ইরান ঘিরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একপক্ষীয় হুমকি এখন পাল্টা জবাব পেতে শুরু করেছে। তেহরান অনেকটা গত বছরের জুনে বাস্তবায়ন করা কৌশল অবলম্বন করতে যাচ্ছে বলে আভাস মিলছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র হামলা করলে জবাব হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হানার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।
গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও এমন পদক্ষেপ নিয়েছিল ইরান। তখন তেল আবিবের সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্র বি-২ বোমারু বিমান দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা করে। পাল্টা আক্রমণ হিসেবে তেহরান ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে কাতারের দোহায় যুক্তরাষ্ট্রের আল উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে।
উদেইদ হলো মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিমানঘাঁটি। অবস্থানকারী সৈন্যের সংখ্যা অন্তত ১০ হাজার। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বুধবার ইরান সতর্কবার্তা দেওয়ার পরপরই ঘাঁটি থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সরে যেতে বলা হয়েছে। গতকাল বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় এই বিশ্লেষণ যখন লেখা হচ্ছিল, তখন বিশেষ পরিস্থিতিতে তেহরান-ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর জানায় আলজাজিরা। ইরানের সামরিক কর্মকর্তারাও ঘোষণা দেন, তারা সম্ভাব্য মার্কিন হামলা মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র আসলে কোন পদ্ধতি অবলম্বন করে ইরানে হামলা চালাবে– গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত সেটির স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে লিখেছেন, ‘লড়াই চালিয়ে যাও, সহায়তা যাচ্ছে।’ বিবিসি বলছে, এই বার্তার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিষয়টি স্পষ্ট হলেও ‘সহায়তা’ বলতে ট্রাম্প কোন পদক্ষেপকে বুঝিয়েছেন, তা অস্পষ্ট থেকে গেছে। এর আগে পেন্টাগনের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সিবিএস নিউজ জানিয়েছিল, সম্ভাব্য পদক্ষেপের মধ্যে আছে– সাইবার কিংবা মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী অভিযান। এসব বিকল্পের লক্ষ্য থাকবে ইরানের শাসন কাঠামো বিঘ্নিত ও শাসকদের বিভ্রান্ত করা।
ইরানের বয়ান শক্ত হবে
ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিভাগের সম্মাননীয় গবেষণা ফেলো বামো নুরি বলছেন, সম্ভাব্য পদক্ষেপের চূড়ান্ত ধাপটি হতে পারে সামরিক হামলা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেটি করলে উল্টো ফল হওয়ার ঝুঁকিই বেশি।
গবেষণা ও বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধের প্ল্যাটফর্ম দ্য কনভারসেশনে নুরি লিখেছেন, যে কোনো মার্কিন হামলা ইরানের কর্তৃপক্ষকে একটি শক্তিশালী বয়ান তৈরির সুযোগ দেবে। তারা হামলা মোকাবিলাকে জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে গণ্য করতে শুরু করবে। ইরানি অভিজাতদের কথাবার্তায় এরই মধ্যে সেটির স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ সম্প্রতি বলেছেন, ইরানের ওপর কোনো হামলা হলে ইসরায়েল এবং এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক ঘাঁটি ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হয়ে যাবে। এর পরই রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে তেহরান ও অন্যান্য শহরে বিপুল সংখ্যক সরকারপন্থির সমাবেশ দেখানো হয়। যেখানে ‘আমেরিকা ও ইসরায়েলের মৃত্যু হোক’ স্লোগান দেন অংশগ্রহণকারীরা।
বামো নুরির মতে, চলমান বিক্ষোভে অনেক মানুষ সহিংসতার শিকার হয়েছেন। মানুষ একটি অবস্থার পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থেকে আন্দোলন করছেন। এমন বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে ইরানের কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ আন্দোলনকে বিদেশি মদদপুষ্ট ও জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি বলার আরও সুযোগ পাবে। তারা দমনপীড়ন নিয়েও যুক্তি দেখাতে পারবে।
অপমানের স্মৃতি
গত বছরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র যখন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে নিয়ে একের পর এক হুমকি দিচ্ছিল, তখন একটি পূর্বাভাস লিখেছিলেন ব্রেট এইচ ম্যাকগর্ক। তিনি মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক। জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কাজ করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা, ডোনাল্ড ট্রাম্প (২০১৭-২১) ও জো বাইডেনের অধীনে।
ম্যাকগর্ক লিখেছিলেন, ‘২০২৬ সালে মাদুরো যদি কোনোভাবে ক্ষমতায় টিকে যান, তা হবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাবমূর্তিতে সবচেয়ে বড় আঘাত। আর ক্ষমতা হারালে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রভাব নিয়ে খুব কম মানুষই সন্দেহ প্রকাশের সুযোগ পাবে।’ চলতি মাসের শুরুতে দ্বিতীয়টাই হয়েছে। মাদুরোকে তুলে নিয়ে গিয়ে নিজের হুমকি বাস্তবায়ন করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে তাঁর হিসাবনিকাশে কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলছে ৪৬ বছর আগের এক ‘অপমানের’ স্মৃতি।
