খাগড়াছড়ি বন বিভাগে ডিএফও পদায়নকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ, আদেশ বাতিলের দাবি

0
6

গণ-অভ্যূত্থানের পর দেশের আপামর জনসাধারণ মনে করেছিল দুর্নীতি শূণ্যের কোঠায় নেমে আসবে, কিন্তু মানুষের সেই আশা দূরাশায় পরিণত হয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই। দুর্নীতি অনেকাংশেই লাগামহীন অবস্থায় রয়েছে। এক শ্রেণীর দালাল, তদ্বিরবাজ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও দুর্নীতিবাজ আমলারা গিলে খাচ্ছে সর্বত্র। সবকিছুই সামাল দিতে হচ্ছে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে।

আজকের এই প্রতিবেদন খাগড়াছড়ি বন বিভাগের নতুন ডিএফও’র পদায়ন নিয়ে। সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্তের উপর ভিত্তি করেই এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বন অধিদপ্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থা। এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটির অনেক সুনামও রয়েছে। কিন্তু কোন কোন পোস্টিং বাণিজ্য নিয়েই সুনামের পরিবর্তে দুর্নাম ছড়াচ্ছে সর্বত্র। এতে করেই সমস্ত অর্জন ম্লাণ হয়ে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে সবচেয়ে বেশি বিব্রতকর অবস্থার সম্মুখীন হতে হচ্ছে বন প্রশাসনকে।

সারা দেশের মাঠ পর্যায়ের বিভাগীয় বন কর্মকর্তাদের পদায়নের প্রজ্ঞাপন জারি করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। বন প্রশাসন ও মন্ত্রণালয়ের সদিচ্ছার উপর ভর করেই পদায়নের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য লোভনীয় পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে জোরালো তদ্বিরসহ মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি ওপেন সিক্রেট। তবে এই রেওয়াজটি দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক সময়ে খাগড়াছড়ি বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা পদায়নের ক্ষেত্রে এ রকমই ঘটনার সৃষ্টি হওয়ায় তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে মাঠ পর্যায়ে।

গত ১৪ অক্টোবর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বন-৩ অধিশাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মাহমুদা বেগম স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে ফরিদপুর সামাজিক বন বিভাগের ডিএফও (চলতি দায়িত্ব) তারিকুল ইসলামকে খাগড়াছড়ি বন বিভাগের ডিএফও হিসেবে পদায়ন করা হয়। অর্থাৎ তিনি এখনও বিভাগীয় বন কর্মকর্তা পদে চলতি দায়িত্বে পদোন্নতিপ্রাপ্ত। প্রজ্ঞাপন পর্যালোচনা করে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয়েছে তাকে অকালীন বদলী করে খাগড়াছড়ি বন বিভাগে পদায়ন করা হয়েছে। তারিকুল ইসলামের পদায়নের প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে। এতে বোদ্দামহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়।

কিছুদিন পূর্বে খাগড়াছড়ি বন বিভাগের ডিএফও ফরিদ মিঞা অবসরোত্তর ছুটি যাওয়ায় ডিএফওর পদটি শূণ্য হয়ে পড়ে। সূত্র জানায়, খাগড়াছড়ি বন বিভাগের ডিএফও’র পদ শূণ্য হওয়ার পূর্ব থেকেই একটি প্রভাবশালী মহল এই পদে একজন ডিএফও পদায়নের ক্ষেত্রে ফরিদপুর সামাজিক বন বিভাগে কর্মরত ডিএফও (চলতি দায়িত্ব) তারিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। দুর্নীতিবাজ এই বন কর্মকর্তার গ্রীণ সিগনাল পেয়েই ঐ প্রভাবশালী মহলটি পরিবেশ, বন ও জলবায় পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের একজন নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির সন্তানের শরনাপন্ন হন।

সূত্র জানায়, যেহেতু খাগড়াছড়ি বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তার পদটি যেমন লোভনীয় তেমনি স্পর্শকাতর। সেই বিবেচনায় ৫০ লাখ টাকার চুক্তিতে ডিএফও (চলতি দায়িত্ব) তারিকুল ইসলাম সম্মতি প্রকাশ করেন। এরপরই ফরিদপুর সামাজিক বন বিভাগের ডিএফও তারিকুল ইসলামের পদায়নের প্রজ্ঞাপন জারি করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। সূত্র জানায়, তারিকুল ইসলামের পদায়নের পর গত ১৮ অক্টোবর রাজধানীর পান্থপথের কাছাকাছি অবস্থিত মোনায়েম টাওয়ারের পাশে একজন প্রভাবশালী নেতার ব্যবসায়িক অফিসে ঐ অর্থের লেনদেন করা হয়। আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি যখন জানাজানি তখন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং বন প্রশাসনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়।

সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে একজন নন ক্যাডার বন কর্মকর্তাকে খাগড়াছড়ি বন বিভাগে পদায়নের জন্য বন প্রশাসনকে প্রস্তাব পাঠানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। পদায়নকৃত এই বন কর্মকর্তা ইতোপূর্বে খাগড়াছড়ি বন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জ মাটিরাঙ্গায় রেঞ্জ কর্মকর্তা (ফরেষ্ট রেঞ্জার) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ঐ সময় তিনি জোতের মাধ্যমে রিজার্ভের কাঠ পাচার করে মোটা অঙ্কের (কয়েক কোটি টাকা) আর্থিক লাভবান হয়েছেন বলে তার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়। যে কারণে খাগড়াছড়ি বন বিভাগের আওতাধীন প্রতিটি রেঞ্জ, চেক স্টেশন কাম বিট এবং অন্যান্য বিট এলাকায় সম্পর্কে তার ব্যাপক ধারণাও রয়েছে বলে সূত্র জানায়। সেই হিসাব নিকাষ মাথায় রেখে তিনি মোটা অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেই খাগড়াছড়ি বন বিভাগের মতো লোভনীয় পোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিয়েছেন।

বন প্রশাসনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাংবাদিককে বলেন, ‘খাগড়াছড়ি বন বিভাগে তারিকুল ইসলামের পদায়ন বন অধিদপ্তরের জন্য একটি আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত। তিনি একজন নন ক্যাডার কর্মকর্তা। এছাড়া অদক্ষ এবং অযোগ্যও বটে। বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে পদায়ন মানেই হচ্ছে খাগড়াছড়ি বন বিভাগকে গিলে খাবেন তিনি। সেখানে একজন সাহসী, চৌকস, দক্ষ এবং সৎ কর্মকর্তার পদায়ন একেবারেই জরুরী ছিল’। তারিকুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, খাগড়াছড়ি বন বিভাগের মাটিরাঙ্গা রেঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করেন। এরপর তিনি সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে পটুয়াখালী উপকূলীয় বন বিভাগে যোগদান করেন। সেখানে সাড়ে ৪ বছর কর্মরত থাকার সুযোগে সুফল প্রকল্পের উন্নয়ন কাজ থেকে শতকরা ৫ শতাংশ কমিশন আদায় করেন। রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের মাধ্যমে এক পর্যায়ে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক বনে যান। সেই অর্থ বিনিয়োগ করেই খাগড়াছড়ি বন বিভাগের লোভনীয় পোস্টিং বাগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন তারিকুল ইসলাম।

তারিকুল ইসলামের পদায়নের কারণে বন প্রশাসনে সাহসী, দক্ষ ও চৌকস বন কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা দুর্নীতি বন্ধে এ ধরনের পদায়ন বাণিজ্যের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, এতে দুর্নীতিবাজরা আরও উৎসাহিত হবে। তারিকুল ইসলামের পদায়নের বিষয়টি পুনঃবিবেচনার অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন বন প্রশাসনের সচেতন কর্মকর্তারা। একজন সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) যিনি বিভাগীয় বন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্বে রয়েছেন, তাকে পার্বত্যাঞ্চলের এই ঝুঁকিপূর্ণ বন বিভাগে পদায়ন করায় নানা রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।

সূত্র নিশ্চিত করেছে, যিনি কোন যোগ্যতার মাপকাঠিতে খাগড়াছড়ি বন বিভাগের ডিএফও হিসেবে পদায়নের ক্ষেত্রে মোটেই বিবেচ্য নয়, অথচ তাকেই পদায়ন করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়েরও একটি সূত্র জানায়, একদিকে জোরালো তদ্বির অন্যদিকে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন এই দুই পরাশক্তির ফলেই এ ধরনের লোভনীয় পোস্টিং বাগিয়ে নিতে সক্ষম হন তারিকুল ইসলাম।

বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করলেও অর্থের লোভে কেউ কেউ এ ধরনের অনৈতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে ফেলছেন। এতে সরকারের ভাবমূর্তি ও সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে। বিষয়টির গুরুত্বানুধাবন করে দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে বদলী আদেশ বাতিল করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন সচেতনমহল। এ ব্যাপারে ডিএফও তারিকুল ইসলামের সঙ্গে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগের বিষয়টি শুনেই লাইন কেটে দেন। এরপর কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন আর রিসিভ করেননি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here