রাজধানীর আব্দুল গনি রোডে অবস্থিত বাংলাদেশ সচিবালয়ের ক্রমবর্ধমান দাপ্তরিক চাপ কমাতে সেখানে একটি আধুনিক ২১ তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা ফেরত দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের মূল নকশা অনুযায়ী শেরেবাংলা নগরেই পুরো সচিবালয় স্থানান্তরের পরামর্শ আসায় এই ভবন নির্মাণ প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
সম্প্রতি সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের দ্বিতীয় একনেক সভা থেকে ‘বাংলাদেশ সচিবালয়ে ২১ তলা বিশিষ্ট নতুন অফিস ভবন নির্মাণ’ প্রকল্পটি ফেরত পাঠানো হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে চলছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা / ছবি- সংগৃহীত
সংশ্লিষ্টরা জানান, পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ একনেকে উপস্থাপনের আগে প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করেছিল। কমিশনের মত ছিল, সচিবালয়ে বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ বর্গফুট অফিস স্পেস থাকলেও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল। বর্তমানে আরও প্রায় ৬ লাখ ৮০ হাজার বর্গফুট জায়গার জরুরি চাহিদা রয়েছে। তবে, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক নির্দেশনার পর কমিশন এখন সচিবালয় স্থানান্তরের বৃহৎ পরিকল্পনার দিকেই মনোনিবেশ করছে। এই ২১ তলা ভবন নির্মাণের জন্য মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬৪৯ কোটি টাকা।
প্রকল্পের বিস্তারিত বিবরণ
বাতিল হওয়া এই প্রকল্পের আওতায় সচিবালয়ে একটি আধুনিক ২১ তলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। চার তলা বেজমেন্টের ওপর নির্মিতব্য এই ভবনের প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে ছিল— সুপার স্ট্রাকচার নির্মাণ, অভ্যন্তরীণ পানি সরবরাহ, সুয়ারেজ ব্যবস্থা, বিদ্যুতায়ন ও গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করা। এছাড়া, ভবনে একটি ভূগর্ভস্থ জলাধার, দুটি ২ হাজার কেভিএর সাব-স্টেশন, জেনারেটর (দুটি ৫০০ কেভিএ ও তিনটি ৪০০ কেভিএ) এবং কেন্দ্রীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা স্থাপনের কথা ছিল।
যোগাযোগ ও নিরাপত্তার জন্য ভবনে ৬টি প্যাসেঞ্জার লিফট, ৬টি ফায়ার লিফট এবং ২টি বেড লিফট স্থাপন করার পরিকল্পনা ছিল। একই সঙ্গে আধুনিক অগ্নিনিরাপত্তা ও শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, মাল্টিমিডিয়াসহ কনফারেন্স সিস্টেম এবং ২০টি অত্যাধুনিক কনফারেন্স রুম নির্মাণের কথা বলা হয়েছিল। এছাড়া, প্রকল্প চলাকালীন নিরাপত্তার জন্য সেফটি ক্যানোপি ও সেফটি নেট ব্যবহারের বিষয়টিও প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
পরিকল্পনা বিভাগের মতে, সচিবালয় হলো সরকারের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু, যেখান থেকে অধিকাংশ মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা বাস্তবায়িত হয়। বর্তমানে সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এবং নাগরিক সেবার পরিধি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই নন, প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক জনপ্রতিনিধি, বিদেশি প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ নাগরিক তাদের প্রয়োজনে সচিবালয়ে আসেন।
কিন্তু সচিবালয়ের বর্তমান স্থাপনাগুলো এই ক্রমবর্ধমান ব্যবহারকারীর চাহিদা পূরণে সক্ষম হচ্ছে না। প্রস্তাবিত ২১ তলা ভবনটি নির্মিত হলে সচিবালয়ে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৬৩৬ বর্গফুট নতুন জায়গা পাওয়া যেত, যা বর্তমান অতিরিক্ত চাহিদার ৪২ দশমিক ৩০ শতাংশ পূরণ করতে পারত। পরিকল্পনা বিভাগ মনে করে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সরকারের এই প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ নিশ্চিত হতো এবং এর মাধ্যমে নাগরিকদের আরও উন্নত সেবা প্রদান সম্ভব হতো।
পরিকল্পনা কমিশনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, প্রস্তাবিত ২১ তলা ভবনটি গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে বাস্তবায়নের কথা ছিল এবং ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে এটি শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ছিল জায়গার সংকট দূর করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা।
