একটি দেশের অর্থনীতি কতটা শক্তিশালী, তা শুধু প্রবৃদ্ধির হার, বড় বড় প্রকল্প কিংবা সরকারি ব্যয়ের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না। একটি অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি বোঝা যায় তখনই, যখন দেশের মানুষ কাজের সুযোগ পায়, উদ্যোক্তা বিনিয়োগে আগ্রহী হয়, শিল্প ও ব্যবসা সম্প্রসারিত হয় এবং মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী থাকে। সেই জায়গা থেকেই বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—বিনিয়োগ বাড়ছেই না কেন? দেশে বাজার আছে, ভোক্তা আছে, উদ্যোক্তা আছে, শ্রমশক্তি আছে এবং বিনিয়োগের প্রয়োজনও আছে। তারপরও নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত গতি দেখা যাচ্ছে না। অনেক উদ্যোক্তা নতুন প্রকল্প শুরু করার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন, কেউ বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণে সতর্ক হচ্ছেন, আবার কেউ অপেক্ষা করছেন পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হওয়ার জন্য।
এটি শুধু বিনিয়োগের সমস্যা নয়। বিনিয়োগ কমে গেলে এর প্রভাব পড়ে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর। আমার বিবেচনায়, এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার অন্যতম প্রধান পথ হলো একটি আস্থাভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা। অর্থনীতিতে যারা আইন মেনে উৎপাদন করতে চান, ব্যবসা করতে চান, বিনিয়োগ করতে চান এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চান—তাদের রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ কিংবা অতীতের অবস্থান দিয়ে নয়, বরং তাদের অর্থনৈতিক ভূমিকা, সক্ষমতা ও আইন মেনে চলার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
সম্প্রতি অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষ পাল প্রচলিত তিনটি ‘আর’—রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন—এর পাশাপাশি রিভিশন, রিফর্ম ও রি-এনগেজমেন্ট-এর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। আমার কাছে এই তিনটির মধ্যে রি-এনগেজমেন্ট বা পুনঃসম্পৃক্তকরণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ অর্থনীতির চাকা শুধু নীতি দিয়ে ঘোরে না; অর্থনীতির চাকা ঘোরায় মানুষ। উদ্যোক্তা, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, বিনিয়োগকারী—সবাইকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেই একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে হয়।
বিনিয়োগের প্রথম শর্ত হলো আস্থা
একজন উদ্যোক্তা যখন একটি নতুন কারখানা স্থাপন করেন, নতুন ব্যবসা শুরু করেন কিংবা বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণ করেন, তখন তিনি শুধু বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করেন না। তিনি আগামী পাঁচ বছর, দশ বছর কিংবা তারও বেশি সময়ের কথা চিন্তা করেন।
তিনি জানতে চান—ব্যবসার নিয়মকানুন কি স্থিতিশীল থাকবে? করনীতি কি হঠাৎ পরিবর্তিত হবে? বিনিয়োগ নিরাপদ থাকবে তো? ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাওয়া যাবে কি? প্রশাসনিক জটিলতা কতটা থাকবে? বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতার সুযোগ থাকবে কি?
