বাংলাদেশের তৃতীয় একক বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য যুক্তরাজ্য। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটিতে রপ্তানি ১ শতাংশ বেড়ে পৌঁছেছে ৪ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এর আগের অর্থবছরে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৩৬ শতাংশ। আয় হয়েছিল ৪ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার।
একই সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি ৪ শতাংশ বেড়ে ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। আর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য জার্মানিতে রপ্তানি ১০ দশমিক ৮১ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে।
তবে সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম প্রধান বাজার যুক্তরাজ্যে রপ্তানিতে ধীরগতির ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সামগ্রিক রপ্তানি ১ শতাংশ বাড়লেও, এ সময়ে দেশটিতে মোট পোশাক রপ্তানি শূন্য দশমিক ৯১ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার থেকে ৪ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
দেশটিতে মোট রপ্তানির ৯৩ দশমিক ৮ শতাংশ এসেছে তৈরি পোশাক থেকে। বিশ্বে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানিতে যুক্তরাজ্যের অংশও ১১ দশমিক ০৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১১ দশমিক ৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে।
নিটওয়্যার খাতে ভালো প্রবৃদ্ধির বিপরীতে ওভেন পোশাকের সামান্য পতনের কারণে সার্বিক প্রবৃদ্ধি সীমিত ছিল।
নিটওয়্যার রপ্তানি ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেড়ে ২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ২ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। আর ওভেন পোশাক রপ্তানি শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ডলার থেকে ১ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
সুতরাং, বলা যেতে পারে, যুক্তরাজ্যের বাজারে নিটওয়্যার খাতের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিই মোট রপ্তানিকে ইতিবাচক ধারায় রাখতে সহায়তা করেছে।
যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৯৮, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪ দশমিক ১৬, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৪৫, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৭৫, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৮২, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৩১, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৪৭, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৬২ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
আন্তর্জাতিক খুচরা বিক্রেতা ও ব্র্যান্ডগুলো এখনো সতর্ক ক্রয়নীতি অনুসরণ করছে এবং অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে সংযত।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মাদ হাতেম বলেন, ‘ওভেন পোশাকের চাহিদা দুর্বল থাকায় এ খাতে সামান্য নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। তবে নিটওয়্যার পণ্যের তুলনামূলক স্থিতিশীল চাহিদা বাংলাদেশের রপ্তানিকে ইতিবাচক অবস্থানে রাখতে সহায়তা করেছে।’
যদিও প্রবৃদ্ধি মাত্র শূন্য দশমিক ৯১ শতাংশ, তবুও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে রপ্তানি কমার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য স্বস্তিদায়ক নয় বলে মনে করেন তিনি।
বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, ‘আগামী দিনে মূল্য সংযোজিত পণ্য, টেকসই পোশাক ও দ্রুত সরবরাহ সক্ষমতা বাড়াতে পারলে যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।’
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই প্রবৃদ্ধির গতি অনেকটা কমেছে। এর অন্যতম কারণ যুক্তরাজ্যের ভোক্তা চাহিদার ধীর পুনরুদ্ধার, উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব ও আমদানিকারকদের সতর্ক ক্রয়নীতি।’
‘একই সঙ্গে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো মূলত তৈরি পোশাকনির্ভর হওয়ায় পণ্যে বৈচিত্র্যের ঘাটতি প্রবৃদ্ধিকে সীমিত করছে। প্রতিযোগী দেশগুলো উচ্চমূল্য সংযোজনকারী ও বহুমুখী পণ্য নিয়ে বাজারে এগিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের ওপরও প্রতিযোগিতার চাপ বেড়েছে,’ মন্তব্য করেন এ অর্থনীতিবিদ।
তবে দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাজ্যের বাজারে শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে হলে পোশাকের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর, চামড়া, কৃষিপ্রক্রিয়াজাত ও অন্য অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
মোয়াজ্জেম বলেন, ‘পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, মানোন্নয়ন, সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা ও ক্রেতাদের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়ার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।’



