‘স্পাইডার-ম্যান’ কেন এত জনপ্রিয়?

0
2

সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে আসার পর থেকেই চারদিকে তুমুল হইচই। বক্স অফিসে রেকর্ড পরিমাণ আয়, সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা আর সিনেপাড়ায় প্রশংসার ঝড়—সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তি পাওয়া ‘স্পাইডার-ম্যান : ব্র্যান্ড নিউ-ডে’ নিয়ে নতুন করে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে হলিউড। বিশ্বজুড়ে এতো এতো সুপারহিরোর ভিড়ে ‘স্পাইডার-ম্যান’ জনপ্রিয়তায় কেন এতো এগিয়ে?

কমিক থেকে জনপ্রিয়তা
স্পাইডার-ম্যানের বিশ্বজয়ের মূল ভিত রচিত হয়েছিল কমিক বইয়ের পাতায়। প্রখ্যাত লেখক স্ট্যান লি ও শিল্পী স্টিভ ডিটকোর কালজয়ী এ চরিত্র প্রথমবার প্রকাশিত হয় ১৯৬২ সালে। কমিক জগতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে চরিত্রটি। বিশ্বজুড়ে ৩৮ কোটিরও বেশি কপি বিক্রি হওয়া এই কমিকগুলোই মূলত স্পাইডারম্যানের বিশ্বব্যাপী একচ্ছত্র জনপ্রিয়তার শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছিল। একের পর এক মুগ্ধকর কাহিনি এবং আকর্ষণীয় খলনায়কদের উপস্থিতি কমিক অনুরাগী থেকে শুরু করে সব শ্রেণির পাঠকের হৃদয়ে ‘স্পাইডার-ম্যান’-এর স্থায়ী আসন গড়ে দেয়। শৈশবে রঙিন পাতায় আঁকা ‘দ্য নাইট গোয়েন স্টেসি ডাইড’, ‘ক্রেভেন্স লাস্ট হান্ট’ কিংবা ‘স্পাইডার-ভার্স’-এর মতো রোমাঞ্চকর ও আবেগঘেঁষা গল্পগুলো পড়তে পড়তেই কোটি কোটি শিশু-কিশোর চরিত্রটির ভক্ত হয়ে ওঠে। কমিকের সেই জাদুকরী পাতাগুলোই পরবর্তী সময়ে অ্যানিমেটেড সিরিজ এবং বড় পর্দার চলচ্চিত্রে রূপ নিয়ে বিশ্বব্যাপী পপ কালচারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।

স্কুল জীবনের স্টিকার-ট্যাটু
এই চিরসবুজ জনপ্রিয়তার পেছনে মানুষের শৈশবের স্মৃতি এবং বিশেষ কিছু অনুষঙ্গের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব রয়েছে। স্কুলজীবনে অনেকেরই স্পাইডার-ম্যানের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটেছিল বইয়ের খাতায় বা জ্যামিতি বক্সে লাগানো আকর্ষণীয় সব স্টিকারের মাধ্যমে। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের শৈশবের রঙিন স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে লাল-নীল পোশাকের চরিত্রটি। টিফিন বক্স, পড়ার ব্যাগ কিংবা হাতে ও গায়ে লাগানো রঙিন স্টিকার ও ট্যাটু—সবকিছুতেই ছিল স্পাইডার-ম্যানের একচ্ছত্র আধিপত্য। শৈশবে জামায় স্পাইডার-ম্যানের স্টিকার লাগানো কিংবা খেলনা মাকড়সা নিয়ে প্রতিপক্ষের দিকে জাল ছোড়ার অভিনয় করা প্রতিটি শিশুর জন্য ছিল এক রূপকথার মতো অনুভূতি। শৈশবে তৈরি হওয়া এই নিবিড় আবেগ প্রাপ্ত বয়সেও চরিত্রটি প্রতি মানুষের ভালোলাগা ধরে রেখেছে।

টেলিভিশনে ‘স্পাইডার-ম্যান’ বিপ্লব
কমিক বইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে স্পাইডার-ম্যানকে প্রতিটি ঘরের ড্রয়িংরুমে পৌঁছে দিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল টেলিভিশন। বিশেষ করে ১৯৯০-এর দশকের আইকনিক ‘স্পাইডার-ম্যান : দ্য অ্যানিমেটেড সিরিজ’সহ ছোটপর্দার নানা অ্যানিমেটেড শো চরিত্রটিকে বিশ্বজুড়ে ঘরে ঘরে পরিচিত করে তোলে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, টেলিভিশনে বিভিন্ন শিশুতোষ চ্যানেলে নিয়মিত দেখানো হতো স্পাইডার-ম্যান শো। চোখ ধাঁধানো অ্যানিমেশন এবং প্রতিটি পর্বে খলনায়কদের সঙ্গে পিটারের টানটান লড়াই টিভির সামনে আটকে রাখত লক্ষ লক্ষ শিশু-কিশোরকে। ছোটপর্দায় স্পাইডার-ম্যানের এই টিভি বিপ্লবই মূলত সাধারণ কমিক পাঠকদের সীমানা ছাড়িয়ে সার্বজনীন পপ কালচারের এক শক্তিশালী প্রতীকে রূপান্তর করে, যা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নস্টালজিয়ার এক বিশাল মেলবন্ধন তৈরি করেছে।

