আইসিটিতে চার্জশিটভুক্তরা স্থানীয় নির্বাচনে ‘অযোগ্য’

0
3

অক্টোবরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রস্তাবিত সংশোধনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় নির্বাচনেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) চার্জশিটভুক্ত আসামি প্রার্থী হতে পারবেন না। এ ছাড়া দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা নাগরিকদেরও এই নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণার চিন্তা করছে কমিশন। এরই মধ্যে আইনের সংশোধনীর খসড়া প্রস্তুত হয়েছে। আগামীকাল মঙ্গলবার কমিশন সভায় অনুমোদন পেলে তা সরকারের কাছে পাঠানো হবে। ইসি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার (আইন) আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ২০সি ধারায় চার্জশিটভুক্ত ব্যক্তিদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার বিধান আগে থেকেই রয়েছে। তবে এতদিন সেটি স্থানীয় সরকার আইনে যুক্ত ছিল না। এখন সেই বিধান যুক্ত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এর আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আইনে এই বিধান যুক্ত করা হয়েছিল। এখন স্থানীয় সরকার আইনেও একই বিধান সংযোজন করা হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চার্জশিটভুক্ত কেউ মেয়র, চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর বা সদস্য পদে নির্বাচন করতে পারবেন না। তবে ট্রাইব্যুনাল থেকে অব্যাহতি বা খালাস পেলে সেই অযোগ্যতা আর থাকবে না।

এদিকে আওয়ামী লীগকে উদ্দেশ্য করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের কেউ যেন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, সে বিষয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ইসির কাছে সুপারিশ করেছে। ইসির সিনিয়র সচিবের কাছে দেওয়া জামায়াতের চিঠিতে সুপারিশের মধ্যে রয়েছে—ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী সদস্যপদ তুলে দিয়ে প্রতি ওয়ার্ডে নারীদের সরাসরি ভোটের আয়োজন; প্রচার-প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হলেও মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের (এমপি) নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। তাই মন্ত্রী-এমপিদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার বিধান সংযোজন করতে হবে। সব নির্বাচনেই ভোটকেন্দ্রে গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা; সরকার কর্তৃক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো রাজনৈতিক দলের পদধারী বা সক্রিয় নেতাকর্মীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করার বিধান সংযোজন করতে হবে। স্থানীয় সরকার প্রশাসনে নিযুক্ত কোনো প্রশাসক বা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ পদে নিযুক্ত ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন—এ মর্মে বিধান সংযোজন করতে হবে প্রভৃতি। এ বিষয়ে জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের গণমাধ্যমকে বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের কোনো পর্যায়ের নেতার স্বাভাবিকভাবেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। ইসিকে পাঠানো চিঠিতে জামায়াতের পক্ষ থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের কাউকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে আটকাতে ইসিতে চিঠি দিয়েছে জামায়াত। এ বিষয়ে বিএনপির অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, এবারের নির্বাচন দলীয় প্রতীকের ভিত্তিতে হচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে নির্বাচন কে করবে না করবে, এটা আদালতের বিষয়, এটা নির্বাচন কমিশনের বিষয়। কী আইন আছে তা দেখে, সে অনুযায়ী তারা নির্ধারণ করবেন। অন্য রাজনৈতিক দল কী বলল, না বলল সেটা বিষয় নয়। প্রচলিত আইন ও এখন যে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, সে আইন অনুযায়ী কারা নির্বাচনে যাবেন না যাবেন, সেটা সম্পূর্ণ দেখার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের সদস্যদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার বিষয়ে জামায়াতের সুপারিশের বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, চিঠির বিষয়ে আমার জানা নেই। তবে এটি দলীয় নির্বাচন নয়, তাই আইন অনুযায়ী যোগ্যতা থাকলে যে কেউ নির্বাচন করতে পারবেন। আচরণবিধিমালা সংশোধনের বিষয়ে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, আমরা পাঁচটি (সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ) আচরণ বিধিমালা ঠিক করে মতামত দেওয়ার জন্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছিলাম। এতে আমরা কিছু প্রস্তাবনা পেয়েছি। সেগুলো আমরা সচিবালয় পর্যায়ে পর্যালোচনা করেছি। এখন কমিশনে উপস্থাপন করা হবে। কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটি ঠিক হলে আমরা নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালার কাজ শুরু করব। আরেকটি হলো আইনগত বিষয়। স্থানীয় সরকারের পাঁচটি আইনের মধ্যে সামঞ্জস্যতা রাখা। এটি সরকারের কাছে পাঠানো হবে কি না, সেটি কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে।

সূত্র আরও জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীর অন্তর্ভুক্তি চায় ইসি। যাতে প্রয়োজনে এই নির্বাচনে সেনাসদস্যদের মোতায়েন করা যায়। কারণ এর আগে ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে ইসি সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে চাইলেও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তা দেয়নি। আর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের নির্বাচনে অযোগ্য চাওয়া হয়েছে। ইসি কর্মকর্তারা মনে করেন, স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা নির্বাচনে অংশ নিলে যেমন অন্য শিক্ষকদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, আবার এসব শিক্ষক বিজয়ী হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রভাব পড়ে। তাই এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে চাকরি ছেড়ে করার পক্ষে তারা।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ইসির সিনিয়র সচিব বলেন, এই নির্বাচন তো দলভিত্তিক নয়। সংসদে সংশোধিত আইন অনুযায়ী রাজনৈতিক দলের ব্যানারে এবার স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হবে না।

এ ছাড়া, ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের অংশীদার পরিচালক এবং ঋণখেলাপিদের গ্যারান্টারদের প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা হবে। হলফনামায় ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের বিধানও যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে বলে জানা গেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here