নির্বাচনের পর বাংলাদেশে বাড়বে চীনের প্রভাব

0
3

গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা সাবেক স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন হয়। এরপর বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বাড়ে। বার্তাসংস্থা রয়টার্স মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ঢাকায় বেইজিংয়ের প্রভাব আরও বাড়তে পারে। যদিও রাজনীতিবিদ এবং বিশ্লেষকরা বলছেন ভারতের মতো এত বড় প্রতিবেশীকে ‘সাইড’ করে দেওয়া সহজ হবে না।

রয়টার্স বলেছে, এবারের নির্বাচনের দুই বড় দল বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের তুলনায় ভারতের ঠান্ডা সম্পর্ক ছিল। হাসিনা ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত টানা ১৫ বছর বাধাহীনভাবে বাংলাদেশকে শাসন করেছেন। কিন্তু তার আওয়ামী লীগ এখন নিষিদ্ধ এবং হাসিনা ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন।

এরমধ্যে চীন বাংলাদেশে তার বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বাড়িয়েছে। এছাড়া সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে। যেটি অনুযায়ী ভারত সীমান্তের কাছে বাংলাদেশ একটি ড্রোন উৎপাদনের ফ্যাক্টরি করবে।

চীনা রাষ্ট্রদূত ওয়াইও ওয়েনকে প্রায় সময়ই বাংলাদেশি রাজনীতিবিদ, কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন। দেশটির দূতাবাসের ফেসবুক পোস্ট অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির রয়টার্সকে বলেছেন, “বাংলাদেশের মানুষ ভারতকে হাসিনার অপরাধের সহযোগী হিসেবে দেখেন। সাধারণ মানুষ এমন কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে দেবেন না যে দেশ সন্ত্রাসবাদকে লালন করে এবং আমাদের দেশকে অস্থিতিশীল করতে দেয়।”

গত সপ্তাহে তারেক রহমানও রয়টার্সকে বলেছিলেন, “আমরা সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার চেষ্টা করব। কিন্তু অবশ্যই, সেটি হবে আমাদের দেশের স্বার্থ ও মানুষকে রক্ষা করে।”

রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক সম্প্রতি (আরও) খারাপ হয়েছে। বিশেষ করে ক্রিকেটের দিক দিয়ে। তারা বলেছে, হিন্দুত্ববাদীদের কারণে আইপিএল থেকে বোলার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ায় এমন পরিস্থতির সৃষ্টি হয়েছে।

এর জবাবে বাংলাদেশ আইপিএলের সম্প্রচার নিষিদ্ধ করেছে। ভারতে খেলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে শ্রীলঙ্কায় খেলতে চেয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে টি-২০ বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া উভয় দেশ একে-অপরের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আর শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ ও ভারতর কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রকাশ্যে বৈঠক বিরল বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যদিও ডিসেম্বরের শেষ দিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর শোক জানাতে বাংলাদেশে এসেছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।

এছাড়া জুলাই অভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০ বিক্ষোভকারীকে হত্যার দায়ে মৃত্যদণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে একাধিকবার চেষ্টা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু ভারত তাকে ফেরত দেয়নি।

ভারতীয় কর্মকর্তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছেন যেহেতু আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায় নেই। তাই বাংলাদেশে সামনে যেই সরকার গঠন করুক তাদের সঙ্গেই অবশ্যই সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেনি।

চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক মিত্র
চীন এক দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক মিত্র। দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ১৮ বিলিয়ন ডলার। যারমধ্যে ৯৫ শতাংশই চীন থেকে বাংলাদেশের পণ্য আমদানি।

এছাড়া হাসিনার পতনের পর চীনা কোম্পানিগুলো কয়েকশ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছে। হাসিনার সময় আদানির মতো ভারতীয় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছিল। কিন্তু তার পতনের পর আর কোনো বিনিয়োগ করেনি ভারতীয় কোম্পানিগুলো।

পর্যবেক্ষক সংস্থা নিউ দিল্লি থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ইকোনোমিক প্রোগ্রেসের সিনিয়র ফেলো কনস্টানটিনো জাভিয়ার বলেছেন, “চীন অবিচলিতভাবে বাংলাদেশে প্রকাশ্যে ও পর্দার আড়ালে প্রভাব বৃদ্ধি করছে। বাংলাদেশ-ভারত খারাপ সম্পর্ক থেকে তারা লাভবান হচ্ছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধ ও অবাণিজ্যসুলভ আচরণের বিষয়টিও কাজে লাগাচ্ছে তারা। তারা নিজেদের বিশ্বাসী বাণিজ্যিক মিত্র হিসেবে উপস্থাপন করছে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীন যেহেতু সহজ বাণিজ্যের সুযোগ দেয় তাই বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করবে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের থমাস কিন বলেছেন, “যদি ঢাকা ও দিল্লি সম্পর্ক আগের জায়গায় আনতে না পারে। বাংলাদেশের পরবর্তী সরকার চীনের দিকে আরও ঝুঁকবে।”

বিশেষজ্ঞরা অবশ্য সঙ্গে এও বলছেন চীনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক মানে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন নয়।

সূত্র: রয়টার্স।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here