সব স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট বন্ধের নির্দেশ

0
14

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা বলয় শক্তিশালী করার পাশাপাশি, সব সীমান্তের ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। ভোট ঘিরে দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় সব স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি যাতে দেশের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে এবং দেশত্যাগে যাদের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে— এমন কেউ কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ কেউ যাতে নির্বাচনকালীন সময়ে দেশত্যাগ করতে না পারে, সে বিষয়ে নজরদারির অংশ হিসেবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া নির্বাচন ও গণভোট নির্বিঘ্ন করতে নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ হিসেবেও এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ঊর্ধ্বতন একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

এদিকে, ভোটের আগে সরকারের এমন সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা। তারা বলছেন, এ ধরনের সময়ে সীমান্ত উন্মুক্ত রাখলে দুর্বৃত্তরা দেশে ঢুকতে বা বের হতে পারে। সীমান্ত বন্ধ করলে সেই ঝুঁকি ৮০ শতাংশ কমে যায়। ফলে সীমান্ত বন্ধ করে নির্বাচন কার্যক্রম পরিচালনা করা সরকারের উচ্চ বুদ্ধিমত্তা হিসেবেই প্রশংসার দাবি রাখে।

জানা গেছে, সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দেশের সব স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠক অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের দিন ভোর ৬টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি ভোর ৬টা পর্যন্ত দেশের সব স্থলবন্দরের বহির্গমন কার্যক্রম বন্ধ রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ করতে এবং সব ধরনের নাশকতা এড়াতে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি)-এর অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক, নৌপরিবহন সচিব, পররাষ্ট্র সচিব, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন সামনে রেখে সীমান্ত ব্যবহার করে অস্ত্র বা বিস্ফোরক প্রবাহের ঝুঁকি রয়েছে। দেশের ভেতরে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা ঠেকাতে সীমান্তে ‘জিরো মুভমেন্ট’ নীতি কার্যকর করা হচ্ছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা নির্বাচনের আগে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারে। ভোটের ঠিক আগে স্থলবন্দর বন্ধ থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি সহজ হয় এবং দেশের বাইরে পলায়ন বন্ধ করা সহজ হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে সীমান্ত এলাকায় ভোটের সময় বহিরাগতদের প্রবেশ বা বিভিন্ন গুজব ছড়িয়ে উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা দেখা গেছে। স্থলবন্দর বন্ধ থাকলে এসব প্রবেশ ও উত্তেজনা ছড়ানোর ঝুঁকি কার্যত শূন্য হয়ে যায়।

সাধারণত নির্বাচনী নিরাপত্তা পরিবেশে পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনী কিংবা আনসার— সবার দায়িত্ব বেড়ে যায়। এ সময় স্থলবন্দরে নিয়মিত ইমিগ্রেশন পরিচালনা করলে জনবল বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে দেশের সব বাহিনী এখন একসঙ্গে এক লক্ষ্য— নির্বাচনের নিরাপত্তা— থাকায় এই মুহূর্তে সীমান্তে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে নির্বাচনকালীন দেশের সব স্থলবন্দরে ইমিগ্রেশন কার্যক্রম বন্ধের এ সিদ্ধান্ত যুক্তিযুক্ত বলে মনে করছেন তারা।

এদিকে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মিয়ানমারে আরাকান আর্মি–সেনাবাহিনীর সংঘাতে সীমান্তে উত্তেজনা চলমান। এতে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ও অস্ত্র পাচারের আশঙ্কাও বেড়েছে। ভোটের আগে এই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি মনে করছে সরকার। নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ মনে করেন, মিয়ানমার সীমান্তে পরিস্থিতি খুবই নাজুক। নির্বাচনের সময় জটিলতা বাড়তে পারে। সীমান্ত বন্ধ রাখা ছাড়া বিকল্প নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সীমান্ত নিরাপত্তা হলো রাষ্ট্রের প্রথম প্রতিরক্ষা রেখা। নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে দেশের ভেতরে কিংবা বাইরে যেকোনো ধরনের নাশকতা, অন্তর্ঘাত বা বিদেশি প্রভাব ঠেকাতে সরকার সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে আছে। বিশেষত, নির্বাচনী সময়কে ঘিরে গত কয়েক সপ্তাহে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা যে ঝুঁকির প্রতিবেদন দিয়েছে, তা অত্যন্ত স্পষ্ট— সীমান্ত উন্মুক্ত থাকলে অস্থিতিশীলতা ছড়ানোর চেষ্টা করতে পারে একাধিক গোষ্ঠী। তাই আমরা সীমান্তে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছি।

