বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরীর জন্মদিন আজ। অভিনয়ের পাশাপাশি নির্মাতা হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। সেই স্বপ্নের সবচেয়ে বড় অধ্যায় ছিল সরকারি অনুদানে নির্মিত তার দ্বিতীয় সিনেমা ‘এই তুমি সেই তুমি’। কিন্তু কবরীর মৃত্যুর পাঁচ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সিনেমাটি এখনো মুক্তির মুখ দেখেনি। নির্মাতাপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের তথ্যের মধ্যে মিল না থাকায় সিনেমাটির ভবিষ্যৎ নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
১৯৫০ সালের ১৯ জুলাই চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে জন্ম নেওয়া সারাহ বেগম কবরী মাত্র ১৪ বছর বয়সে সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘সুতরাং’ সিনেমার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক করেন। এরপর ‘সুজন সখী’, ‘সারেং বৌ’, ‘ময়না মতি’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় সিনেমায় অভিনয় করে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র।
অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালনায়ও নিজের স্বাক্ষর রাখতে চেয়েছিলেন কবরী। ২০০৬ সালে ‘আয়না’ নির্মাণের পর দীর্ঘ ১৪ বছর বিরতি দিয়ে সরকারি অনুদানে শুরু করেন তার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘এই তুমি সেই তুমি’। মুক্তিযুদ্ধ ও সমসাময়িক সময়ের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এ সিনেমার কাহিনি, চিত্রনাট্য ও সংলাপও লিখেছিলেন তিনি নিজেই।
২০২০ সালে শুরু হয় সিনেমাটির শুটিং। করোনা মহামারির কঠিন সময়েও কাজ থামাননি কবরী। প্রায় পুরো শুটিং শেষ হয়ে গিয়েছিল; বাকি ছিল মাত্র দুই দিনের কাজ। কিন্তু ২০২১ সালের এপ্রিলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। ১৭ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হলে থেমে যায় সিনেমাটির নির্মাণ।
পরে কবরীর ছেলে শাকের চিশতী মায়ের অসমাপ্ত স্বপ্নপূরণের দায়িত্ব নেন। কবরীর রেখে যাওয়া স্টোরিবোর্ড ও পরিকল্পনার ভিত্তিতে বাকি শুটিং, ডাবিং ও সম্পাদনার কাজ শেষ করা হয়। ২০২৩ সালের শেষ দিকে তিনি জানান, সিনেমাটির নির্মাণ শেষ হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের পর দেশে মুক্তি দেওয়া হবে। তবে সেই ঘোষণার পর কেটে গেছে আরও কয়েক বছর। এখনো বড় পর্দায় আসেনি ‘এই তুমি সেই তুমি’।
সম্প্রতি শাকের চিশতী দাবি করেছেন, সিনেমাতে সাবটাইটেল সংযোজনের কাজ চলছে এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডে ছাড়পত্রের জন্য জমা দেওয়া হয়েছে। ছাড়পত্র পেলেই মুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
তবে এ বক্তব্যের সঙ্গে মিলছে না সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের তথ্য। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের উপপরিচালক মঈনউদ্দীন গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, আজ (রোববার) পর্যন্ত তাদের কাছে ‘এই তুমি সেই তুমি’ সার্টিফিকেশনের জন্য জমা পড়েনি।
এদিকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারি অনুদানের কোনো সিনেমার শুটিং শেষ হলে তা মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে হয়। এরপর অনুদানের বকেয়া কিস্তির অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু ‘এই তুমি সেই তুমি’ সিনেমার শুটিং শেষ হওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য বা তৃতীয় কিস্তির অর্থের আবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েনি।
ফলে একদিকে নির্মাতাপক্ষ সিনেমাটিকে মুক্তির জন্য প্রস্তুত বলে দাবি করলেও, অন্যদিকে সরকারি নথিতে তার অগ্রগতির কোনো রেকর্ড নেই। এই দ্বৈত অবস্থানই কবরীর শেষ পরিচালিত সিনেমাটির মুক্তি নিয়ে তৈরি করেছে নতুন অনিশ্চয়তা।
বেঁচে থাকতে ‘এই তুমি সেই তুমি’ ছিল কবরীর সবচেয়ে প্রিয় প্রকল্পগুলোর একটি। এই সিনেমার জন্য প্রথমবারের মতো গানও লিখেছিলেন তিনি। সংগীত পরিচালনা করেন সাবিনা ইয়াসমিন, আর কণ্ঠ দেন ইমরান ও কোনাল। কিন্তু নির্মাতা কবরীর সেই স্বপ্নের সিনেমা আজও দর্শকের সামনে আসেনি। তার জন্মদিনে তাই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে—কবে মুক্তি পাবে কবরীর শেষ সিনেমা, নাকি এটি অপূর্ণ স্বপ্ন হয়েই থেকে যাবে?