অর্থাৎ একজন উদ্যোক্তার সিদ্ধান্তের সঙ্গে অর্থের পাশাপাশি আস্থারও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। একজন উদ্যোক্তার মনে যদি প্রশ্ন জাগে—“আমি আজ বিনিয়োগ করলে আগামীকাল পরিবেশটি কেমন থাকবে?”—তাহলে তিনি স্বাভাবিকভাবেই অপেক্ষা করবেন।
এটাই অর্থনীতির স্বাভাবিক আচরণ। অনিশ্চয়তা বাড়লে ঝুঁকি বাড়ে; ঝুঁকি বাড়লে বিনিয়োগের আগ্রহ কমে।
তাই বিনিয়োগ বাড়াতে হলে শুধু কর-সুবিধা, প্রণোদনা কিংবা ঋণের সুদ কমানোর দিকে তাকালে হবে না। বিনিয়োগকারীর মনে এই বিশ্বাস তৈরি করতে হবে যে—তার বিনিয়োগ, সম্পদ, ব্যবসা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা একটি স্থিতিশীল, স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত ব্যবস্থার মধ্যে নিরাপদ থাকবে।
রি-এনগেজমেন্ট কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
একটি দেশের অর্থনীতি কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। অর্থনীতির প্রকৃত ভিত্তি গড়ে ওঠে অসংখ্য ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বড় উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা, শ্রমিক, কৃষক ও পেশাজীবীর সম্মিলিত কর্মকাণ্ডে।
আমাদের অর্থনীতিতে এমন অনেক উদ্যোক্তা ও কর্মী রয়েছেন, যারা কোনো ধরনের অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না; কিন্তু বিভিন্ন রাজনৈতিক বা সামাজিক বাস্তবতার কারণে তাঁদের কেউ কেউ বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন, অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত কিংবা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।
এই মানুষগুলো যদি উৎপাদন ও বিনিয়োগের মূল স্রোতে ফিরতে না পারেন, তাহলে শুধু একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের অর্থনীতিও।
এখানেই রি-এনগেজমেন্ট বা পুনঃসম্পৃক্তকরণের প্রয়োজনীয়তা।
তবে একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার হওয়া দরকার। রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং অর্থনৈতিক অপরাধ এক বিষয় নয়। কেউ রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমত পোষণ করেন বলে তাকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বাদ দেওয়া উচিত নয়। আবার কেউ অর্থনৈতিক অপরাধে জড়িত থাকলে শুধু অর্থনীতিতে অবদান রাখার অজুহাতে তাকে দায়মুক্তিও দেওয়া যাবে না। অর্থনৈতিক অপরাধের বিচার হবে আইনের মাধ্যমে; রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে উৎপাদনশীল মানুষকে অর্থনীতি থেকে বাদ দেওয়া হবে না।
এই ভারসাম্য নিশ্চিত করাই একটি ন্যায়সংগত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অন্যতম শর্ত।
শুধু সরকারি বিনিয়োগ বাড়ালেই কি সমস্যার সমাধান হবে?
বেসরকারি বিনিয়োগ কমে গেলে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো অর্থনীতিকে কিছু ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে। অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও জনসেবার মতো অনেক খাতে সরকারি বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে এমন অনেক খাত রয়েছে, যেখানে সামাজিক সুফল অনেক বেশি হলেও তাৎক্ষণিক আর্থিক মুনাফা তুলনামূলক কম। এসব ক্ষেত্রে বেসরকারি খাত স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগে আগ্রহী নাও হতে পারে। তাই সেখানে সরকারের ভূমিকা অপরিহার্য। একই সঙ্গে সঠিক সরকারি বিনিয়োগ বেসরকারি বিনিয়োগের পথও তৈরি করতে পারে। উন্নত সড়ক, বন্দর, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও ডিজিটাল অবকাঠামো ব্যবসার ব্যয় কমাতে পারে এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে সরকারি বিনিয়োগেরও সীমাবদ্ধতা আছে।
সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে অর্থের প্রয়োজন। সেই অর্থ আসতে পারে রাজস্ব থেকে, ঋণ থেকে কিংবা অন্যান্য উৎস থেকে। অতিরিক্ত ঋণনির্ভর বিনিয়োগ হলে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের ঋণ ও সুদ পরিশোধের দায় বাড়তে পারে। আবার অতিরিক্ত করের চাপ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যবহারযোগ্য আয় কমিয়ে দিতে পারে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভোগ ও বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই প্রশ্নটি শুধু “সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো হবে কি না”—এমন নয়।
মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—কোন খাতে সরকারি বিনিয়োগ হবে? কতটা হবে? কীভাবে অর্থায়ন হবে? সেই বিনিয়োগ কতটা উৎপাদনশীল হবে? এবং তা বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে, নাকি কোনো ক্ষেত্রে সংকুচিত করবে?
এখানে ভারসাম্য অত্যন্ত জরুরি। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সরকারি বিনিয়োগ কমানো নয়; বরং সরকারি বিনিয়োগের মান, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা।
বিনিয়োগ বাড়াতে এখন কী করা দরকার?