তিনি বলেন, এমন সময়ে সীমান্ত দিয়ে একটি অস্ত্র, একটি বিস্ফোরক বা একটি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি ঢুকে পুরো নির্বাচন-ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করতে পারে। শুধু প্রবেশই নয়— দেশের ভেতরের অস্থিতিশীলতার জন্য দায়ী বা রাজনৈতিক সহিংসতার সঙ্গে জড়িত অনেকে হঠাৎ দেশত্যাগের চেষ্টা করতে পারে। আমরা চাই না নির্বাচনকালীন সময়ে কেউ আইন এড়িয়ে পালিয়ে যাক কিংবা বাইরে গিয়ে পরিস্থিতি উসকে দিক।

জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ বলেন, নির্বাচনকালীন সময়ে দেশের সীমান্ত উন্মুক্ত রাখা হলো সবচেয়ে বড় নিঢাকা পোস্টকেপত্তা ঝুঁকি। আন্তর্জাতিক সীমানা অনেক সময় সন্ত্রাসী বা অন্তর্ঘাতকারী গোষ্ঠীর জন্য ‘সফট এন্ট্রি পয়েন্ট’ হিসেবে কাজ করে। নির্বাচন ঘিরে দেশে অস্ত্র বা বিস্ফোরক ঢোকার চেষ্টা বা বিদেশি প্ররোচনায় পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার উদ্যোগ— এসব কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। সীমান্ত বন্ধ রাখা বাস্তবসম্মত, সাহসী এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার উচ্চমানের সিদ্ধান্ত।

‘এদিকে মিয়ানমার সীমান্তে যেভাবে সংঘাত বাড়ছে, সেখানে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ, অস্ত্র পাচার কিংবা সীমান্তের ওপার থেকে অপপ্রচার চালানোর সম্ভাবনাও সরকারের মাথায় রাখতে হবে’, বলেন তিনি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নির্বাচনের আগে অপরাধচক্রগুলো সাধারণত দুটি কাজ করে— দেশে ঢুকে নাশকতা করা অথবা দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া। শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকারীর দেশত্যাগ নিয়ে ধোঁয়াশা তারই এক ভালো উদাহরণ। ফলে উভয় ক্ষেত্রেই স্থলবন্দর অপরাধীদের জন্য সবচেয়ে দ্রুত ও ঝুঁকিমুক্ত পথ। ফলে সরকার যেভাবে সব স্থলবন্দর বন্ধ করে দিয়েছে, তাতে হঠাৎ দেশত্যাগ বা অপরাধী চক্রের ‘সহজ রুট’ বন্ধ হয়েছে। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রমও অনেকাংশে সহজ হয়েছে।

এ বিষয়ে প্রশাসনিক আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান বলেন, রাষ্ট্র যখন নির্বাচন বা গণভোটের মতো সংবেদনশীল আয়োজন করে, তখন সরকার জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের মতো বিশেষ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এটি সম্পূর্ণ আইনসম্মত এবং যৌক্তিক।

তিনি আরও বলেন, এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে— নির্বাচনের সময় কোনো বিদেশি প্রভাব, সাইবার বা শারীরিক অন্তর্ঘাত বা সন্দেহভাজন ব্যক্তির গতিবিধিকে তারা কোনোভাবেই অবহেলা করছে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here