বড় পর্দায় স্পাইডার-ম্যানের আলাদা জায়গা
ছোট পর্দা বা কমিক বইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে রূপালি পর্দায় স্পাইডার-ম্যানের পদচারণা পুরো বিশ্ব চলচ্চিত্র শিল্পের ইতিহাসকেই বদলে দিয়েছিল। ২০০২ সালে স্যাম রাইমির পরিচালনায় ‘স্পাইডার-ম্যান’ হয়ে বড় পর্দায় আসেন টোবি ম্যাগুইয়ার। অন্যান্য সুপারহিরোদের ভিড়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে আলাদা জায়গা করে নেয় ‘স্পাইডার-ম্যান’। নাম ভূমিকায় টোবি ম্যাগুইয়ারও পান বিপুল জনপ্রিয়তা। এরপর থেকে ‘স্পাইডার-ম্যান’-এর জনপ্রিয়তা কেবল বেড়েই চলেছে।

মধ্যবিত্ত ঘরের সদস্য স্পাইডার-ম্যান
অন্যান্য সুপারহিরোদের চেয়ে স্পাইডার-ম্যানের মূল পার্থক্য লুকিয়ে আছে তার ভেতরের গল্প এবং অতিসাধারণ মানবিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে। অন্য কোনো গ্রহের শক্তিশালী সুপারম্যান কিংবা ব্যাটম্যান-এর সঙ্গে তুলনা করলে পিটার পার্কার (স্পাইডার-ম্যান) এক অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত তরুণ। পড়াশোনার চাপ, মাস শেষে বাড়িভাড়ার দুশ্চিন্তা, পরিবারের দায়িত্ব ও সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েই তাকে সুপারহিরোর দায়ভার সামলাতে হয়। ‘মহৎ ক্ষমতার সঙ্গে আসে মহৎ দায়িত্ব’—এই চিরন্তন দর্শনে গড়ে ওঠা পিটার পার্কারের গল্প মানুষকে সহজেই নিজের জীবনের সঙ্গে মেলাতে সাহায্য করে।

অ্যাকশনের ছাপিয়ে বন্ধুত্ব
পর্দায় কেবল অ্যাকশন নয়, পিটার পার্কারের জীবনের ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোও দর্শকদের গভীরভাবে টানে। তার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ দুই ঘনিষ্ঠ মানুষ—নেড লিডস ও মিশেল জোনস ওয়াটসন (এমজে)। স্কুলজীবন থেকেই নেডের সঙ্গে পিটারের বন্ধুত্ব গভীর। পিটারের দীর্ঘদিনের ভালো লাগার মানুষ এমজে। পিটার নিজের সুপারহিরো পরিচয় গোপন রাখায় বন্ধুদের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হতে থাকে, আর সেই গোপনীয়তাই ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্ককে নতুন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করায়। নেড, পিটার ও এমজে’র ত্রিভুজ সম্পর্কের বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, ঈর্ষা ও ভুল-বোঝাবুঝির মিশ্রণ সিনেমার আবেগকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে। সেই আবেগ স্পর্শ করেছে দর্শকের মনও। কারণ বন্ধুত্ব যে চিরন্তন আবেগের বন্ধন।

সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা
জনপ্রিয়তার এই বর্তমান প্রভাব বেশ ভালোভাবে চোখে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। রেডিট-এ থর, ডক্টর স্ট্রেঞ্জ বা ক্যাপ্টেন মার্ভেলের মতো অতিমানবিক শক্তিধর চরিত্রগুলোর চেয়ে স্পাইডার-ম্যানের অধিক জনপ্রিয়তার কারণ নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যে বহু আলোচনা দেখা যায়। তারা মূলত স্পাইডার-ম্যান চরিত্রের ‘সহজ ও সাধারণ রূপ’ এবং সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবনের সঙ্গে তার নিবিড় মিলকেই প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাদের মতে, কোনো চরিত্রের জনপ্রিয়তা তার ক্ষমতার মাত্রার ওপর নির্ভর করে না; বরং দৈনন্দিন নানা সংকট ও টানাপোড়েনে জর্জরিত একজন সাধারণ তরুণের মাঝেই নিজের প্রতিচ্ছবি বেশি দেখতে পায়। অসংখ্য সীমাবদ্ধতা ও মানবিক দুর্বলতার মুখে দাঁড়িয়েও লড়াই চালিয়ে যাওয়া এবং কখনোই হার না মানার যে অদম্য ইচ্ছাশক্তি পিটার পার্কার দেখায়, সেটাই স্পাইডার-ম্যানকে অন্য সব সুপারহিরোর চেয়ে বিশ্বজুড়ে দর্শকদের কাছে আলাদা করে তুলেছে।

জনপ্রিয়তার প্রভাব পড়ছে আয়ে
বিশ্বজুড়ে স্পাইডার-ম্যানকে ঘিরে থাকা এই তুমুল উন্মাদনা ও জনপ্রিয়তার সরাসরি প্রভাব দেখা যাচ্ছে সিনেমাটির অভাবনীয় বাণিজ্যিক সাফল্যে। প্রেক্ষাগৃহে আসার পর থেকেই বক্স অফিসে রাজত্ব করছে ‘স্পাইডার-ম্যান : ব্র্যান্ড নিউ ডে’। দ্বিতীয় সপ্তাহে এসেও সিনেমাটির আয়ের গতি কমেনি। এ সপ্তাহান্তে কেবল উত্তর আমেরিকায় সিনেমাটি আয় করেছে ১৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার। সবমিলিয়ে দুই সপ্তাহে বিশ্বব্যাপী এই সিনেমার আয় ছাড়িয়েছে ১ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। এরই মধ্য দিয়ে চলতি বছরের সর্বোচ্চ আয়কৃত সিনেমা হয়ে গেছে এটি। এখনো সিনেমাটির যে দাপট দেখা যাচ্ছে, তাতে প্রথম ‘স্পাইডার-ম্যান’ হিসেবে এর আয় ছাড়াতে পারে ২ বিলিয়ন ডলারও।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here