‘গেম অব থ্রোনস’ এর মহাযজ্ঞের পর ফ্যান্টাসি ড্রামার দর্শকরা যেন এক শূন্যতার মধ্যেই দিন কাটাচ্ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে, সাদা চুল, বিড়ালের মতো সরু চোখ এবং একটি রহস্যময় জগৎ নিয়ে হাজির হলো ‘দ্য উইচার’। কেউ একে আশীর্বাদ বললেন, কেউবা আবার ফ্যান্টাসি জঁরার এক নতুন বিপ্লব বলে মনে করলেন।
পোলিশ সাহিত্যিক আন্দ্রে সাপকোভস্কি আশির দশকের মাঝামাঝি ‘দ্য রোড উইথ নো রিটার্ন’ নামে একটি ছোট গল্পের জন্ম দিয়েছিলেন এই কাল্পনিক জগতের। পোলিশ এক ম্যাগাজিনের ছোটগল্প প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান অধিকার করেই যাত্রা শুরু হয় ‘উইচার’ সাগার। পাঠকদের ভালোবাসায় ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম উপন্যাস (‘ক্রেভ এলফুফ’ ইংরেজি নাম: ‘ব্লাড অব এলভস’)। ১৯৯৯ সালে (‘পানি যেজিওরা’ ইংরেজি নাম: ‘লেডি অব দ্য লেক’) প্রকাশের মাধ্যমে শেষ হয় এই মহাকাব্যিক উপন্যাসমালা। মোট চারটি ছোটগল্প সংকলন ও পাঁচটি উপন্যাস নিয়ে গড়ে ওঠে এই ফ্যান্টাসি সাম্রাজ্য। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই পোল্যান্ডের সীমানা পেরিয়ে ‘উইচার’ ইউনিভার্স ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ায়।
উইচাররা আসলে এক ধরনের ‘মিউট্যান্ট’। শৈশবেই অমানুষিক জাদুবিদ্যা ও কঠোর প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে তৈরি হয় এই যোদ্ধারা। তাদের শক্তি, প্রতিক্রিয়ার গতি ও সহনশীলতা সাধারণ মানুষের চেয়ে বহুগুণ বেশি। তারা মানুষ ও দানবের মাঝামাঝি এক অবস্থানে থাকে। তাদের পেশা? অর্থের বিনিময়ে দানব শিকার। তাই তাদের ডাকা হয় ‘মনস্টার স্লেয়ার’ নামে। কায়ের মোরহেন নামক এক প্রাচীন দুর্গে এই বিশেষ যোদ্ধাদের তৈরি করা হয়। এই নিষ্ঠুর প্রশিক্ষণে যে কয়জন বেঁচে থাকে, তারাই হয়ে ওঠে আসল উইচার।
সমাজের রক্ষক হয়েও তারা নিগৃহীত। রাজা থেকে সাধারণ কৃষক। সবাই তাদের ভয় পায়, ঘৃণা করে। অথচ বিপদের সময় সবার আগে যাদের ডাক পড়ে, তারা এই নিঃসঙ্গ যোদ্ধারাই। এই সিরিজের কেন্দ্রীয় চরিত্র গেরাল্ট অব রিভিয়া। তাঁর তলোয়ারের ঝলক আর শুষ্ক, মর্মস্পর্শী সংলাপ মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক রহস্যময় কিংবদন্তি। একসময় তাঁর জীবনে আসে সিন্ট্রা রাজ্যের রাজকন্যা সিরি। তাদের জীবন বেঁধে যায় ‘ল অব সারপ্রাইজ’ নামে এক অলৌকিক নিয়মে। সিরিকে খুঁজে বের করার যাত্রায় গেরাল্টের দেখা হয় ইয়েনেফার অব ভেঙ্গারবার্গের সঙ্গে। এক বিকৃত চেহারার সাধারণ মেয়ে থেকে, নিজের জাদুশক্তির জোরে সে হয়ে ওঠে রাজ্যের সবচেয়ে সুন্দরী ও পরাক্রমশালী জাদুকরী।
২০১৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর লরেন শ্মিট হিসরিচের পরিচালনায় নেটফ্লিক্সে মুক্তি পায় ‘দ্য উইচার’ সিরিজের প্রথম সিজন। গেরাল্ট চরিত্রে অভিনয় করেন হেনরি ক্যাভিল। একজন গেমার হিসেবে হেনরির নিজেরই এই ইউনিভার্সের প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁকে এই চরিত্রের কাছে নিয়ে আসে। কাস্টিং শুরুর আগেই তিনি পড়ে ফেলেছিলেন উইচারের সব বই এবং ভিডিও গেম। ২১৭ জন অভিনেতার অডিশনের পর পরিচালক হিসরিচ যখন হেনরির কণ্ঠস্বর শুনেন, তখনই বুঝে যান এই গেরাল্ট শুধু হেনরিই হতে পারেন।
