দুই লাখ সদস্যকে নিয়ে চলছে পুলিশের পোশাক-জরিপ

0
13

পুলিশের পোশাক নির্ধারণে বাহিনীটির অভ্যন্তরে চলছে জরিপ কার্যক্রম। পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন পদমর্যাদার দুই লাখের বেশি সদস্য পোশাকের ব্যাপারে নিজেদের মতামত দিচ্ছেন। গত শনিবার পুলিশ সদরদপ্তর থেকে ৬৪ জেলার এসপি ও ইউনিটপ্রধানের কাছে এ বিষয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আজ সোমবার বিকেলের মধ্যে এ মতামত পুলিশ সদরদপ্তরকে জানাতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

জরিপে তিনটি বিষয় জানতে চাওয়া হয়েছে। আগের পোশাকের পক্ষে কত শতাংশ, বর্তমান পোশাকের পক্ষে কত শতাংশ, কত শতাংশ নতুন পোশাক চায়।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পুলিশের পোশাক বদলের দাবি জোরালো হয়। অন্তর্বর্তী সরকার তিন মাস আগে পোশাক পরিবর্তন করেছে। নতুন পোশাক নিয়ে এরই মধ্যে নিজেদের অস্বস্তির কথা তুলে ধরে বিবৃতি দিয়েছে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। তারা বলছে, মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করে পোশাক বদল করা হয়েছিল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, পোশাকের ব্যাপারে সব পর্যায়ের পুলিশ সদস্যের মতামতের ফল বের করতে চান নীতিনির্ধারকরা। অধিকাংশ সদস্য যেটির পক্ষে সায় দেবেন, সেটি বাস্তবায়ন করা হবে।

জরিপে কী ধরনের মতামত উঠে আসছে, তা জানতে তিন জেলার এসপি ও একটি মহানগরের ডিসির সঙ্গে কথা বলেছে প্রতিবেদক। চট্টগ্রাম রেঞ্জের একটি জেলার এসপি বলেন, জেলায় দুই হাজার ৩১০ পুলিশ সদস্য কর্মরত। তাদের সবার মতামত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুই হাজার ৩০৯ জন আগের পোশাকে ফেরত যাওয়ার পক্ষে। একজন বর্তমান পোশাকের পক্ষে মত দেন। আবার নতুন করে পোশাক বদল করার পক্ষে একজনও নেই।

উত্তরাঞ্চলের একটি মহানগরের পুলিশের ডিসি সমকালকে বলেন, আমার ইউনিটের সদস্যদের বলেছি, পোশাকের ব্যাপারে তাদের মতামত জানাতে। একটি কাগজে তিনটি প্রশ্নের মতো দিয়ে কোনটির পক্ষে তারা রয়েছেন ‘টিক’ চিহ্ন দিতে বলেছি। এরই মধ্যে অনেকে জানিয়েছেন। অধিকাংশ সদস্য আগের পোশাকে ফেরত যাওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।

ঢাকা রেঞ্জের একটি জেলার এসপি বলেন, পুলিশ সদরদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী মতামত নিচ্ছি। নির্ধারিত সময়ে এটি পুলিশ সদরদপ্তরে পাঠাব। আগের পোশাকে ফেরতের পক্ষে বেশি মতো পাচ্ছি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশের কাঠামোগত সংস্কারের পাশাপাশি পোশাক পরিবর্তনের দাবি ওঠে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন এই পোশাক অনুমোদন করে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পোশাক পরিবর্তনে পুলিশ কর্মকর্তারা যে মতামত দেন, তা উপেক্ষিত ছিল। তাদের অভিযোগ, লৌহ (আয়রন) রঙের নতুন ইউনিফর্ম অন্য বাহিনীর পোশাকের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। রাতে দায়িত্ব পালনের সময় এটি দৃশ্যমান হয় না। নিরাপত্তাকর্মীদের পোশাকের সঙ্গে পুলিশের এই পোশাক অনেক ক্ষেত্রে মিলে গেছে। দেশের আবহাওয়ার জন্য এটি পুরোপুরি উপযোগী নয়।

বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও কুমিল্লা জেলার এসপি মো. আনিসুজ্জামান  বলেন, বর্তমান পোশাক নিয়ে শুরু থেকে আমাদের অস্বস্তি ছিল। পুলিশ সদস্যদের মতামতকে আমলে নেওয়া হয়নি। অনেকে এই পোশাক পরতে চান না। আগের পোশাকে ফেরত গেলে সরকারের বড় আর্থিক ক্ষতি হবে না। কারণ নির্দিষ্ট সময় পরপর নতুন পোশাক দেওয়া হয়। ওই সময় থেকে আগের পোশাকে ফেরত যেতে পারি। আবার অনেকে এখনও নতুন পোশাক তৈরি করেননি।

পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনেকটা তড়িঘড়ি করে পুলিশের পোশাক বদল করা হয়। এতে একজন উপদেষ্টা ও পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের তিন কর্মকর্তা মুখ্য ভূমিকা রাখেন। দরপত্র আহ্বানের পর একটি বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান ১৪১ কোটি টাকার কাপড় কেনার কাজটি পায়। ওই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগে মামলা রয়েছে।

পুলিশ সদস্যদের বছরে সরকারিভাবে পাঁচ ‘সেট’ পোশাক দেওয়া হয়। এর আগে ২০০৪ সালে পোশাক বদল করা হয়েছিল।

অন্তর্বর্তী সরকার এসে পুলিশ, র‍্যাব ও অঙ্গীভূত আনসারের পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। গত জানুয়ারিতে এই তিন বাহিনীর জন্য নতুন পোশাক নির্ধারণ করা হয়েছিল। তখন সমালোচনা হলে র‍্যাব ও অঙ্গীভূত আনসারের পোশাক বদল করা হয়নি। গত ১৪ নভেম্বর থেকে দেশের সব মহানগর পুলিশের সদস্যরা নতুন পোশাক পরে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। পর্যায়ক্রমে জেলা পুলিশেও তা কার্যকর করার কথা বলা হয়।

সম্প্রতি পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতিতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশের জন্য যে নতুন পোশাক নির্বাচন করেছে, সেখানে পুলিশ সদস্যদের গায়ের রং, আবহাওয়া এবং সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে।

পুলিশের পোশাকের ঐতিহাসিক পটভূমি তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, ২০০৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি প্রজ্ঞাপন এবং ১০ ফেব্রুয়ারি গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে তৎকালীন সরকার একটি কমিটির দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে পুলিশের আগের পোশাকটি নির্ধারণ করেছিল। সে সময় আবহাওয়া, দিনে ও রাতে দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে দৃশ্যমানতা, পুলিশ সদস্যদের গায়ের রং এবং অন্য বাহিনীর সঙ্গে যেন সাদৃশ্য না থাকে– এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছিল।

বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতিতে জানায়, বাহিনীর বেশির ভাগ সদস্য তড়িঘড়ি করে নেওয়া এ পরিবর্তনের পক্ষে নন। বরং তারা আগের পোশাকটিকে পুলিশের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, শৃঙ্খলা ও পেশাদারত্বের প্রতীক হিসেবে মনে করেন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পোশাক পরিবর্তন ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া, যা বর্তমান অর্থনৈতিক পটভূমিতে দেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন মনে করে, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ নতুন পোশাক তৈরির বদলে বাহিনীর আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বাড়াতে ব্যয় করা বেশি জরুরি। পোশাকের রং বা নকশা নয়, বরং পুলিশ সদস্যদের মানসিকতার পরিবর্তন, মনোবল এবং পেশাদারিত্বের উন্নয়নই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালি পুলিশ সদস্যরা খাকি রঙের পোশাক ব্যবহার করেন। কেউ কেউ সাদা পোশাক পরতেন। ২০০৪ সালে পোশাক পরিবর্তন করে মহানগরগুলোয় হালকা জলপাই রঙের করা হয়। জেলা পুলিশকে দেওয়া হয় গাঢ় নীল রঙের পোশাক। র‍্যাবের কালো ও এপিবিএনের পোশাক তৈরি করা হয় খাকি, বেগুনি আর নীল রঙের মিশ্রণে।

সূত্র: সমকাল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here