প্রথম কাজ—আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। ব্যবসার নিয়ম, করনীতি, আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থা, অর্থায়ন, লাইসেন্সিং ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোয় অপ্রয়োজনীয় অনিশ্চয়তা কমাতে হবে। উদ্যোক্তাকে বুঝতে দিতে হবে—আজ যে নীতি আছে, আগামীকাল তার মৌলিক কাঠামো হঠাৎ বদলে যাবে না।
দ্বিতীয় কাজ—ব্যাংকিং ও অর্থায়ন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। সহজ ঋণ মানে যাচাই-বাছাই ছাড়া ঋণ নয়। বরং প্রকৃত উদ্যোক্তা, উৎপাদনশীল প্রকল্প ও সম্ভাবনাময় ব্যবসাকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায় অর্থায়নের আওতায় আনতে হবে।
তৃতীয় কাজ—ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের শক্তিশালী করতে হবে। একজন ছোট উদ্যোক্তা যখন একটি দোকান, কারখানা, রেস্তোরাঁ, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ কিংবা অনলাইন ব্যবসা শুরু করেন, তখন তিনি শুধু নিজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন না; অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেন। তাই বড় শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগকে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
চতুর্থ কাজ—ব্যবসা শুরুর প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে হবে। একজন উদ্যোক্তাকে ব্যবসা শুরু করতে যদি অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে হয় কিংবা অনিশ্চিত প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে তার বিনিয়োগের আগ্রহ কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। সরকারের কাজ হওয়া উচিত উদ্যোক্তাকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়; বরং নিয়মের মধ্যে থেকে উদ্যোক্তার কাজ সহজ করা।
পঞ্চম কাজ—দেশে ও দেশের বাইরে থাকা সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের পুনরায় অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। যারা দেশে ফিরে বিনিয়োগ করতে চান, তাদের জন্য নিরাপদ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একইভাবে দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্যও দেশে বিনিয়োগের সুযোগ সহজ করা দরকার।
অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি মানে কী?
অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি মানে এই নয় যে সবাইকে একই ফল দিতে হবে। বরং এর অর্থ হলো—আইন মেনে উৎপাদন ও বিনিয়োগ করতে সক্ষম প্রত্যেক মানুষকে ন্যায্য সুযোগ দেওয়া। একজন উদ্যোক্তার মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়; বরং তার সততা, সক্ষমতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনীতিতে অবদানের ভিত্তিতে।
একই কথা শ্রমিক ও পেশাজীবীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
একজন দক্ষ কর্মী যদি রাজনৈতিক বা সামাজিক কারণে কর্মক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, তাহলে ক্ষতি শুধু তার ব্যক্তিগত নয়। তার দক্ষতা অব্যবহৃত থাকে, উৎপাদনশীলতা কমে এবং অর্থনীতির সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই রি-এনগেজমেন্ট শুধু উদ্যোক্তাদের ফিরিয়ে আনার কর্মসূচি নয়; এটি দেশের মানবসম্পদকে আবার উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করার একটি অর্থনৈতিক কৌশল।
রিভিশন, রিফর্ম ও রি-এনগেজমেন্ট—তিনটি পথ, একটি লক্ষ্য
অর্থনীতিকে নতুন গতিতে ফিরিয়ে আনতে তিনটি ‘আর’-কে আলাদা করে দেখলে হবে না। এগুলোকে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে।
রিভিশন আমাদের বর্তমান নীতি ও কাঠামোকে নতুন করে মূল্যায়নের সুযোগ দেবে। কোন নীতি কাজ করছে, কোনটি কাজ করছে না এবং কোথায় পরিবর্তন প্রয়োজন—তা নিরপেক্ষভাবে দেখতে হবে।
রিফর্ম প্রয়োজন দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার জন্য। ব্যাংকিং, করব্যবস্থা, প্রশাসন, ব্যবসার পরিবেশ এবং বিনিয়োগ ব্যবস্থায় কার্যকর সংস্কার করতে হবে।
আর রি-এনগেজমেন্ট নিশ্চিত করবে যে অর্থনীতির সম্ভাবনাময় মানুষগুলো আবার উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।
