সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে টানাপোড়েন

0
3

নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভা আহ্বানের যে সময়সীমা ছিল আজ রোববার তা শেষ হচ্ছে। কিন্তু আজ এই সভা হবে কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে সরকারদলীয় জোট ও বিরোধীদলীয় জোটের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় সংসদের আজকের অধিবেশনে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টিকে সামনে আনতে পারে বিরোধী দল। এতে প্রথম দিনের মতো আজও সংসদে উত্তাপ ছড়াতে পারেন নেতারা।

গতকাল শনিবার বিএনপি বলছে, পরিষদের বিষয়ে সংসদে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হবে। অন্যদিকে সভা আহ্বানে সরকারকে আলটিমেটাম দিয়ে জামায়াতে ইসলামী বলছে, গণভোটের রায় কার্যকর না করলে তারা রাজপথে যেতে বাধ্য হবে। আর এনসিপির দাবি, সভা আহ্বান না করে প্রধানমন্ত্রী গণভোটের গণরায় অমান্য করেছেন। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়। এ হিসাবে আজ ৩০ দিনের সময়সীমা শেষ হচ্ছে। সময় পার হওয়ার পর কী হবে– এ বিষয়ে সাবেক ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরাও মন্তব্য করতে রাজি হননি।

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের ১০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ অধিবেশন আহ্বানের অনুরূপ পদ্ধতিতে পরিষদের সভা আহ্বান করতে হবে। অর্থাৎ, রাষ্ট্রপতি পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করবেন। সভা আহ্বান না করা হলে কী হবে, তা বলা নেই আদেশে।

এদিকে পরিষদের ভবিষ্যৎ গণভোট এবং আদেশের বৈধতা নিয়ে করা রিটে হাইকোর্ট ইতোমধ্যে রুল জারি করেছেন। ফলে কেউ কেউ বলছেন, আদালতের ওপরও বিষয়টি নির্ভর করছে।

ঐকমত্য কমিশনের সাবেক একজন সদস্য সমকালকে বলেন, এটি হলো সংসদীয় রাজনীতির ‘দুই-তৃতীয়াংশের অভিশাপ’। বিএনপি ২০০ আসন না পেলে সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দলের সহায়তা নিতে বাধ্য থাকত। পরিষদে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সংবিধান সংস্কারের সুযোগ থাকায়, বিএনপি নিজ উদ্যোগে পরিষদ গঠন করত। সংসদে বিরোধীদের এমপি সংখ্যা মাত্র ৭৮। পরিষদেও তারা বিএনপিকে আটকাতে পারবে না। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যাওয়ায়, বিএনপি পরিষদকে অপ্রয়োজনীয় মনে করছে। ফলে এখন রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া পথ নেই।

গণভোটে অনুমোদিত আদেশে কী আছে
গত বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে সংবিধান সংস্কারে ৪৮টি প্রস্তাব করা হয়, যা জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গত সেপ্টেম্বরে রাজনৈতিক দলগুলোর তৃতীয় দফার সংলাপে সনদ বাস্তবায়নে ছয়টি পদ্ধতি প্রস্তাব করা হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে সনদ বাস্তবায়নে আদেশ জারি এবং আদেশের ওপর গণভোট আয়োজনের সুপারিশ করে সাবেক ঐকমত্য কমিশন। বিএনপি গণভোটে একমত হলেও, আদেশ জারির বিপক্ষে ছিল। গত ১৩ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের অনুমোদনে রাষ্ট্রপতি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করেন। এর ওপর গত ১৩ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিনে গণভোট হয়। ৬৮ শতাংশের বেশি ভোটে আদেশটি অনুমোদন হয়।

হ্যাঁ জয়ী হওয়ায় আদেশ অনুযায়ী, ত্রয়োদশ সংসদ দ্বৈত ভূমিকা পালন করবে। নির্বাচিত এমপিদের নিয়ে ১৮০ কার্যদিবস মেয়াদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। এ পরিষদ গণভোটের ফল অনুযায়ী, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, ন্যায়পাল এবং দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের বিধান সংবিধানে যুক্ত করবে। ভোটের অনুপাতে (পিআর) সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দিয়ে ১০০ আসনের উচ্চকক্ষ গঠন করবে। এই আটটি ছাড়াও গত ১৭ অক্টোবর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদের যে ৩০ সংস্কার প্রস্তাবে সব দলের ঐকমত্য হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়ন করবে। বাকি ১০টি প্রস্তাব বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা নেই।

তবে প্রথম আট প্রস্তাবের মধ্যে নির্বাচন কমিশন বাদে বাকিগুলোতে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) রয়েছে। বিএনপি এগুলো বাস্তবায়নে রাজি নয়। তবে জামায়াত জোট বলছে, এগুলোই আসল সংস্কার। বিএনপি পরিষদের শপথ না নিলেও, জামায়াত জোটের ৭৭ জনসহ ৭৮ এমপি শপথ নিয়েছেন। তারা দাবি করেছেন, রাষ্ট্রপতি পরিষদের সভা আহ্বান না করলেও, কোরামের (৬০ জন) চেয়ে বেশি সংখ্যক সদস্য শপথ নেওয়ায় পরিষদ গঠিত হয়ে গেছে।

এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এমপি সমকালকে বলেন, সংবিধানে ৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেন। একই পদ্ধতিতেই পরিষদের সভা আহ্বান করার কথা। প্রধানমন্ত্রী পরামর্শ দেননি বলেই রাষ্ট্রপতি সভা ডাকেননি। এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী গণভোটের রায়কে লঙ্ঘন করেছেন। কেন তিনি এই কাজ করেছেন, এর ব্যাখ্যা দিতে হবে।

জুলাই সনদ সংসদে নেবে বিএনপি
বিরোধী জোট সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে পরিষদে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন চায়। তবে বিএনপি জুলাই সনদকে সংসদে বাস্তবায়ন করতে চায় নোট অব ডিসেন্ট অনুযায়ী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংস্কারের সংলাপে বিএনপির নেতৃত্ব দেওয়া সালাহউদ্দিন আহমেদ গতকাল বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে আলোচনা হতে পারে।

সরকারি দল শপথ না নিলে জামায়াতের রাজপথে নামার যে ঘোষণা দিয়েছে– এ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, এটা তাদের জিজ্ঞেস করেন। বিএনপি সূত্র জানিয়েছে, দলটির অবস্থান হলো ৩০ পার হলে তারা আর সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকবে না। সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তারা এই প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাবে এবং সে অনুযায়ী নিজেদের মত করে জুলাই সনদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

রাজপথে যাওয়ার হুমকি জামায়াত জোটের
পরিষদের অধিবেশন ডাকতে গতকাল সরকারকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছে জামায়াত জোট। অন্যথায় রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা। রাজধানীর মগবাজারে ১১ দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকের পর জোটের সমন্বয়ক জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সনদ বাস্তবায়নে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথের আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে বিরোধী জোট। সরকার যদি আজ রোববারের মধ্যে পরিষদের অধিবেশন না ডাকে বা ডাকার ব্যবস্থা না করে, তাহলে জাতির কাছে ক্ষমা পাবে না। সংসদ নেতাসহ সরকারকে দায়দায়িত্ব নিতে হবে। জামায়াত জোট বলছে, বিএনপি ৫১ শতাংশ ভোট পেয়ে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও গণভোটে হ্যাঁ পেয়েছে ৬৯ শতাংশ ভোট। বিএনপির চেয়ে জুলাই সনদের ম্যান্ডেট বড়।

১১ দলের বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, বিএনপি পরিষদের অধিবেশন ডাকবে না– এটা তারা নিশ্চিত। সরকারের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সংসদে বিরোধী দলের পক্ষে কিছু করা অসম্ভব। তাই জুলাই সনদ পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবি রাজপথে নিয়ে যেতে চান তারা। তবে ঈদের কারণে এখনই কর্মসূচি দেওয়া হবে না। আগামী ২৮ মার্চ ১১ দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে কর্মসূচি ঠিক হবে। শুরুতে সংসদে এমপিদের প্রতিবাদ, রাজপথে সভা-সমাবেশ-মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি দেওয়া হবে। ধাপে ধাপে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সংসদ এবং পরিষদের অধিবেশন একই সঙ্গে ডাকার কথা। কিন্তু অধিবেশন ডাকা হয়েছে শুধু জাতীয় সংসদের। এতে বোঝা যায়, বিএনপি সরকার গঠনের পর সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছে। এর মাধ্যমে জাতির সঙ্গে প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। হ্যাঁ ভোট দেওয়া ৭০ শতাংশ ভোটারকে অপমান করা হয়েছে।

সাবেক ও বর্তমান সরকার নীরব
বর্তমান আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। সেই সময়ে তিনি এবং ঐকমত্য কমিশনের বিশেষজ্ঞ প্যানেল আদেশ জারি এবং আদেশের ওপর গণভোট আয়োজনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। আসাদুজ্জামান বর্তমান সরকারের সময় আইনমন্ত্রী। তাঁর দল আদেশের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও মন্ত্রী নীরব রয়েছেন। এ বিষয়ে গতকাল যোগাযোগ করে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও এ বিষয়ে নীরব। তবে তিনি শুক্রবার তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, আমরা অবগত, জুলাই আদেশের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে কারও কারও মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। তবে আমরা ডকট্রিন অব নেসেসিটি এবং ডকট্রিন অব উইল অব দ্য পিপল সম্পর্কে সচেতন ছিলাম। নির্বাচিত সংসদ পোস্টভ্যালিডিটি দিয়ে সংবিধান সংশোধন করেছে– এমন নজিরগুলোও আমাদের প্রত্যাশা নির্ধারণে বিবেচনায় রাখা হয়েছিল। এসব বিবেচনায় বর্তমান সরকারের সুযোগ রয়েছে সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here