সবাই বলে আমি অনেক শান্ত হয়ে গিয়েছি: সুনেরাহ

0
37

সকালের আলো যেমন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি ধীরে ধীরে নিজের আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছেন সুনেরাহ। মডেলিং দিয়ে শুরু, তারপর সিনেমা, নাটক, ওয়েব– সবখানেই তাঁর পদচারণা। কিন্তু তাড়াহুড়ো নয়, তিনি চলেছেন ধীর ছন্দে, মেপে মেপে। যেন প্রতিটি চরিত্রের ভেতর দিয়ে নিজেকে নতুন করে চিনে নিচ্ছেন, আর পরিণত। তাই এখন যে সুনেরাহকে দেখা যায় সে পরিপক্ব এক অভিনেত্রী আর দায়িত্বশীল মানুষ। অভিনেত্রীর ভাষায়, ‘আমি প্রতিনিয়ত কাজ করছি, কাজের মধ্যে থাকছি, সেটা সব মাধ্যমেই। ফলে অভিনয়ের স্কুলিংটা আমার নিয়মিতই হয়েছে, হচ্ছে। অভিনয় তো একটা সাগর, সেখানে কতটা পরিপক্ব হয়েছি বলতে পারছি না। আমি কেবল চালিয়ে যাচ্ছি। আমি এখন কাজ পাগল মানুষ। কাজ ছাড়া থাকতে হতাশ লাগে। কাজের মাঝেই এখন আনন্দ পাই।’

‘ন ডরাই’-এর কথা নিশ্চয়ই মনে আছে! ২০১৯ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমা এটি। চলচ্চিত্রে আয়েশা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সুনেরাহ। সার্ফবোর্ডে দাঁড়িয়ে, ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে, নিজের স্বপ্নের ভাষা শেখা মেয়েটির মতোই সুনেরাহ তখন নিজের অভিনয়জীবনের ঢেউ সামলাচ্ছিলেন। সিনেমাটি তাঁকে এনে দেয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার– সেরা অভিনেত্রীর স্বীকৃতি। সেই মুহূর্ত থেকেই তিনি প্রমাণ করেন, অভিনয় তাঁর কাছে কেবল পেশা নয়, নিজের আত্মার প্রশান্তি। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মশারি’-তেও অভিনয় করেছেন। বাহবাহ পেয়েছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। বরাবরই চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে নজর কেড়েছেন সুনেরাহ। যার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় চলতি বছরের রোজার ঈদে মুক্তি পাওয়া ‘দাগি’তে। তিনি লিখন নামে এক বাকপ্রতিবন্ধী মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। কথা বলতে না পারলেও লিখনের চোখে ছিল অজস্র ভাষা। সে ভাষা পুঙ্খানুপুঙ্খ বুঝতে পেরেছেন দর্শক।

চরিত্রটির নির্বাক চাহনিতে মুগ্ধ হয়েছেন দর্শক। পর্দা থেকে দর্শকের হৃদয়জুড়ে মায়া ছড়িয়েছেন লিখন; কখনও হাসিয়েছেন, কখনও ভাবিয়েছেন। ক্যারিয়ারে প্রথমবার বাক্প্রতিবন্ধী চরিত্রে অভিনয় করেই সুনেরাহ যেন উত্তীর্ণ হয়েছেন জিপিএ ৫ পেয়ে। অভিনেত্রীর ভাষ্য, লিখন আমাকে শিখিয়েছে, শব্দের বাইরে অনুভবেরও এক গভীর ভাষা আছে। চোখের দৃষ্টিতে, অঙ্গভঙ্গিতে, আর নীরবতায়ও গল্প বলা যায়। আমি সেটাই বলতে চেয়েছি। এমন একটি চরিত্রে সুনেরাহ কেন অভিনয় করলেন? সাধারণ সিনেমায় যারা নায়িকা হন, তারা তো এ ধরনের চরিত্রে নিজেকে সামনে আনতে চান না। সুনেরাহ কেন এলেন? অভিনেত্রীর উত্তর চ্যালেঞ্জ নিতে আমার ভালো লাগে। লিখন চরিত্রটা সুনেরাহর চেয়ে একদম আলাদা। চরিত্রটা হয়ে ওঠার জন্য চ্যালেঞ্জিং পথটা উপভোগ করেছি। একজন অভিনেতার কাছে তো এটাই শান্তির ও প্রাপ্তির।

