন করে সেখানে XEXPRESS.IO ওয়েব সাইটের মাধ্যমে ডলার বিনিয়োগ করে কিভাবে ”ডেইলি প্রফিট রিটার্ন” বা প্রতিদিন লভ্যাংশ পাওয়ার মাধ্যমে অন্য যেকোনো ব্যবসার চেয়ে অধিক পরিমাণ লাভবান হওয়া যায় -সে বিষয়ে বক্তব্য রাখতেন। বিনিয়োগ করা ডলার কোন ধরনের ব্যবসায় বিনিয়োগ হচ্ছে যে এত বিপুল পরিমান লাভ পাওয়া যাচ্ছে -এমন প্রশ্নের জবাবে রাহুল আহমেদ ওরফে এডভোকেট রহিম বলতেন, ক্রিপ্টকারেন্সি বা বিটকয়েন ব্যবসায় এই ডলার বিনিয়োগ হয় বলেই এত পরিমান লাভ দেয়া সম্ভব হয়।

অ্যাডভোকেট রহিম বক্তব্য শেষ করা পরপরই ৫/৭জন ব্যক্তি উঠে দাঁড়িয়ে জোরগলায় এখানে বিনিয়োগ করেবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা বড় অংকের ডলার বিনিয়োগ করবেন বলে সেখানেই ওয়াদা করতেন।

অ্যাডভোকেট রহিমের সুমিষ্ট ভাষণ আর অনেকগুলো মানুষের বিনিয়োগ করার ওয়াদা -এসব দেখেই মূলত প্রলোভনে পড়ে গিয়ে ভুক্তভোগীরা এই ডলার স্ক্যাম প্রতারণার ফাঁদে জড়িয়ে পড়েন বলে জানান। অ্যাডভোকেট রহিমের পাশাপাশি কাপ্তানবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি কামাল পাশা এবং একজন নারী উদ্যোক্তাও সেসব সেমিনারে বিনিয়োগ আহ্বান করে বক্তব্য রাখতেন।

XEXPRESS.IO ওয়েবসাইটের অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়া, ডলার জমা দেওয়া এবং প্রফিট বা লাভ উত্তোলনের গোটা পদ্ধতি সবাইকে শিখিয়ে দেন সোহেল পাঠান ওরফে সোহাগ পাঠান ওরফে এসএম পাঠান। তাছাড়া XEXPRESS.IO ওয়েবসাইটটি ভিয়েতনাম থেকে পরিচালিত হয় এবং সোহাগ পাঠান ওই প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশ জোনের প্রধান এজেন্ট -এমন পরিচয়ই বরাবর সবার কাছে দেয়া হতো।

এভাবেই প্রলুব্ধ হয়ে প্রায় দেড় শতাধিক ব্যক্তি চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৮ লাখ ডলার এই স্ক্যামে বিনিয়োগ করেন, বাংলাদেশী মূদ্রায় যা প্রায় সাড়ে ১০ কোটি ডলার।

এমতাবস্থায় জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে হঠাৎ করেই XEXPRESS.IO ওয়েবসাইটে একাউন্টগুলোতে নিয়মিত লভ্যাংশ জমা হতে থাকলেও, উত্তোলন করার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায় এবং উত্তোলন করতে চাইলেই ”ওয়েব সাইট আন্ডার মেইনটেনেন্স” বার্তা দেখাতে থাকে। এই সমস্যা বিষয়ে জানতে চাইলে ”দু-একদিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে”- অ্যাডভোকেট রহিম ও সোহাগ পাঠান এমন ভরসা দিলেও, দিনের পর দিন লভ্যাংশ উত্তোলন বন্ধই হয়ে থাকে।

একপর্যায়ে এডভোকেট রহিম ও সোহেল পাঠান বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে দুরত্ব তৈরির পাশাপাশি নানাপ্রকার বিরুপ আচরণ শুরু করেন এবং বিভিন্ন মোবাইল নাম্বার থেকে আর সেই সঙ্গে আরও কিছু অজ্ঞাত নাম্বার থেকে নানা ধরনের হুমকি-ধামকি দেয়া শুরু করে, বিনিয়োগ করা ডলারের বিষয়টি ভুলে যেতে বলে, অন্যথায় ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যদের -বিশেষ করে তাদের সন্তানদের বড়ধরনের ক্ষতি করা হবে বলে হুমকি দেয়া শুরু করে।