তবে, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় একনেক সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই প্রকল্প অনুমোদনের পরিবর্তে ভিন্ন পরামর্শ দেন। তিনি বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের মূল নকশা পর্যালোচনার ওপর বিশেষ জোর দিয়ে পুরো সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনার প্রেক্ষাপটে ৬৪৯ কোটি টাকার এই ভবন নির্মাণ প্রকল্পটি আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী গণপূর্ত অধিদপ্তরকে শেরেবাংলা নগরের সাবেক বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাই করার নির্দেশ প্রদান করেছেন।
পরিকল্পনা কমিশনের মতে, সরকারি জমির সঠিক ব্যবহার এবং দাপ্তরিক কাজের গতিশীলতা নিশ্চিত করতে এই ধরনের বহুতল ভবন নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি ছিল। যেহেতু প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ৫০ কোটি টাকার বেশি, তাই সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পেশ করা হয়।
কমিশনের সদস্য ও সিনিয়র সচিব এম এ আকমল হোসেন আজাদ তার সুপারিশে উল্লেখ করেছিলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সচিবালয়ের কর্মপরিবেশের ব্যাপক উন্নয়ন হবে। এর ফলে নাগরিক সেবা প্রাপ্তি আরও সহজ, দ্রুত ও গতিশীল হবে। ভবনটি নির্মাণ সম্পন্ন হলে এটি সচিবালয় প্রাঙ্গণে আধুনিক স্থাপত্য এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
তবে, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব শাকিল আখতার ঢাকা পোস্টকে এই প্রকল্পের ভিন্ন একটি দিক তুলে ধরেন। তিনি জানান, বিষয়টি শুধুমাত্র একটি প্রজেক্ট একনেক থেকে ফেরত দেওয়ার বিষয় নয়। মূল সমস্যা হলো বর্তমান সচিবালয়ের স্থান নিয়ে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘বর্তমান স্থানে নতুন করে দুই-তিনটি ভবন নির্মাণ করলেও জায়গাটি অত্যন্ত জনাকীর্ণ ও ঘিঞ্জি থেকে যাবে। আমরা যদি আগামী ৫০ বছরের পরিকল্পনা করি, তবে বর্তমান সচিবালয়ে এভাবে একের পর এক বহুতল ভবন তুলে কর্মকর্তাদের বসানো কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।’
এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিদিন সকালে অফিস শুরুর সময়ে চারদিক থেকে আসা কর্মকর্তাদের যানবাহনের চাপে পুরো সচিবালয় এলাকাটি স্থবির হয়ে পড়ে। এই জনজট ও যানজট নিয়ন্ত্রণ করা বর্তমানে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা বহুতল ভবন নির্মাণ করলে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করত।
শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সচিব জানান, সেখানে সরকারের যে জায়গা রয়েছে, তাতে ১০ থেকে ১২টি বহুতল ভবন নির্মাণ করা সম্ভব। তবে, নতুন করে এতগুলো ভবন নির্মাণ করা হলে ওই এলাকায় জনসমাগম এবং যানবাহনের চাপ কতটা বৃদ্ধি পাবে, তা বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই বিষয়ে সঠিক তথ্য ও হিসাব নিরূপণের জন্য গণপূর্ত বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই আশঙ্কার পেছনে যৌক্তিক কারণও রয়েছে। জাতীয় সংসদ ভবনে নিয়মিত ৩০০ জন সংসদ সদস্য যাতায়াত করেন। এছাড়া, ওই এলাকায় ইতোমধ্যে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিস স্থাপিত হয়েছে। এই বিদ্যমান চাপের সাথে যদি পুরো সচিবালয় সেখানে স্থানান্তরিত হয়, তবে ওই এলাকায় ভয়াবহ যানজট তৈরির আশঙ্কা প্রবল। তাই এই কারিগরি ও পরিবেশগত দিকগুলো খতিয়ে দেখা অত্যন্ত জরুরি বলে সচিব মনে করেন।
সচিব আরও স্পষ্ট করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার আগেই কারিগরি ও কৌশলগত বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সচিবালয় থেকে সব কর্মকর্তা ও কর্মচারী যদি আগারগাঁও বা শেরেবাংলা নগর এলাকায় চলে আসেন, তবে সেখানকার সামগ্রিক পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, প্রতিদিন কত লোক যাতায়াত করবে এবং এর ফলে ট্রাফিক বা জ্যামের পরিস্থিতি কতটা জটিল হতে পারে, তা নিরূপণ করতে বলা হয়েছে।
গণপূর্ত বিভাগ এই সামগ্রিক পরিস্থিতির একটি বিস্তারিত হিসাব ও প্রতিবেদন উপস্থাপন করার পর সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। তবে, এই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা এখনও বেঁধে দেওয়া হয়নি।





