অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস উইংয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহম্মদকে ঘিরে একের পর এক আর্থিক অনিয়ম, প্রভাব খাটানো এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সামনে আসছে। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ও বিভিন্ন সূত্রের দাবি অনুযায়ী, সাংবাদিকতা পেশা থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থানে যাওয়ার পর অল্প সময়েই তার পরিবার ও ঘনিষ্ঠদের সম্পদের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
ফয়েজ আহম্মদের বাড়ি লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার মীরগঞ্জ বাজারসংলগ্ন হতানি বাজার এলাকায়। তার বাবার নাম আমির হোসেন। স্থানীয় সূত্র বলছে, প্রায় দুই দশক আগেও আমির হোসেন ছিলেন সাধারণ গাছ কাটার শ্রমিক। পরে তিনি গাছ কেনাবেচার ছোট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিবারটির আর্থিক অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন স্থানীয়দের মধ্যেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রামগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি ইটভাটা কেনা হয়। স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানার সঙ্গে ফয়েজ আহম্মদের পরিবারের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
এছাড়া পূবালী ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনায় জানা যায়, ফয়েজ আহম্মদের বাবা আমির হোসেন ও ভাই ফারুকের বিরুদ্ধে খেলাপি ঋণ আদায়ে মামলা ছিল। ৫ই আগস্টের আগে তারা খেলাপি ঋণগ্রহীতা হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অল্প সময়ের মধ্যে পুরো ঋণ পরিশোধ করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
একই সময়ে সরকারি কাজের অর্ডার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমির হোসেন প্রায় ১১২ কোটি টাকার সরকারি কার্যাদেশ পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, যিনি কয়েক বছর আগেও স্থানীয় পর্যায়ে সীমিত আয়ের পেশায় যুক্ত ছিলেন, তিনি কীভাবে অল্প সময়ে শতকোটি টাকার সরকারি কাজের সঙ্গে যুক্ত হলেন।
ফয়েজ আহম্মদের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তিনি আগে নিউএজ পত্রিকায় দুদক বিটের প্রতিবেদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এছাড়া তৎকারীল ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ বিটে সে নিয়মিত কাজ করে এসেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি ইউনূসের প্রেস উইংয়ে যুক্ত হন এবং বর্তমানে তিনি নিউএজে নিজস্ব লেখক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বেসিক ব্যাংক সংক্রান্ত অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর প্রকাশ ঠেকাতে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে ‘ম্যানেজমেন্ট’ করা হতো। এ প্রক্রিয়ায় ফয়েজ আহম্মদের ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া এনআরবিসি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এস এম পারভেজ তমাল–কে ঘিরে দুদকের অনুসন্ধান নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে।
ব্যাংকসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তমালের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ ও অনুসন্ধান নিয়ে সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে কোটি টাকা লেনদেন হয়। সেই অর্থ ফয়েজ আহম্মদ গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে এমজিএইচ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আনিস আহমেদ গোর্কির বিরুদ্ধে দুদকের মামলা নিষ্পত্তি ঘিরেও ফয়েজ আহম্মদের নাম সামনে আসে। অভিযোগ রয়েছে, প্রেস উইংয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় করে মামলার গতিপথ পরিবর্তন, আর্থিক লেনদেন এবং একটি পত্রিকায় বিনিয়োগ নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে ফয়েজ আহম্মদের বক্তব্য জানা যায়নি।
সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ অনুসন্ধান হলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আড়ালে গড়ে ওঠা প্রভাব ও অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার একটি বড় চিত্র সামনে আসতে পারে।