১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে একটি বিপ্লবী শক্তি ইরানের শাহ রাজবংশকে ক্ষমতাচ্যুত করে। শাহদের আমলে ইরান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি মিত্র রাষ্ট্র। আর শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি ছিলেন আমেরিকান ব্যাংক, তেল কোম্পানি, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ও অস্ত্র সরবরাহকারীদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কিন্তু ইসলামী বিপ্লবের পর পরিস্থিতি রাতারাতি বদলে যায়। নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে তখন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ডলারের মূল্য কমে যায়, আর পেট্রোলের দাম ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে। এর ‘বলির পাঁঠা’ হন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার।
মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের ওয়েবসাইটে থাকা ঐতিহাসিক নথি ও বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, একই বছরের (১৯৭৯) নভেম্বরের শুরুতে ইরানের বেশ কয়েকজন কলেজ শিক্ষার্থী তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করে অর্ধশতাধিক আমেরিকানকে জিম্মি করে। তাদের উদ্ধারে অভিযান চালানোর অনুমতি দেন প্রেসিডেন্ট কার্টার। ১৯৮০ সালে চালানো অভিযানটি তেহরানের অদূরে একটি মরুভূমিতে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। মরুভূমিতে হেলিকপ্টার ও ইসি-১৩০ পরিবহন বিমান আছড়ে পড়ে। এতে আট সেনা নিহত হন। পরে ইরানের কর্তৃপক্ষ তেহরানে বন্দি কয়েকজনের মুখোশ পরা ভিডিও ছড়িয়ে দেয়, যা মার্কিন প্রশাসনকে অপমানজনক পরিস্থিতিতে ফেলে। ওই ব্যর্থ অভিযান জিমি কার্টারের নির্বাচনী প্রচারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। ফলাফল, পরের নির্বাচনে তিনি হেরে যান।
সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওই ব্যর্থ অভিযানের স্মৃতিচারণ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বলেছেন, ‘ওই ঘটনার মতো ভেনেজুয়েলার অভিযানও যদি ব্যর্থ হতো, তাহলে আমার প্রেসিডেন্সিই ধ্বংস হয়ে যেত।’ ট্রাম্পের এমন স্বীকারোক্তি বোঝায়, তিনি ইরানে হামলার আগেও সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে ভাবছেন।
গত বছরের জুনে ইরান মার্কিন হামলার জবাব দেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে। এবারও সম্ভাব্য হামলার আগে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ বলেছেন, কেউ হামলা করলে তাদের জন্য অনেক চমক অপেক্ষা করছে। প্রেস টিভিতে প্রচারিত উদ্ধৃতি অনুযায়ী, এক নিরাপত্তা বৈঠকে নাসিরজাদেহ বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে শেষ রক্তবিন্দু ও পূর্ণ শক্তি দিয়ে দেশ রক্ষা করা হবে। হামলায় যেসব দেশ সহায়তা দেবে, তারাও বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।’
বাস্তবেই যদি তেহরান উপযুক্ত জবাব দিতে পারে, তাহলে ট্রাম্প যেমন তাঁর ভাবমূর্তি হারাবেন, তেমনি তাঁর প্রশাসনের ইতিহাসেও হয়তো একটি ব্যর্থতার গ্লানি যুক্ত হবে।
ট্রাম্প কেন মরিয়া
প্রশ্ন থেকে যায়, সম্ভাব্য বিপদ সত্ত্বেও ট্রাম্প অভিযানের হুমকি দিচ্ছেন কেন? সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সিনিয়র ফেলো উইল টডম্যানের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট সম্ভবত ইরানের শাসন ব্যবস্থার আচরণকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। পুরো শাসন পরিবর্তন নয়।
বিবিসিকে টডম্যান বলেছেন, ‘একটি সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে পারমাণবিক আলোচনায় আরও ছাড় পাওয়ার চেষ্টা।’ অন্যদিকে নিউইয়র্ক পোস্টকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক উপসহকারী জন উলিয়ট বলেছেন, পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর পাশাপাশি ইরানের তেল অবকাঠামো ও ট্যাঙ্কারগুলোও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে গিয়ে ভেনেজুয়েলার তেলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছেন ট্রাম্প। তেলসমৃদ্ধ ইরানের ক্ষেত্রে কী হয়, সেটা এখন দেখার বিষয়। তবে এরই মধ্যে আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের সভাপতি মাইক সমার্স বলেছেন, ইরানের শাসকের পতন হলে মার্কিন তেল উৎপাদকরা সেখানে ‘স্থিতিশীলতার শক্তি’ হিসেবে কাজ করতে প্রস্তুত।
ইরানের আগের শাসকের (শাহ রাজবংশ) পতনের পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সময় তেলের দাম বেড়ে গিয়ে ডলার দুর্বল হয়েছিল। তবে এবার যেহেতু ট্রাম্প আগেই ভেনেজুয়েলার তেলের ‘দখল’ নিয়েছেন, ইরানের শাসককে হটাতে পারলে তেলের বাজারে আরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। সম্প্রতি দুর্বল হওয়া ডলারও (পেট্রোডলার) তাতে চাঙ্গা হতে পারে।