এই তিনটি পদক্ষেপ একসঙ্গে এগোতে পারলে অর্থনীতিতে আস্থা ফিরে আসার সম্ভাবনা বাড়বে।আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আস্থা পুনর্গঠন
বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্ভাবনা নিয়ে সন্দেহ করার কারণ নেই। বড় ভোক্তা বাজার, তরুণ শ্রমশক্তি, উদ্যোক্তা সংস্কৃতি, কৃষি ও শিল্পের সম্ভাবনা, প্রযুক্তির বিস্তার এবং ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশ—সব মিলিয়ে আমাদের সামনে বড় সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সম্ভাবনা থাকলেই অর্থনৈতিক সাফল্য আসে না।
সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। আর বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন আস্থা। তাই এখন আমাদের নিজেদের কাছে প্রশ্ন করতে হবে—
একজন উদ্যোক্তা কেন আজ বিনিয়োগ করবেন?তিনি কেন নতুন কারখানা করবেন? কেন নতুন কর্মী নিয়োগ করবেন? কেন ব্যবসা সম্প্রসারণ করবেন? কেন বিদেশে না গিয়ে দেশে বিনিয়োগ করবেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি আমরা বিশ্বাসযোগ্যভাবে দিতে না পারি, তাহলে শুধু বক্তৃতা, পরিকল্পনা বা প্রকল্প দিয়ে বিনিয়োগের গতি বাড়ানো কঠিন হবে। আমাদের এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে একজন উদ্যোক্তা মনে করবেন—এখানে বিনিয়োগ করা নিরাপদ, এখানে নিয়ম পরিষ্কার, এখানে পরিশ্রমের মূল্য আছে এবং এখানে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করার সুযোগ আছে।
শেষ কথা: বিনিয়োগের আগে আস্থা ফিরিয়ে আনুন
বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু অর্থের জোগান নয়; আস্থার পুনর্গঠন। শুধু সরকারি অর্থ ব্যয় করে কিংবা ঋণ করে অর্থনীতিকে দীর্ঘদিন গতিশীল রাখা সম্ভব নয়। সরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন, তবে সেই বিনিয়োগ হতে হবে প্রয়োজনভিত্তিক, উৎপাদনশীল ও অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসংগত। পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকে অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে পুনরায় শক্তিশালী করতে হবে।
এর জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল নীতি, আইনের শাসন, স্বচ্ছ প্রশাসন, সহজ ব্যবসা পরিবেশ, কার্যকর অর্থায়ন ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি।
যারা অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের সঙ্গে যুক্ত নন এবং আইন মেনে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে অংশ নিতে চান, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অর্থনীতির মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা দরকার। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক অপরাধের ক্ষেত্রে আইনের শাসন কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। কারণ কাউকে অন্যায়ভাবে বাদ দিয়ে কোনো অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হতে পারে না।
আজ আমাদের প্রয়োজন শুধু বিনিয়োগের টাকা নয়—বিনিয়োগের আস্থা। শুধু নতুন উদ্যোক্তা নয়—বিদ্যমান উদ্যোক্তারও আস্থা ফিরিয়ে আনা। শুধু নতুন কর্মসংস্থান নয়—দেশের দক্ষ ও অভিজ্ঞ মানবসম্পদকে উৎপাদনের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত করা।শুধু নতুন প্রকল্প নয়—বিদ্যমান অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে কাজে লাগানো।
মনে রাখতে হবে, অর্থনীতির চাকা তখনই দ্রুত ঘুরবে, যখন দেশের মানুষ বিশ্বাস করবে—এই অর্থনীতিতে তারও একটি জায়গা আছে, তার বিনিয়োগেরও মূল্য আছে এবং তার পরিশ্রমেরও ভবিষ্যৎ আছে। তাই বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রথম কাজ বিনিয়োগকারীর হাতে টাকা তুলে দেওয়া নয়; তার মনে আস্থা ফিরিয়ে দেওয়া। আর সেই আস্থার ভিত্তি হবে—রিভিশন, রিফর্ম এবং রি-এনগেজমেন্ট। এটাই হতে পারে একটি শক্তিশালী, ন্যায়সংগত, উৎপাদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির পথে বাংলাদেশের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
লেখক: অধ্যাপক শেখ মাজেদুল হক,
মার্কেটিং বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।









