এমপিওভুক্তির জন্য ১৭১৯ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত!

0
25

অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষলগ্নে এসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করাকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন তোড়জোড় শুরু হয়েছে। কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বা স্বচ্ছতা ছাড়াই মাত্র আট কার্যদিবসে ১৭১৯টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্তির তালিকায় চূড়ান্ত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তড়িঘড়ি করে চূড়ান্ত করা এই তালিকার বিপরীতে বার্ষিক ৬৭০ কোটি ১৩ লাখ টাকার অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়ে ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, এমপিওভুক্তির এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে শিক্ষকপ্রতি ১০ লাখ এবং প্রতিষ্ঠানভেদে ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১৪ জানুয়ারি থেকে ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত অনলাইনে ৩৬১৫টি আবেদন জমা পড়ে। ২৬ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে মাত্র আট কর্মদিবসে এসব আবেদনের তথ্য-উপাত্ত যাচাই শেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমপিও কমিটি। প্রতিদিন গড়ে ৪৫২টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য যাচাই করাকে ‘অসম্ভব’ ও ‘নজিরবিহীন’ বলছেন খোদ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কর্মকর্তারা।

অভিযোগ রয়েছে, আগে থেকেই সমঝোতা হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে তালিকায় স্থান দিতেই এই দ্রুতগতি অনুসরণ করা হয়েছে। এমনকি কাম্য শিক্ষার্থী নেই বা নিয়মিত পাঠদান হয় না— এমন অনেক অযোগ্য প্রতিষ্ঠানও বিপুল অর্থের বিনিময়ে তালিকায় ঢুকে পড়েছে বলে জানা গেছে।

এই ১৭১৯টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হলে সরকারের বার্ষিক খরচ বাড়বে প্রায় ৬৭০ কোটি ১৩ লাখ টাকা। ইতোমধ্যে অর্থ বরাদ্দের জন্য অর্থ বিভাগে চিঠি পাঠিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তালিকার সংক্ষিপ্তসারে দেখা যায়— নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ৮৫৯টি আবেদনের মধ্যে ৪৭১টি যোগ্য হয়েছে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ১১৭০টির মধ্যে ৬২৩টি, উচ্চ মাধ্যমিক কলেজের ৩৫১টির মধ্যে ১৪৫টি, স্নাতক (সম্মান) ৪১৪টির মধ্যে ২৩২টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। একইসঙ্গে স্নাতকোত্তর ও ডিগ্রিপর্যায়ের আরও ১১৩টি প্রতিষ্ঠান তালিকায় রয়েছে।

এদিকে, শিক্ষা প্রশাসনের এই অস্বাভাবিক তৎপরতাকে কেন্দ্র করে দুর্নীতির ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মাউশির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই এমপিওভুক্তির আড়ালে কয়েকশ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। প্রতিষ্ঠানভেদে ২০ থেকে ৪০ লাখ এবং অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকপ্রতি ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যে প্রতিষ্ঠানে জনবল বেশি, সেখানে লেনদেনের পরিমাণ অর্ধকোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

সূত্রমতে, আগে থেকেই সমঝোতা হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে তালিকায় স্থান দিতেই এমন তড়িঘড়ি করা হয়েছে। ফলে অনেক অযোগ্য, পাঠদানহীন ও শিক্ষার্থীহীন প্রতিষ্ঠানও যাচাই-বাছাইয়ের বৈতরণী অনায়াসেই পার হয়ে গেছে।

নতুন এই এমপিওভুক্তির ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বিশাল আর্থিক বোঝা চেপে বসবে। ১৭১৯টি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা মেটাতে বছরে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে ৬৭০ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে শুধু চলতি অর্থবছরের শেষ তিন মাসের জন্যই প্রয়োজন হবে ১৬৭ কোটি টাকা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সর্বশেষ নীতিমালা অনুযায়ী, একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় এমপিওভুক্ত করতে বছরে প্রায় ৩৯ লাখ এবং একটি কলেজের জন্য প্রায় ৮৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়। পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ না থাকা সত্ত্বেও বিদায়লগ্নে এমন ব্যয়বহুল সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ ও প্রশাসনিক শিষ্টাচারবহির্ভূত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রশাসনের দায়িত্বশীলপর্যায়ে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চললেও প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলছেন না।

অভিযোগ উঠেছে, এই ঘুষবাণিজ্যের ভাগবাটোয়ারা মাঠপর্যায়ের আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে শুরু করে সচিবালয় পর্যন্ত বিস্তৃত। এমন তুঘলকি সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতে তালিকা অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে স্বাক্ষরকারী উপসচিব সাইয়েদ এ জেড মোরশেদ আলীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি।

এছাড়া শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব রেহেনা পারভীনের মন্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তারা সাড়া দেননি। উপদেষ্টার ব্যক্তিগত কর্মকর্তার হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর মেলেনি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here