অনুসন্ধানে জানা যায় যে, বাইরে থেকে একটি গেমিং ওয়েবসাইটের রূপ দিয়ে এর ভেতরে যে বিপুল অংকের ডলার জমা দেয়া এবং সেখানে বিটকয়েন ব্যবসার মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে তা থেকে লভ্যাংশ দেয়ার একটি নোংরা খেলা হয়েছে -তা কোনোভাবেই বোঝা সম্ভব না। আইপি বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, ওয়েবসাইটের শুরুর দিকে লেখা রয়েছে ২০বছর ধরে তারা নাকি কম্পিউটার গেমিং নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। অথচ ডোমেইন বিষয়ক তথ্যে দেখা যাচ্ছে এটি ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪ -এ হোস্টিং করা, যার মেয়াদ রয়েছে মাত্র একবছর ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫পর্যন্ত।

ওয়েবসাইটেরর নিচের দিকে ভিয়েতনামের একটি ঠিকানা ও ফোন নাম্বার ব্যবহার করা হয়েছে। ফোন নাম্বারটি ভুয়া, ডায়াল করলেই বোঝা যায়। আর ঠিকানাটি একটি ভিয়েতনামের একটি দোকানের, যা গুগল লোকেশন গেলেই পাওয়া যায়। আর, ওয়েবসাইটটি নির্মাণ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এটি অত্যন্ত সস্তা একটি ভিপিএন সফটয়ার ক্লাউড ফ্লেয়ার (CLOUDFLARE) ব্যবহার করে চালানো হচ্ছে।

এর ইপি সবসময় পরিবর্তনশীল এবং আইপি লোকেশন সবসময় আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া দেখায়। কারণ ক্লাউড ফ্লেয়ার (CLOUDFLARE) প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয় আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায় যে, প্রধান মাস্টারমাইন্ড হিসেবে চিহ্নিত অ্যাডভোকেট রহিম গত কয়েকমাসে ঢাকার বনশ্রীতে দেড়কোটি টাকা মূল্যের ফ্ল্যাট, আফতাবনগরে প্রায় তিন কোটিটাকা মূল্যের জমি এবং ৯০ লাখ টাকা মূল্যের গাড়ি ক্রয় করেছেন। আর সহযোগী মাস্টারমাইন্ড হিসেবে চিহ্নিত সোহেল পাঠান ওরফে সোহাগ পাঠান ওরফে এসএম পাঠান গত তিনমাসে মুন্সিগঞ্জে কয়েক বিঘা জমি কিনেছেন, কক্সবাজারে রিসোর্ট করার উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করেছেন এবং সাড়ে ৪কোটি টাকা মূল্যের দুটো দামি গাড়ি কিনেছেন।

নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, স্ক্যাম থেকে আয়কৃত টাকার বৃহদাংশ এখনো প্রধান মাস্টারমাইন্ড হিসেবে চিহ্নিত রাহুল আহমেদ ওরফে এডভোকেট রহিমের চারটি ব্যাংক একাউন্টে রয়েছে, যার পরিমাণ ৫লাখ ডলারের বেশি।

এছাড়া দ্রুত দেশছাড়ার চেষ্টা করছেন তিনি, অনবরত কানাডার ভিসা পাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আর বাকি দুই মাস্টারমাইন্ড কাপ্তানবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি কামাল পাশা এবং সোহাগ পাঠান ওরফে সোহেল পাঠান ইতিমধ্যেই গা ঢাকা দিয়েছেন।

এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে এডভোকেট রহিম, সহযোগী সোহাগ পাঠান, সহযোগী কামাল পাশা এবং সহযোগী শাহনাজ পারভীনকে ফোন করলে সেগুলো বন্ধ পাওয়া যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here