জেনারেল জিয়ার শাসনামল (১৯৭৫-৮১)
ক. ক্ষমতায় আরোহণ ও ক্ষমতা সুসংহতকরণে গৃহীত পদক্ষেপ
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমান ২ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ২৭শে মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারের মাধ্যমে ‘মেজর জিয়া’ (তখন তিনি মেজর) সর্বপ্রথম জনসমক্ষে পরিচিতি লাভ করেন। স্বাধীনতার পর একজন দক্ষ ও পেশাদার অফিসার হিসেবে তিনি বেশ সুনাম অর্জন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হলে তিনি (মোশতাক) জেনারেল কে এম সফিউল্লাহকে চিফ অব স্টাফের পদ থেকে সরিয়ে তদস্থলে জিয়াউর রহমানকে নিযুক্ত করেন (জিয়া তখন ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ছিলেন)। ওই বছর ৩রা নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্ব এক সেনা অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। এর চার দিনের ভেতর ৭ই নভেম্বর জিয়ার নিজ সমর্থক ও জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার উদ্যোগে সংঘটিত হয় এক পাল্টা সেনা অভ্যুত্থান। এ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জেনারেল জিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উত্থান ঘটে। রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এ এস এম সায়েম প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং তিন বাহিনীর প্রধানগণ উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৬ সালের ৩০শে নভেম্বর জেনারেল জিয়া প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন। পরের বছর ২১শে এপ্রিল বিচারপতি সায়েম স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন এবং জিয়া সে পদে নিজেকে অধিষ্ঠিত করেন। শুরু হলো জেনারেল জিয়ার শাসনামল।
ক্ষমতায় আরোহণের পর জেনারেল জিয়া নিজ অবস্থান সুসংহত করার লক্ষ্যে যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, তা নিম্নরূপ-
প্রথমত, জিয়ার ক্ষমতার প্রতি জাসদ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে এর গোপন সংগঠন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার তরফ থেকে বড় ধরনের হুমকি দেখা দেয়। ৭ই নভেম্বরের সিপাহি অভ্যুত্থানের সহযোগী এই শক্তি জিয়াকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে চিহ্নিত করে। তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে সেনা অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টা চালায়। কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দেওয়াসহ জিয়া এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। জিয়ার শাসনামলে বিভিন্ন সময় কমপক্ষে ২০ বার কথিত সামরিক অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সেনাবাহিনীর বহুসংখ্যক জওয়ানকে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়।
দ্বিতীয়ত, ৭ই নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর জেনারেল জিয়ার হাতে কার্যত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ন্যস্ত থাকলেও তখনই তিনি রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদে নিজেকে আসীন করেন নি। বিচারপতি সায়েমকে সামনে রেখে তিনি পর্যায়ক্রমে অগ্রসর হওয়ার নীতি গ্রহণ করেন।
তৃতীয়ত, শুরু থেকেই তিনি সামরিক-বেসামরিক আমলাদের মধ্যে সুসম্পর্ক এবং এদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় মনোযোগ দেন।
চতুর্থত, খন্দকার মোশতাক ও পরে বিচারপতি সায়েমের ঘোষণা অনুযায়ী ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও নিজ অবস্থান সুসংহত করতে তিনি আরও সময় নেন।
পঞ্চমত, সামরিক বাহিনীর মধ্যে নিজ অবস্থান সুদৃঢ় ও সমর্থন বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনি সামরিক খাতে বাজেট ব্যয় বৃদ্ধি, নতুন সেনা ডিভিশন গঠন, গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। পুলিশের সংখ্যাবৃদ্ধি এবং বিশেষ পুলিশ ফোর্স গঠন করা হয়।
ষষ্ঠত, জিয়া নিজ অবস্থান পাকাপোক্ত করতে এবং তাঁর শাসনের একটি রাজনৈতিক ভিত গড়ে তোলার লক্ষ্যে একপর্যায়ে অর্থ, বিত্ত ও ক্ষমতার প্রলোভন দেখিয়ে বিদ্যমান রাজনৈতিক দল ভেঙে এর নেতা-কর্মীদের নিজের পক্ষে টানতে উদ্যোগী হন।
সপ্তমত, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তিনি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে প্রাথমিক বৈরীভাব কাটিয়ে ওঠে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়ন, চীন ও পশ্চিমের দেশসমূহের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি এবং মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে উদ্যোগী হন।
খ. বেসামরিকীকরণ প্রক্রিয়া
জেনারেল জিয়া তাঁর শাসনকে বেসামরিকীকরণের লক্ষ্যে যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, তা নিম্নরূপ—
১. রাজনৈতিক দল বিধি (পিপিআর) : ১৯৭৬ সালের ২৮শে জুলাই সরকার রাজনৈতিক দল বিধি বা পিপিআরের ঘোষণা দেয়। এই নতুন বিধি অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোকে সরকারের কাছ থেকে বৈধতার সনদ লাভ করতে হয়। এভাবে অনুমোদনপ্রাপ্ত ২১টি দলকে প্রথমে ঘরোয়া রাজনীতি’ (Indoor Politics) করার অনুমতি দেওয়া হয়। ১৯৭৮ সালের ১লা মে থেকে রাজনৈতিক দল বিধি তুলে দেওয়া হয়।
