দুই বছরে সাত রায়: সাজা ২৩ জনের, ফাঁসির খাতায় সংখ্যাটা ‘শূন্য’

0
5

কোনো কোনো রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল হয়েছে, আবার কোনটি রয়েছে সর্বোচ্চ আদালতের চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়ায়। ফলে ট্রাইব্যুনালের রায়ের খাতা ভারী হলেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘরটি রয়ে গেছে শূন্য। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও নানা প্রশ্ন ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর ট্রাইব্যুনাল-১ ও ট্রাইব্যুনাল-২-এ জুলাই-আগস্টের মানবতাবিরোধী অপরাধসহ নানা অপরাধের বিচারকাজ শুরু হয়। এখন পর্যন্ত ঘোষিত সাতটি রায়ে মোট ৬৮ জনকে দণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন ২৩ জন, যাবজ্জীবন ১১ জন এবং ৩৩ জনকে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড। এছাড়া, একজনের হাজতবাসকে সাজার মেয়াদ হিসেবে গণ্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল এবং রাজসাক্ষী হওয়ায় একজনকে ক্ষমা করা হয়েছে।

দণ্ডিত ৬৮ জনের মধ্যে ৪৭ জনই এখনও পলাতক। আর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২৩ জনের মধ্যে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পেরেছে মাত্র চারজনকে। ট্রাইব্যুনালের রায় কার্যকর না হওয়া প্রসঙ্গে প্রসিকিউশন জানিয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিচারপ্রক্রিয়া শেষ করে রায় দেওয়া পর্যন্তই ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব। দণ্ড কার্যকরের বিষয়টি মূলত নির্বাহী বিভাগ বা সরকারের এখতিয়ার। কোনো রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে তা নিষ্পত্তি করেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে আপিল দায়েরের পর তা ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও, মামলার চাপের কারণে অনেক ক্ষেত্রে তা যথাসময়ে সম্ভব হচ্ছে না।

সূত্র জানায়, চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ভারতে আশ্রয় নেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তার সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী-এমপি ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হত্যাযজ্ঞের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত এবং পুলিশের কয়েকজন সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

সর্বশেষ ১৫ সেপ্টেম্বর ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল-২। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাত রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ২৩ জনে।

প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালে অভিযোগের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। ২০০৯ সাল থেকে সংঘটিত গুম-খুনের ঘটনাগুলোও বিচারে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রসিকিউশনে প্রায় ৬০০টি অভিযোগ জমা রয়েছে। সাতটি মামলার রায় হলেও ৭০টির বেশি মামলা বিচারাধীন, যার অনেকগুলোই এখন সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।

উল্লেখ্য, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ২০১০ সালে গঠিত ট্রাইব্যুনালে মোট ৫৬টি মামলার রায় হয়েছিল। সেখানে ১৯৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা দেওয়া হয় এবং খালাস পান দুজন। ওই ট্রাইব্যুনালের রায়ে ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। অন্যদিকে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৭৫ জন আসামি কারাগারে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেন এবং বাকিদের সাজা কার্যকরের প্রক্রিয়া ঝুলে রয়েছে।

বর্তমান ট্রাইব্যুনাল দুই বছরে ২৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও একটি রায়ও কার্যকর করা যায়নি। অথচ আগের ট্রাইব্যুনালের ক্ষেত্রে প্রথম রায়ের পর ছয় বছরের মাথায় ছয়জনের ফাঁসি কার্যকর করা সম্ভব হয়েছিল।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের লক্ষ্যে ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। ওই ট্রাইব্যুনালে প্রথম রায় আসে ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি। এতে জামায়াতে ইসলামীর সদস্য (রোকন) আবুল কালাম আযাদকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও তিনি পলাতক থাকায় রায় কার্যকর করা যায়নি।

তবে, একই বছরের ১২ ডিসেম্বর জামায়াতের তৎকালীন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কার্যকর করা হয়। ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল জামায়াতের সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানেরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। পরবর্তীতে একে একে ফাঁসি কার্যকর হয় জামায়াতের শীর্ষ নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মতিউর রহমান নিজামী, মীর কাশেম আলী এবং বিএনপি নেতা (স্থায়ী কমিটির সদস্য) সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর। ২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মীর কাশেম আলীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়ার সমাপ্তি ঘটে।