টিভিতে তাঁর প্রথম নাটক ‘শূন্য থেকে শুরু’। ২০২২ সালের নাটকটিতে তিনি অভিনয় করেছিলেন তাহসানের সঙ্গে। গত বছর রাগীব রায়হানের পরিচালনায় আবার নাটকে ফেরেন সুনেরাহ। ‘দাবাঘর’ নামে নাটকে তাঁর সঙ্গে ছিলেন ইরফান সাজ্জাদ। এরপর থেকে ছোট পর্দায় নিয়মিত অভিনয় করছেন তিনি। প্রতি মাসে বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ পাচ্ছে সুনেরাহ অভিনীত নাটক। ফেসবুক রিলসেও তাঁর নাটকের ক্লিপস ঘুরেফিরেই চলে আসে সামনে। কখনও অভিনেতা আরশ খানের সঙ্গে রোমান্টিক মুডে, কখনওবা তাঁর সঙ্গে বিরহকাতর দৃশ্যে। মোট কথা, সিনেমার অভিনেত্রী সুনেরাহ এখন নাটকেই বেশি ব্যস্ত। কারণ কী? অভিনেত্রী বললেন, ‘বিশেষ কোনো কারণ নেই। আমি সবসময় শিখি। নতুন কিছু শিখি। সিনেমা করেছি, ওটিটিও করেছি। আমার সিনিয়র পরামর্শ বা বুদ্ধি দিলেন এবার নাটকে অভিনয়ের চেষ্টা কর, এই অঙ্গনে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা নেওয়ার দরকার আছে। আমিও চেষ্টা করলাম, নতুন কিছু শিখতে। চেষ্টা করতে গিয়েই বলতে পারেন নাটকে নিয়মিত হয়ে গেলাম।’ ছোটবেলা থেকেই বিটিভির তালিকাভুক্ত নৃত্যশিল্পী সুনেরাহ। অথচ তিনি যে নৃত্যশিল্পী এটা অনেকে জানেনই না। জেনে অবাক হবেন, মাত্র আড়াই বছর বয়সে বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে নাচ শেখা শুরু করেছিলেন। তাই শেখার চেষ্টা তাঁর সেই ছোট থেকেই। বললেন, এখনও শিখছেন। সুনেরাহ বললেন, এখন আমি কাজ ছাড়া বসে থাকতে পারি না। শুধু শুধু বসে থাকলে ডিপ্রেস লাগে। সিনেমায় অভিনয় করার সময় মাঝে অনেক সময় ফাঁকা থাকে। নিয়মিত অভিনয়ের কোর্সও করেছি। ফাঁকা সময়ে তো আমাকে বসে থাকলে হবে না। অভিনয়ের চর্চাটা নিয়মিত চালিয়ে যেতে হবে। সেই চর্চাটাই নাটকে অভিনয় করার মধ্য দিয়ে হচ্ছে। এখানে অভিনয় করতে গিয়ে অনেক কিছুই শিখছি। নাটক-ওটিটি-ও সিনেমা– তিনটি মাধ্যমেই কাজ একটা, সেটা অভিনয়। তবে প্রত্যেকটা বিভাগের অভিনয়ের আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

কয়েক বছর আগেও সুনেরাহকে সবাই চঞ্চল মেয়ে হিসেবেই চিনতেন। কাজের বাইরে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর ঘোরাফেরা করেই সময় কাটত। সেই সুনেরাহর এখন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা তো দূরের কথা, বন্ধুরা এখন তাঁকে খুঁজেই পান না। কারণ কী? সুনেরাহ বললেন, সত্যি এখন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া হয় না। দেখা সাক্ষাৎকারও কম হয়। কারণ এখন দায়িত্ব বেড়েছে। চার-পাঁচ বছর আগে তো এমন ছিলাম না। এখন পরিবারের পুরো দায়িত্ব আমার ওপর। সবাইকে ভালো রাখার কাজটি আমারই করতে হয়। বাসা, বাবা-মা আর ছোট ভাই আছে। সবাইকে নিয়েই আমার হ্যাপি ফ্যামিলি। তাই এখন কাজের বাইরে তেমন সময় কাটানো হয় না। আমাকে দেখে সবাই বলে আমি এখন অনেক শান্ত হয়ে গেছি। আসলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ তো বদলায়। নানা কারণে বদলায়।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রথমবারের মতো ধারাবাহিক নাটকে যুক্ত হয়েছেন সুনেরাহ। মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজের ‘এটা আমাদের গল্প’-এ অভিনয় করছেন তিনি। পরিবারকেন্দ্রিক এ গল্পের মধ্য দিয়ে সুনেরাহর অভিনয়জীবনে যুক্ত হচ্ছে নতুন অধ্যায়। সুনেরাহ বলেন, আমার ক্যারিয়ারে ধারাবাহিক নাটকে এবারই প্রথম অভিনয় করলাম। বলতে পারেন, প্রথম অভিজ্ঞতা। রাজ ভাইয়ের ধারাবাহিক নাটক মানেই তো ভালো কাজ। এটা ইমোশনাল গল্পের ধারাবাহিক। পারিবারিক বন্ধনের গল্প। তাই বিনা দ্বিধায় নাটকটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছি।

সুনেরাহ অভিনয়কে দেখেন গভীর এক শিল্প হিসেবে। তাঁর কাছে অভিনয় মানে শুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো নয়; বরং চরিত্রের ভেতর হারিয়ে যাওয়া। তিনি বলেন, আমি চাই দর্শক যেন আমাকে না দেখে চরিত্রটাকেই দেখে। অভিনয় আমার কাছে আত্মার ভাষা, যেখানে আমি প্রতিবার ভাঙি, আবার নতুন হয়ে গড়ি। এই কারণেই তিনি সংখ্যা নয়, মানের পক্ষে। প্রতিটি চরিত্র বেছে নেন মন দিয়ে। গল্পে যদি হৃদয়ের টান না থাকে, তিনি কাজ করেন না। “অভিনয় মানে শুধু পর্দায় মুখ দেখানো নয়– এটি এক আত্মিক সংযোগ”, বলেন সুনেরাহ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here