২. গণভোট অনুষ্ঠান : ১৯৭৭ সালের ৩০শে মে দেশব্যাপী এক গণভোটের আয়োজন করা হয় । এতে কোনো প্রার্থী ছিল না। জিয়ার ওপর আস্থা আছে, কি নাই, সে বিষয়ে ভোটারদের কাছে জানতে চাওয়া হয়। ভোটে শতকরা ৯৮.৮৮ ভাগ হ্যাঁ-সূচক ফলাফল দেখানো হয়।
৩. ১৯-দফা কর্মসূচি : ১৯৭৭ সালের গণভোটের এক মাস পূর্বে জিয়া তাঁর আর্থসামাজিক উন্নয়নের ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। একে ‘উৎপাদনের রাজনীতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি এই কর্মসূচি নিয়ে ৪ সপ্তাহব্যাপী দেশজুড়ে এক গণসংযোগে বের হন এবং ৭০টি জনসভায় ভাষণ দেন।
৪. স্থানীয় সংস্থার নির্বাচন : ১৯৭৭ সালের জানুয়ারি মাসে গ্রামপর্যায়ে ৪ হাজার ৩৫২টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর আগস্ট মাসে দেশের ৭৮টি পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

৫. রাষ্ট্রপতি নির্বাচন : ১৯৭৮ সালের ৩রা জুন দেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর পূর্বে জিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তার জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এর সঙ্গে আওয়ামী লীগবিরোধী আরও ৫টি দল (ন্যাপ-ভাসানী, মুসলিম লীগ, ইউপিপি, লেবার পার্টি ও তফসিলি ফেডারেশন) মিলিত হয়ে ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’ নামে একটি নির্বাচনী জোট গঠন করে। জিয়া ছিলেন এ জোটের প্রার্থী। অপর দিকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে অপর ৫টি দলের (জাতীয় জনতা পার্টি, ন্যাপ-মোজাফফর, সিপিবি, গণ-আজাদী লীগ ও পিপলস লীগ) সমন্বয়ে ‘গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট’ গঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এম এ জি ওসমানী ছিলেন এ জোটের প্রার্থী। নির্বাচনে আরও কয়েকজন প্রার্থী থাকলেও এটি জিয়া ও ওসমানীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পর্যবসিত হয়। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছিল ওসমানীর প্রধান নির্বাচনী ইস্যু। নির্বাচনে জিয়া শতকরা ৭৬.৬৩ ভাগ এবং ওসমানী ২১.৭ ভাগ ভোট পান। জিয়ার সহজ বিজয় হয়। সামরিক শাসনাধীনে অনুষ্ঠিত এসব নির্বাচনে প্রধানত সরকারি নীলনকশার বাস্তবায়ন ঘটে।
৬. বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন : ১৯৭৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টভুক্ত দলগুলোকে একীভূত করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করা হয়। পূর্বে প্রতিষ্ঠিত জাগদল বিলুপ্ত হয়ে যায়। জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
৭. জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ১৯৭৯ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ছোট-বড় ৩১টি দল অংশগ্রহণ করে। ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৭টি আসন ও শতকরা ৪৪ ভাগ ভোট পেয়ে বিএনপি বিজয়ী হয়। আওয়ামী লীগ ৩৯টি আসন ও ২৫ ভাগ ভোট লাভ করে এবং সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। নির্বাচনের ফলাফলকে ভোটারদের ইচ্ছার প্রতিফলন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কেননা, সামরিক শাসনকে বৈধতাদানের প্রয়োজন থেকে ফলাফল এভাবে সাজানো ছিল তখনকার রীতি । যাহোক, ২রা এপ্রিল নবনির্বাচিত সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। ৬ই এপ্রিল থেকে সামরিক শাসন প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে জিয়ার বেসামরিকীকরণ প্রক্রিয়া পূর্ণতা পায়।
গ. সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী
জিয়ার শাসনামলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী । ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদে তা গৃহীত ও পাস হয়। এ দ্বারা ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৬ই এপ্রিল পর্যন্ত সকল সামরিক আইন বিধি, আদেশ, ঘোষণা, অধ্যাদেশ বা অন্যান্য আইন ও আদেশকে সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়া হয়। পঞ্চম সংশোধনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এ দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়। ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ স্থলে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’, সমাজতন্ত্রের নতুন ব্যাখ্যায়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচার, জাতীয়তাবাদ বলতে ‘বাঙালির’ পরিবর্তে ‘বাংলাদেশী’ (অর্থাৎ ধর্মীয় উপাদান সংযুক্ত জাতীয়তাবাদের ধারণা) ইত্যাদি প্রতিস্থাপিত ও সংযোজিত হয়। ইসলামি সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করার নীতিও সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়। উল্লেখ্য যে, ১৯৭৭ সালের ২২শে এপ্রিল রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল জিয়া রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে উল্লেখিত পরিবর্তন এনে এক সংশোধনী আদেশ জারি করেন।
১৯৮১ সালের ৩০শে মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে এক সেনাবিদ্রোহে নির্মমভাবে নিহত হন। এর সঙ্গে তাঁর সাড়ে পাঁচ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।