এ প্রসঙ্গে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম বলেন, ‘আগের ট্রাইব্যুনালে ১৯৭ জনের বিচার হলেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে মাত্র ছয়জনের। অথচ তখন অনেক আসামি গ্রেপ্তার ছিলেন। আসলে দেশে প্রতিনিয়ত অসংখ্য মামলার বিচার হয়, তবে যেকোনো আদালতের ওপর একটি আপিল আদালত থাকে। আপিল বিভাগে মামলা দীর্ঘ সময় ঝুলে থাকার কারণে মূলত এই বিলম্ব ঘটে। প্রসিকিউশন হিসেবে আমাদের কাজ অপরাধ প্রমাণ করা। সাজা ঘোষণার পর তা নিষ্পত্তির দায়িত্ব আপিল বিভাগের এবং কার্যকর করার দায়িত্ব সরকারের।’

আগের ট্রাইব্যুনালে ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার যে প্রবণতা ছিল, সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের আগের ট্রাইব্যুনালে দু-একটি ব্যতিক্ৰম ছাড়া প্রায় ৯৫ শতাংশ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো এবং দণ্ডিত হওয়ার হার ছিল ৯৯ শতাংশের বেশি। ট্রাইব্যুনালে মামলা হওয়া মানেই মৃত্যুদণ্ড— এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। তবে, বর্তমান ট্রাইব্যুনাল সেই ধারণা থেকে বেরিয়ে এসেছে। এখন অপরাধের ধরন, ব্যক্তিগত ভূমিকা ও সম্পৃক্ততা বিবেচনায় ৭ বছর, ১০ বছর, যাবজ্জীবন কিংবা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি আরও উল্লেখ করেন, চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় কনস্টেবল সুজন হোসেন সরাসরি গুলি চালালেও ট্রাইব্যুনাল তাকে কম সাজা দিয়েছেন। কারণ, তিনি কনস্টেবল হিসেবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ মানতে বাধ্য হয়েছিলেন বলে আদালত পর্যবেক্ষণে জানিয়েছেন। প্রসিকিউশন এই বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে।

অবশ্য কনস্টেবল সুজনের সাজা বাড়াতে প্রসিকিউশন ইতোমধ্যে আপিল করেছে। একইভাবে কুষ্টিয়ার হত্যাযজ্ঞের মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সাজা বৃদ্ধির জন্যও আপিলের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকাজের গতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, ‘জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী বিচারকাজ এগোয়নি, কারণ শুরুতেই দেরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জনবল সংকট সত্ত্বেও কিছুটা অগ্রগতি হয়েছিল, কিন্তু রাজনৈতিক সরকার আসার পর তা ধীরগতির হয়ে পড়েছে। বিচারকাজ দ্রুত শেষ করার দাবি জানিয়ে আমরা ইতোমধ্যে স্মারকলিপিও দিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, “যেসব রায় ইতোমধ্যে ঘোষিত হয়েছে, সেগুলো কার্যকর করা গেলে শহীদ পরিবারগুলো ন্যায়বিচারের স্বাদ পেত। রায় কার্যকর না হওয়ায় ‘জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড’-এর মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে, যা বিচার বিভাগ ও সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে।”

পলাতক আসামিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে সাজা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ইন্টারপোলের সহায়তা নিয়ে হলেও তাদের দ্রুত ফিরিয়ে আনা উচিত। একই সঙ্গে ঘোষিত রায়গুলো কার্যকর করে এবং বাকি মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি ঘটিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন, যেন ভবিষ্যতে দেশে আর কখনওই এমন ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে না পারে।’

পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘ট্রাইব্যুনাল থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়া অনেক আসামিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তবে যারা বিদেশে পালিয়ে গেছেন, তাদের সরাসরি গিয়ে গ্রেপ্তার করার আইনি এখতিয়ার পুলিশের নেই। পলাতকদের দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোল এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় আইনি চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’

ঘোষিত সাতটি রায়ের চিত্র
শেখ হাসিনার মামলা: সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড। শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল পলাতক রয়েছেন।
চানখাঁরপুলের মামলা: ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য পাঁচ পুলিশ সদস্যের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড। আট আসামির মধ্যে চারজন গ্রেপ্তার রয়েছেন।

আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলা: ঢাকা-১৯ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামসহ ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড এবং অন্যান্য আসামির বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড। ১৬ আসামির মধ্যে আটজনই পলাতক।
আবু সাঈদ হত্যা মামলা: তৎকালীন এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়ের মৃত্যুদণ্ড এবং বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড। ৩০ আসামির মধ্যে সাতজন গ্রেপ্তার রয়েছেন।
রামপুরার মামলা: তিন পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড এবং দুজনের বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড। ২০ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত চঞ্চল চন্দ্র সরকার বর্তমানে কারাগারে আটক রয়েছেন।
কুষ্টিয়ার হত্যাযজ্ঞ: সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ড। তিনি বর্তমানে কারাবন্দি।
জুলাই হত্যাকাণ্ড মামলা: সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের মৃত্যুদণ্ড। মামলার সব আসামিই পলাতক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here