গেরাল্ট চরিত্রে হেনরি ক্যাভিলের নিখুঁত শারীরিক ভাষা, গম্ভীর কণ্ঠ এবং স্থির দৃষ্টি বইয়ের চরিত্রটিকে প্রাণবন্ত করে তোলে। চরিত্রের জন্য নিজেকে পুরোপুরি বিলীন করে দিতে তিনি কঠোর ডায়েট মেনে চলেন, এমনকি একটি দৃশ্যের জন্য টানা তিন দিন প্রায় পানি না খেয়ে থেকে নিজের দেহের মাংসপেশি আরও স্পষ্ট করে তোলেন। ইয়েনেফার চরিত্রে অন্যা চালোত্রা এবং সিরি চরিত্রে ফ্রেয়া অ্যালান তাদের অভিনয় দিয়ে প্রমাণ করেন যে, এই গল্পের ভার কেবল গেরাল্টের একার নয়, তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, যন্ত্রণা ও ভালোবাসাই এই কাহিনিকে পূর্ণতা দান করেছে।
২০১৯ সালে নেটফ্লিক্সের দর্শকরা প্রবেশ করেছিল এক রহস্য, জাদু ও বিপদের জগতে। যেখানে দানব, রাজনীতি আর মানুষের স্বার্থজাল জড়িয়ে তৈরি করেছিল এক জটিল কাহিনির জাল। এখন আসছে সিরিজটির চতুর্থ সিজন, যা নিয়ে অপেক্ষার উত্তেজনা আকাশচুম্বী। এই সিজন শুরু হবে এক যুদ্ধবিধ্বস্ত মহাদেশের প্রান্তে। গেরাল্ট, ইয়েনেফার ও সিরি। তিনজনই এখন আলাদা পথে। প্রত্যেককে নিজ নিজ যন্ত্রণা ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে লড়াই করতে হবে। গেরাল্ট নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে এক অজানা সংকটে, তবুও তাঁকে বেঁচে থাকতে হবে এই নিষ্ঠুর বিশ্বে।
এই সিজনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো গেরাল্ট চরিত্রে হেনরি ক্যাভিলের পরিবর্তে অভিনয় করবেন লিয়াম হেমসওয়ার্থ। প্রথম দিকে দর্শকদের মাঝে এই নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও গল্পের নতুন বাঁক ও চরিত্রের গভীরতা সবাইকে আবারও বেঁধে ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ভেসেমিরের চরিত্রে যোগ দিয়েছেন পিটার মুলান। এই নতুন মুখগুলো গল্পে নতুন মাত্রা যোগ করবে, নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। গেরাল্টের যাত্রাপথে দেখা মিলবে নতুন মিত্রের, নতুন শত্রুর এবং নতুন চ্যালেঞ্জের। যুদ্ধ, জাদু, বিশ্বাসঘাতকতা আর বেঁচে থাকার লড়াইয়ে সিক্ত এই সিজন দর্শকদের জন্য নিয়ে আসবে চরম উত্তেজনা। সিরি শিখছে নিজের ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে, আর ইয়েনেফার সংগ্রাম করছে নিজের নৈতিকতার সঙ্গে।
এই সিজনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো ‘কেন, কীভাবে এবং কার জন্য’ এই প্রশ্নগুলোর জটিল সব উত্তর। পুরোনো বন্ধু হয়ে উঠতে পারে নতুন শত্রু, আর শত্রু হতে পারে অপরিহার্য মিত্র। চতুর্থ সিজন মূলত বলতে চায়: এই জগতে কেবল যুদ্ধই নয়, বিশ্বাস, প্রেম, স্বার্থ এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করাই আসল চ্যালেঞ্জ।
গল্প, গেম, এবং পর্দা। এই তিন মাধ্যমেই ‘দ্য উইচার’ তার অসাধারণ ছাপ রেখেছে। এটি শুধু একজন মনস্টার হান্টারের গল্প নয়; বরং এটি ভাগ্য, মানবতা এবং ভালোবাসার এক জটিল ও গভীর মহাকাব্য। যে গল্পে আলো ও অন্ধকার পাশাপাশি হাঁটে, আর যে চরিত্রগুলো আমাদের নিজেদেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। ‘দ্য উইচার’ কেবল একটি সিরিজ নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক ঘটনা, যা ফ্যান্টাসি জঁরাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে।





